খুলনা | সোমবার | ২২ এপ্রিল ২০১৯ | ৯ বৈশাখ ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

একাত্তরের স্মৃতির রোডম্যাপ

এ কে এম সামসুদ্দিন সালাম | প্রকাশিত ২৬ মার্চ, ২০১৯ ০১:৪৩:০০

একাত্তরের স্মৃতির রোডম্যাপ

আমার নাম এ কে এম সামসুদ্দিন (সালাম) স্থায়ী ঠিকানা গ্রাম+পোঃ-গাংনী, থানা-মোল্লাহাট, জেলা-বাগেরহাট, তৎকালীন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সদস্য ছিলাম। সৈনিক নং- ৭০৪০২৪৭, ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান শিয়ালকোর্ট সেক্টরে পাক-ভারতের যুদ্ধে তংকায়-ই-জং খেতাব প্রাপ্ত হই। ১৯৭১ সালে ১০ মার্চ  পাকিস্তানের শিয়ালকোর্ট থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসি। ১৯৭১ সালে ১৭ জুলাই ভারতের বশিরহাট বাকুন্দিয়া ক্যাম্প হতে আমার নেতৃত্বে আমার বাহিনীকে অস্ত্র দেয়া হয়। আমি মুজিবর নগর হতে সর্ব প্রথম নর্থ খুলনায় (মোল্লাহাট-তেরখাদা) অস্ত্র আনি। ১৫/১০/১৯৭১ ইং তারিখ হতে ২৯/১০/১৯৭১ তারিখ পর্যন্ত মোল্লাহাটের চাকুলিয়া বড় ধরনের দু’টি যুদ্ধ হয়। এর প্রথম যুদ্ধটির নেতৃত্বে সম্পূর্ণ আমার উপর ন্যস্ত ছিল। প্রথম যুদ্ধটি একদিন আগে আমি গোপন সূত্রে জানতে পারি পাকিস্তান বাহিনীর একটি সু-সজ্জিত দল মেজর সেলিমের নেতৃত্বে স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় মোল্লাহাট হতে মার্চ পাষ্ট করে আমাদের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প চরকুলিয়া আক্রমণ করতে আসে। পথিমধ্যে আমাদের ক্যাম্পের আনুমানিক ২ মাইল উত্তর দিকে অতিক্রম কালে আমাদের গুলির সীমানায় এসে পড়লে সংকেত স্বরূপ আমি প্রথম গুলি ছুড়ি। অতঃপর আমাদের সকল মুক্তিযোদ্ধা পাক’ সেনাদের লক্ষ্য করে একইসাথে গুলি (ফায়ারিং) আরম্ভ করে। আমাদের হঠাৎ আক্রমণে পাকিস্তান বাহিনী হতবিহক্ষল হয়ে পড়ে এবং প্রথম আক্রমণেই পাক সেনা কমান্ডার মেজর সেলিম নিহত হওয়ায় পাল্টা আক্রমন করতে ব্যর্থ হয়। এই যুদ্ধে মোল্লাহাটের সৈনিক আবুল কাশেম ও মোঃ হানিফ আমাকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেছিলেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হতে বার বার আমার ডাকনাম সালামের নেতৃত্বে মোল্লাহাটের চাকুলিয়ায় (চরকুলিয়া) ঘোরতর যুদ্ধ চলছে এই মর্মে প্রচার করা হয়। কাউখালীর শরণার্থী (ভারত গমনকারী) একটি পরিবারের একমাত্র জীবিত প্রফেসর প্রফুল্ল বাবুর স্ত্রী দীপা রানীকে কাহালপুর হতে উদ্ধার করে চাউলতুলি ক্যাম্পে রাখা হয়। প্রথম যুদ্ধে পরাজিত পাক বাহিনী প্রতিশোধের আশায় দ্বিতীয় শক্তি সহকারে ও ভারী অস্ত্রসহ দ্বিতীয়বার আমাদের চরকুলিয়া ক্যাম্প আক্রমণ করিতে আসে। আমার কৌশলগত কারণে ক্যাম্প ছেড়ে আরো দক্ষিণে অলিমুদ্দিন খান বরাবর পজিশন নেই। মুক্তিযোদ্ধারা এলাকা থেকে বিতাড়িত হয়েছে এমন আত্মতুষ্টিসহ পাক সেনা ও রাজাকাররা আরো সামনে অগ্রসর হতে থাকে এবং আমাদের দৃষ্টি সীমানায় চলে এলে একত্রে উপর্যুপরি গ্রেনেড ও গুলির আক্রমণ করি। সাথে সাথে এখানে উভয় পক্ষের মধ্যে থেমে থেমে সারারাত যুদ্ধ হয়। তবে অতর্কিত আক্রমন হতবিহবল হয়ে পড়া পাক বাহিনী ভোর হতে চরকুরিয়া এলাকা হতে পশ্চাদপসরণ করে মোল্লাহাট ফিরে যায়। যুদ্ধটি স্থানীয় বাঙালীদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বইয়ে দেয় এবং আমাদের দলের কৃতিত্বে সকলের মধ্যে বিজয়ের আনন্দ দেখা দেয়। এই যুদ্ধের নেতৃত্বে ছিলাম আমি সামসুদ্দিন (সালাম) ও বিমান বাহিনীর সদস্য সামসুর রহমান (কিছুদিন পূর্বে মৃত্যুবরণ করিয়াছেন। এরপর পাক বাহিনী ও রাজাকাররা আমাদের মোল্লাহাটকে দুই দিক থেকে আক্রমন করে। একটা ছিল মোল্লাহাট দিয়ে চরকুলিয়া অভিমুখে। দ্বিতীয়টি ছিল খুলনা হয়ে শিয়ালী চানপুর ছাগলাদাহ দিয়ে মোল্লাহাট অভিমুখে। যখন আমি জানতে পারলাম পাক সেনারা গাংনী হাইস্কুলে অবস্থান নেবে, তখন আমি বাধ্য হয়ে গাংনী হাইস্কুলের দোতলার সিঁড়ি ডিনামাইট দিয়ে উড়ায়ে দিই। মোল্লাহাট ও তেরখাদা সমস্ত লোক এই বিকট শব্দ শুনতে পেয়েছিল। ১৪/১১/১৯৭১ তারিখে বামনডাংগায় এসে পাক বাহিনী ও রাজাকারদের প্রতিরোধ গড়ে তুলি। প্রকাশ থাকে যে, সাবেক খুলনা জেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও খুলনার বার কাউন্সিলের সভাপতি এড. মুজিবুর রহমানের বাড়িতে আমার ক্যাম্প ছিল। এই স্থানে রাজাকার ও পাক বাহিনী দু’টি লঞ্চ নিয়ে স্থল ও নদী পথে ছাগলাদাহ চাঁনপুর দিয়ে আমার বাহিনীকে আক্রমন করে এবং পাক বাহিনী সম্পূর্ণরূপে পরাজয় বরণ করে। এই যুদ্ধে মোজাম্মেল নামে আমার একজন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন। তাকে এড. মুজিবুর রহমানের বাগান বাড়িতে দাফন করা হয়। ০৬/১২/১৯৭১ তারিখে বামনডাংগায় রাত ৩টায় আমার কাছে রাজাকাররা অস্ত্র স্যারেন্ডার করে এবং বাগেরহাট কুখ্যাত রাজাকার রজব আলী ফকিরের একদল রাজাকার বিল পথে আমার কাছে অস্ত্র সমপর্ণ করে। বামনডাঙ্গা, চাঁনপুর, শিয়ালী মুক্ত হওয়ার পর আমার বাহিনী নিয়ে শেখপুরা, আজগড়া হয়ে পালেরহাটে আসি। এভাবে খুলনাকে ভৈরব নদীর উত্তর দিক দিয়ে ঘিরে ফেলি। এরপর হঠাৎ একাত্তরের ১৩ ডিসেম্বর আমার দায়িত্ব পড়ে শোলপুর, স্টার জুট মিল, চন্দনী মহল, সেনহাটী অর্থাৎ প্লাটিনাম জুবলী জুট মিলস্ গোয়ারপাড়া নদীর অপর পাড় ইত্যাদি অঞ্চল এবং মিত্র বাহিনীকে ক্যাবল ফ্যাক্টরী বরাবর নদী পাড় করিয়ে চন্দনী মহলে নিয়ে আসি। চন্দনীমহলের আওয়ামী লীগ নেতা গাজী আরিফ হোসেন আমার বাহিনীকে সহযোগিতা করেছিলেন। একাত্তরের ১৫ ডিসেম্বর স্টার জুট মিলের মধ্যে প্রায় দুই শত রাজাকার আমার কাছে অস্ত্র সমপর্ণ করে। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর স্টার জুট মিলের একজন দারোয়ান স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের সময় নদীর অপর পাড়ের পাক সেনাদের গুলিতে শহিদ হন। বঙ্গবন্ধুর গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের টুংগীপাড়া যখন রাজাকার ও পাক সেনারা জ্বালিয়ে দিয়েছিল তখন বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই মরহুম শেখ আবু নাসের ও তার চাচা শশুর হেরাজ মার্কেটের মালিক মরহুম ইসমাইল সাহেবের পরিবারভুক্ত সদস্যগণ আমার বাড়িতে ও আমার তত্ত্বাবধানে ছিলেন। তাই একাত্তরের ১৭ ডিসেম্বও আমার বাহিনী নিয়ে তাদের বাড়ি খুলনা হেরাজ মার্কেটে এসে প্রথম মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প স্থাপন করি। পরবর্তীতে এম পি মরহুম ডাঃ মুনসুর আহমেদের সহযোগিতায় খুলনা ডাক বাংলা আমার ক্যাম্প স্থাপিত হয়। এই আমার একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত রোডম্যাপ।
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

বৈশাখ ও বাঙালি : নববর্ষ ১৪২৬

বৈশাখ ও বাঙালি : নববর্ষ ১৪২৬

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩৭

বৈশাখী ভাবনা

বৈশাখী ভাবনা

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৪০


বাঙালির পহেলা বৈশাখ ভাবনা

বাঙালির পহেলা বৈশাখ ভাবনা

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩৮

বাঙালিত্ব একদিনের নয়

বাঙালিত্ব একদিনের নয়

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩৭

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ খেলাধুলা

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ খেলাধুলা

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩৭

বাঙালির ঐতিহ্য ‘পহেলা বৈশাখ’

বাঙালির ঐতিহ্য ‘পহেলা বৈশাখ’

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩৫

ফতে’র পান্তা ইলিশের গল্প

ফতে’র পান্তা ইলিশের গল্প

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩৬

রঙ্গিন বৈশাখ

রঙ্গিন বৈশাখ

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩৬

বৈশাখের হাওয়া

বৈশাখের হাওয়া

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩৫

বৈশাখী মঙ্গলযাত্রা এবং

বৈশাখী মঙ্গলযাত্রা এবং

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩৫

জোৎস্না রাত

জোৎস্না রাত

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩৪


ব্রেকিং নিউজ








পবিত্র শবেবরাত আজ রাতে

পবিত্র শবেবরাত আজ রাতে

২১ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:৫৭