বঙ্গবন্ধুর ভাষণই ছিলো মুক্তিযুদ্ধে যাবার অনুপ্রেরণা


বাড়ি চিতলমারীর দলুয়াগুনি গ্রামে হলেও লেখাপড়া করি গোপালগঞ্জের গোপালপুর পঞ্চপল্লী স্কুলে। রেডিওতে শুনলাম বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, ঘুম হয়নি সেই রাতে। মাথায় ঘুরে ফিরে একটি চিন্তাই জায়গা করে নিলো ‘আমিও শত্র“র মোকাবেলা করব, জবাব দেব পাক হানাদার বাহিনীর’। এ সময় বড়বাড়িয়া স্কুলে স্থানীয় কয়েক গ্রামের কয়েকশ’ মানুষের উপস্থিতিতে যুদ্ধের প্রস্তুতির মহড়ার আয়োজন করা হয়। সেখানে সমবয়সীদের সাথে আমিও অংশ নেই। বাবার সমর্থনে শুরু হয় মুক্তিবাহিনীতে যাবার তোড়জোড়। ইতোমধ্যে পাক সেনারা গোপালগঞ্জের মানিকদা এলাকায় ক্যাম্পও গড়েছে। প্রতিদিন চিতলমারীর আশেপাশের এলাকায় পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের হামলা-নির্যাতনের কোন না কোন খবর আসতে থাকে। আর তাতেই শুরু হয় অস্থিরতা। মনে হতো ‘আমার হাতে যদি এখন একটি অস্ত্র থাকতো’ তাহলে এখনই এর প্রতিশোধ নিতাম। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে যাবার অনুপ্রেরণা, এরপর ভারতে যেয়ে প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ শেষে ফিরে এসে অস্ত্র হাতে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেয়ার ঘটনা একে একে বর্ননা করলেন বাগেরহাট জেলার চিতলমারী উপজেলার গুরুপদ চৌধুরী (মুক্তিবার্তা নম্বর-৪০৩০৪০২০০, গেজেট নম্বর-৫৯৮)। বীর মুক্তিযোদ্ধা গুরুপদ চৌধুরীর মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী সংগ্রহ করেছেন-সৈয়দ আলী।
পাক বাহিনীর ক্যাম্প ছিলো গোপালগঞ্জের মানিকদা নামক স্থানে। মে মাসে এখান থেকে তারা গানবোর্ডে এসে সীমান্ত এলাকার নাজিরপুরের সাচিয়া বাজারে আগুন ধরিয়ে দেয়। ঐ বাজারের অধিকাংশ দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিলো সনাতন ধর্মাবলম্বী, আর সে অপরাধে রাজাকারদের সহযোগিতায় দেয়া আগুনে পুড়ে যায় অর্ধশত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কেউ সম্বল হারিয়ে হাহাকার করে আর অধিকাংশই সে রাতে পালিয়ে যায় ভারতে। ঐ ঘটনা দেখে এসে পরিবারের সবাই সিদ্ধান্ত নেই ভারতে যাবার। পরিবারের ৬ জনের সাথে আশেপাশের অন্ত:ত ৫০ জনের দল পায়ে হেঁটে খুলনার তেরখাদা-নড়াইল হয়ে হাঁটতে থাকি সীমান্তের দিকে। যাবার পথে সহযাত্রী ঝালকাঠি থেকে আসা একটি দলের সাথে থাকা ৪ কিশোরীকে পাকিস্তানী সেনারা ধরে নিয়ে যায়। এ সময় তাদের পরিবারের আকুতি-মিনতি একটুও মন গলাতে পারেনি পাক হানাদারদের। হায়নার মত টানতে টানতে গাড়িতে উঠিয়ে চলে যায় হানাদাররা। চোখের সামনে দেখে অন্তরে ঘৃণা জমে প্রতিশোধ নেয়ার আগুন আরও জ্বলতে থাকে। এভাবে সাত দিন হেটে হেলেঞ্চা সীমান্ত দিয়ে ঢুকে পড়ি ভারতে।
পূর্বের পরিকলাপনা অনুযায়ী ভারতে ঢুকে পরিবার থেকে আলাদা হয়ে পড়ি। আরও কয়েকজনের সাথে চলে যাই লবণরথ মুক্তি ট্রেনিং ক্যাম্পে, আমরা সেখানে যেয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়ার ইচ্ছা জানাই। দেখা হলো বেশ কয়েকটি পরিচিত মুখের সাথে, ট্রেনিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে যখনই কথা বলার ফুসরত হতো সবারই মুখে শুধু একটি কথা ‘জীবন দিয়ে হলেও দেশকে বাঁচাতে হবে হানাদারদের হাত থেকে’। এভাবে সেখানে কেটে যায় ৩৫ দিন, ট্রেনিং ক্যাম্পে আমার নম্বর ছিলো-(চাকুলিয়া এফ এফ ৪৫১৬৯)। ৩৫ দিনের ট্রেনিংয়ে আমাকে ৩০৩ রাইফেল, মার্ক ফোর রাইফেল, এসএলআর, স্টেনগান, এসএমজি ও এলএমজি চালানোসহ ট্যাংক বিধ্বংসী মাইন বহন শেখানো হয়। প্রশিক্ষণ চলাকালে কয়েকবার আঘাতপ্রাপ্ত হলেও কোন কিছুতেই মনোবল একটুও নড়েনি।  
অক্টোবরের দিকে প্রায় ৩শ’ সহ যোদ্ধার সাথে প্রশিক্ষণ নেয়া ঐ সব অস্ত্র নিয়ে ফিরে আসি কলাবাড়িয়ায়। পথে খবর আসে পাক বাহিনীর গানবোর্ড চলাচল করে এ নদী দিয়ে এবং আমরা গঙ্গারামপুরে এ্যাম্বুস করি। কয়েক ঘন্টা পর পাক বাহিনীর নৌযানের দেখা পাই, প্রথমেই মর্টার সেল দিয়ে হামলা শুরু হয়। এই মর্টারের ওপি (অবজারভেটর অব প্লাটুন) ছিলাম আমি। পাক বোর্ড থেকে বেশ কয়েকটি ভারি অস্ত্রের গোলা ছোড়া হয় আমাদের দিকে, যদিও কোন হতাহত হয়নি এখানে। মুক্তি বাহিনীর তোপের মুখে কয়েক ঘন্টার গুলি বিনিময় শেষে পাক গানবোর্ড পেছনের দিকে চলে যায়। এরপর কলাবাড়িয়া থেকে নৌকা যোগে বাদোখালি স্কুলে এসে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে উঠি আমরা। এখানে ক্যাপ্টেন তাইজুল ইসলামের নেতৃত্বে ও মেজর জলিল সাহেবের তত্ত্বাবধানে চলে আমাদের যুদ্ধের পরিকল্পনা।
একদিন সোর্স এসে খবর দেয় পার্শ্ববর্তী নাজিরপুর উপজেলার ষোল-সাত রঘুনাথপুরে রাজাকাররা ক্যাম্প গড়েছে এবং সেখান থেকে আশেপাশের গ্রামগুলোর উপর নির্যাতন চালানো হয়। রাজাকাররা মানুষের বাড়িতে যেয়ে জোরকরে খাসি ছাগল ধরে আনা, গোলা থেকে ধান পেড়ে নেয়াসহ নানা ধরনের লুটতোরাজ করতে থাকে। এর সাথে সুন্দরী গৃহবধূ বা কিশোরীদের ধরে পাক সেনাদের হাতে তুলে দেয়ার মত ঘৃণিত কাজ তারা ছাড়েনি। এদের ভয়ে গ্রাম ছেড়ে অনেকে পালিয়ে নিরাপদে চলে যেতে থাকে।
খবর পেয়ে ৫০ জন মুক্তিবাহিনীর একটি দল রঘুনাথপুরের উদ্দ্যেশ্যে রওনা হই, সাথে ছিলো ৩০৩ রাইফেল, মার্কফোর রাইফেল ও এলএমজি। বিকেল ৩টা নাগাদ সেখানে পৌঁছে রাজাকারদের ক্যাম্প ঘিরে আক্রমনের প্রস্তুতি নেই। টেরপেয়ে ভেতর থেকে রাজাকাররা সোর্স মারফত পাক বাহিনীকে খবর দেয়। এদিকে আমরা বাইরে থেকে অপেক্ষা করতে থাকি ওদের ক্যাম্প ছেড়ে বাইরে আসার। প্রায় দু’ঘন্টা পর পাক বাহিনী নদী পথে এসে ভারি মেশিনগান ব্যবহার করে আমাদের দিকে গুলি বর্ষন শুরু করে। আমার হাতে থাকা এলএমজি দিয়ে থেমে থেমে পাল্টা জবাব দিতে থাকি আমার। গুলি ছুড়তে ছুড়তে গানবোর্ড থেকে পাক বাহিনী নীচে নেমে আমাদের পেছনের দিক থেকে ঘিরে ফেলে। এভাবে ২/৩ ঘন্টা চলার পর সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত হলে আমরা পিছু হটে নিরাপদ স্থানে সরে আসি, তবে এ যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়ে মুক্তিবাহিনীর এক জন শহিদ হন। তাকে এনে কবর দেয়া হয় সন্তোষপুর স্কুলের পাশে।
আরও কয়েকজন কম-বেশী আহত হয়। ক্যাম্পে এনে তাদের চিকিৎসা দেয়া হয়। যদিও পরে আশেপাশের কয়েকটি ক্যাম্প থেকে একত্রিত হয়ে মুক্তিবাহিনী ঐ রাজকার ক্যাম্পে হামলা করে তা দখল করে নেয়।
এরই কয়েকদিন পর বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলা এলাকায় মুক্তিবাহিনীতে আমার স্মরণীয় ঘটনা ঘটে। ক্যাম্প কমান্ডার খবর পান রজব আলীর নেতৃত্বে রাজাকারদের একটি দল বাগেরহাট থেকে আমাদের দিকে আসছে। দুপুরের পরে কচুয়া এলাকায় আমরা ৫০/৬০ জনের একদল মুক্তিবাহিনী রাস্তার পাশে এ্যাম্বুস করি। রাজাকারদের দল আমাদের টার্গেটের মধ্যে ঢুকতেই প্রথমে ৩০৩ রাইফেল দিয়ে গুলি ছোড়া হয়। রাজাকাররা সামনের দিবে না এসে সেখান থেকে আমাদের দিকে জবাব দিতে থাকে। এর কিছুক্ষন পরে পাক সেনাদের একটি দল এস যোগ দেয় রাজাকারদের সাথে। শত্র“দের দিক থেকে হালকা মেশিনগানের ঘুলি আসতে থাকলে আমিও এলএমজি দিয়ে ফায়ারিং শুরু করি, আর আমারে সাথে থাকা সতীর্থদের একটি গ্র“প কৌশলে শত্র“দের পজিশন নেয়া জায়গার অনেক কাছে পৌঁছে যায়। তারা সেখান থেকে আচমকা গুলি বর্ষন ও গ্রেনেড ছুড়ে কাবু করে ফেলে পাক বাহিনীকে। এক পর্যায়ে পাকসেনাদের দল ও রাজাকাররা পিছু হটে এবং আমরা গুলি করতে করতে সামনের দিকে এগুতে থকি। সামনে যেয়ে দেখতে পাই ৪ জন পাকসেনা গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মাটিতে পড়ে রয়েছে। পড়ে থাকা চার জনের মধ্যে দু’জন তখনও বেঁচে ছিলো, তবে সবাইকে টানতে টানতে আমরা চিতলমারী বাজারে নিয়ে এলে চারিদিকে হৈ হৈ রব পড়ে যায়। গ্রাম থেকে মানুষ ছুটে বেরিয়ে আসে পাক সেনাদের লাশ দেখতে। সাধারণ মানুষ তখন আমাদের জড়িয়ে ধরে আনন্দ প্রকাশ করতে থাকে।    
এ দু’টি ঘটনা বর্ননা শেষে হঠাৎ গুরুপদ চৌধুরী থেমে গেলেন, দীর্ঘ এক নিশ্বাস ছেড়ে আমাকে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়লেন, মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী শুনিয়ে কি লাভ হবে? দেশ পাক হানাদারদের হাত থেকে রেহাই পেয়েছে, আমরা পেয়েছি স্বাধীন মানচিত্র। তবে দেশের মানুষ লোভী ও মুক্তিযুদ্ধের খোলশ পরিহিতদের লালশার শিকার হচ্ছে এখনও। থেমে গেছে অস্ত্রের যুদ্ধ, চলে গেছে পাকবাহিনী, উড়ছে স্বাধীন বাংলার পতাকা। তবে নীতি-আদর্শ রক্ষার যুদ্ধে আমরা এখনও জয়ী হতে পারিনি। যদিও সংগ্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা। এরই মাঝে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে নিজের স্বার্থ উদ্ধারে পুজি করে সম্পদের পাহাড় গড়ছে তারা। আর মুক্তিকামি খেটে খাওয়া মানুষগুলো সেই সম্পদের পাহাড়ের নীচে চাপা পড়ে জীবন আজ ওষ্ঠাগত তাদের। এদের চিহ্নিত করে দেশপ্রেমিক নতুন সমাজের সামনে এনে তাদের দেখিয়ে দিতে হবে, আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এ জন্য শপথ নিতে হবে। যে শপথ হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের, যে শপথ হবে আগামী প্রজন্মকে নীতি-আদর্শের প্রতি দৃঢ় থেকে দেশ প্রেমের পথ দেখানোর। তা হলেই সকল শহিদ মুক্তিযোদ্ধার আত্মা হয়ত শান্তি পাবে। আর আমরা ভাসব স্বস্তিতে।


footer logo

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।