খুলনা | সোমবার | ২২ জুলাই ২০১৯ | ৬ শ্রাবণ ১৪২৬ |

শিরোনাম :
খুলনায় ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া জ্বরে আক্রান্ত ২১ রোগী শনাক্তপ্রিয়ার বিরুদ্ধে খুলনা যশোরসহ ৪ জেলায় রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার ছয়টি আবেদন খারিজযশোরসহ ৪ জেলার মাত্র একজন বিচারকের হাতে ১৭শ’ ৭০ মামলা : স্টাফ মাত্র দু’জনখুলনার বৃক্ষমেলায় দর্শনার্থীদের নজর কেড়েছে এ্যাডেনিয়াম ফুল গাছ‘আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগের আগে আইনানুগ ব্যবস্থা না নেওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর’প্লাটিনাম জুট মিলের চারটি ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা জীবনের ঝুঁকিতে শ্রমিক পরিবারের সদস্যরারাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কূটনীতি একসঙ্গে অনুসরণ করুন : রাষ্ট্রদূতদের প্রধানমন্ত্রীপ্রি-একনেকে অনুমোদনের পর কেটেছে ১০ মাস, একনেকে ওঠেনি শের-এ বাংলা রোড চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প

Shomoyer Khobor

খান আলী মুনসুর : একটি মৃত্যুঞ্জয়ী প্রাণ

আবদুল কাদের খান | প্রকাশিত ১৮ জানুয়ারী, ২০১৯ ০০:৪৭:০০


বিশ্ব বিখ্যাত বীর আলেক জান্ডার দ্যা গ্রেট-এর ভাষায়, “ তিনি আসলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন।”-এ মুহূর্তে কথাটি খাটে একমাত্র একজনের ক্ষেত্রে। তিনি হলেন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব আমার প্রিয়তম, একান্ত স্নেহভাজন, অনুজ প্রতীম পরলোকগত উপজেলা চেয়ারম্যান খান আলী মুনসুর। গ্রামীণ দুস্থ, ছিন্নমূল মানুষের সরকারি আবাসন থেকে উপজেলা প্রশাসন, সর্বত্র সমাদৃত, লোকনন্দিত, হতাশ-বিহক্ষল মানুষের নিকট-আশার আলো- সদ্য প্রয়াত সদালাপী, মিশুক এবং অল্প কথায় কয়েক মুহূর্তে যে কোনো অচেনা মানুষকে চিরচেনা করে ফেলা, পরকে স্নেহ-মমতায় বুকে টেনে এনে আপন করা, আপন ভোলা-কাজ পাগল রাজনীতিবিদ খান আলী মুনসুর। তাই বলা যায় “কত অজানারে জানালে বন্ধু/কত ঘরে দিলে ঠাঁই/দূরকে নিকট করিলে বন্ধু/পরকে করিলে ভাই।”
দেশের চলমান রাজনীতি, সমাজনীতি, গ্রামীণ নিঃস্ব-নিঃসম্বল মানুষের নালিশ, শালিস-এর আশ্রম হয়ে উঠেছিলেন তিনি, এই উপজেলা চেয়ারম্যান খান আলী মুনসুর। তাঁর কফিনবাহী এ্যাম্বুলেন্স গত ১৬ই জানুয়ারি বুধবার বিকালে যখন ডুমুুরিয়া উপজেলা স্বাধীনতা স্মৃতিসৌধ চত্বরে এসে দাঁড়ায় মুহূর্তে জনতার ঢল নামে। দেখতে দেখতে ১৫/২০ মিনিটে স্বাধীনতা চত্ব¡র/উপজেলা প্রশাসন ভবন এলাকা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বাসভবন এলাকা ছাপিয়ে জনসমুদ্র প্লাবিত করে বিদ্যুৎ ভবনের গা ছোঁয়া সাতক্ষীরা খুলনা মহাসড়কের বিস্তীর্ণ এলাকা স্পর্শ করে।
গৌরবময় ডুমুরিয়ায় গত ৫০ বছরে কোনো বিদ্রোহী-বিপ্লবে এত মানুষের ঢল নামতে, কেউ দেখেনি কখনো। তিনি মৃত্যুর হীমশীতল স্পর্শে মূক-মৌন-নিথর হয়ে কালঘুমে মগ্ন হলেন। কিন্তু হাহাকার আর্তনাদ আর গুমরে উঠা কান্নায় আক্রান্ত করলেন অসংখ্য স্বজন-প্রিয়জনকে।
১৬ই জানুয়ারি ২০১৯ বুধবার সকালের প্রার্থনা সেরে নিত্যদিনের মতো গোসল সেরে প্রস্তুত হচ্ছিলেন পূর্ব থেকে সিরিয়াল দেয়া অ্যাজমা বিশেষজ্ঞ জনৈক ডাক্তারের কাছে যাবার জন্যে। এক গ্রাস (লোকমা) ভাত মুখে তোলার পূর্বেই ডাইনিং টেবিলে বসা অবস্থায় শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় মুহূর্তে সংঞ্জা হারিয়ে চেয়ার গলিয়ে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে গেলেন। মুহূর্তে স্বজনেরা ধরাধরি করে এ্যাম্বুলেন্স-এ উঠানোর আগেই উপজেলা চেয়ারম্যান খান আলী মুনসুর এই চেনা ভুবন ছেড়ে এক অচেনা ভুবনে-অন্য ভুবনের বাসিন্দা হলেন। এ্যাম্বুলেন্স-এ পড়ে রইলো নিথর দেহ। তিনি চলেন গেলেন আর কোনো দিন না ফেরাÑএক অচিন দেশে।
মুহূর্তে খবরটি রটলো সারাদেশের গ্রাম-গ্রামান্তরে, নগরে-বন্দরে, রাজধানী মহানগরী ঢাকা থেকে নিউ নেশন এর সাংবাদিক শাহীদ হোসেন আমার কাছে মোবাইল করে জানতে চাইলেন, চেয়ারম্যান খান আলী মুনসুর ভাইয়ের শেষ গোসল কী শেষ হয়েছে? তিনি চেয়ারম্যান খান আলী মুনসুরের সাথে জীবদ্দশায় ফেসবুকে এ্যাটাস্ট ছিলেন। জবাবে আমি শুধু বলেছি, স্থানীয় শরীফ হুজুর গোসল করাচ্ছেন।
বিকাল ৫টায় মৃতের জানাজায় বিশাল জনতার ঢলকে পর্যবেক্ষরা মত প্রকাশ করে বলেন, এমন জনশ্রোত, এমন জনসমুদ্র ডুমুরিয়ায় আগে কেউ দেখেনি। মৃতের স্বজন বিএনপি নেতা মতিয়ার রহমান বাচ্চু বললেন, আততায়ীর হাতে নিহত জনপ্রিয় কৃষক নেতা শহিদ আবদুল মজিদ, ডুমুরিয়া সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আততায়ীর গুলিতে নিহত শেখ কবিরুল ইসলাম, ডুমুরিয়া যুবসম্রাট বলে পরিচিত খুলনা জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আততায়ীর গুলিতে নিহত শহিদ মোল্লা সিরাজ কিংবা আততায়ীর হাতে নিহত ডুমুরিয়া মহাবিদ্যালয়ের প্রভাষক শহীদ নূর মোহাম্মদ এর জানাজায়ও এত মানুষের ঢল নামেনি।
ডুমুরিয়া উপজেলা পরিষদ এর প্রায় সকল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, তার নিজের সংগঠন বিএনপি’র সাবেক স্থানীয় এমপি, জেলা নেতৃবৃন্দ, সকল দলের স্থানীয় শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সকল ধর্ম সম্প্রদায়ের/সকল স্তরের আপামর মানুষ অশ্র“সিক্ত অবস্থায় মরহুমের জানাজায় শরীক হন।
সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে মৃতের একমাত্র সন্তান জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের পক্ষে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার স্বামী খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, মরহুমের রাজনৈতিক জীবনের একান্ত সাথী ডুমুরিয়া সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোল্লা আবুল কাশেম, মোল্লা মফিজুল ইসলাম, উপজেলা চেয়ারম্যান পরিষদের পক্ষ থেকে কথা বলেন চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল খোকন।
ছুটে আসেন এই নির্বাচনী এলাকার সাবেক এমপি ডাঃ গাজী আব্দুল হক, বিএনপি জেলা নেতা আমীর এজাজ খান, খুলনা জেলার সকল উপজেলা থেকে বিএনপি স্থানীয়  নেতৃবৃন্দ, বর্তমান সংসদ নারায়ন চন্দ্র চন্দ ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক শোক বার্তায় উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা শাহনাজ হোসেন জোদ্দারকে জানান, “তার এক কালের ছাত্র এবং বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান খান আলী মুনসুরের আকস্মিক মৃত্যুতে তিনিও শোকাহত। তার পরিবারের প্রতি তিনি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।” 
ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারের পক্ষে তার স্বামী ড. আহসান হাবীব জানান, এমন সামাজিক, অমায়িক ব্যক্তির মৃত্যুর খবর শুনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (আমার স্ত্রী) মোছাঃ শাহনাজ বেগম আর্তনাদের সাথে চিৎকার করে ওঠেন। উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা নাজমুল হাসান বলেন, উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েও আমার এখানে চাকুরি কালে তাকে কোন দিন কোন অন্যায় আবদার বা দাবি নিয়ে কথা বলতে দেখিনি। আমি আল্লাহর কাছে তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করেন।
মরহুমের সুখ-দুঃখের সাথী বিএনপি’র জেলা নেতা মোল্লা আবুল কাশেম ডুকরে কেঁদে ওঠে বলেন, আপনার খান আলী মুনসুরের জন্য দোয়া করবেন। ঢাকা থেকে আগত সাবেক এমপি, বিএনপি সিনিয়র নেতা ডাঃ গাজী আব্দুল হক বলেন, আমার আলী মুনসুরের জন্য আল্লাহর কাছে তার কর্ম জীবনে কোন ভুলত্র“টি হলে ক্ষমা করে দিয়ে দোয়া করবেন। আল্লাহ যেন তার বেহেশত নসীব করেন। তখন পুরো সমাবেশ স্থলে কান্নার রোল পড়ে যায়। 
মরহুমের একমাত্র সন্তান জিয়াউর রহমান বলেন, আমার আব্বার প্রতি আপনাদের আবেগ আন্তরিকতা আমি চিরকাল মনে রাখব। আমার আব্বার এত বড় জনপ্রিয়তা ছিল, এ তার ব্যবহার ও কর্মের জন্য। দোয়া করবেন তার আত্মা যেন সদ্গতি পায়।
ডুমুরিয়া উপজেলার ভান্ডারপাড়া ইউনিয়নের ভান্ডারপাড়া গ্রামে জন্মের পর গ্রামীণ আবহে বেড়ে ওঠা খান আলী মুনসুর শিক্ষাজীবনে স্নাতক পাস হলেও জনমানুষের উদ্বেল হৃদয় তার কর্ম ও ব্যবহারের জন্য তাকে বীরের সম্মানে চিরকাল মনে রাখবে।
খান আলী মুনসুরকে দুঃসময়ে ডেকে পায় নি, কাউকে তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন এমন নজীর খুব কম আছে। হিন্দু-মুসলিম অধ্যুষিত উপজেলা ডুমুরিয়া নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে ৮০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করা তারই পক্ষে শোভা পায়। যিনি আপামর জনতার চিত্ত জয় করেছেন, তাদের মনো মন্দিরে তিনি চিরদিন মুকুটহীন সম্রাটের মর্যাদায় অভিসিক্ত থাকবেন। হিন্দু-মুসলিম শোকার্ত, বিষন্ন, ক্রন্দরত নরনারীর ঢল সকালে তার গ্রামের বাড়ি থেকে শুরু করে কবরে শায়িত হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। 
খান আলী মুনসুর নিজ গ্রাম ভান্ডারপাড়ায় নিভৃত পল্লীতে নিজের বাড়ির সন্নিকটে মসজিদের পাশে চির নিদ্রায় শায়িত আছেন। তার মৃত্যুতে দেশ হারালো একজন উদার রাজনৈতিক নেতাকে। আওয়ামী লীগ কমিউনিস্ট পার্টি, জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টিসহ সর্বদলীয় লোক সমাবেশ প্রমান করে, তিনি ছিলেন আপামর মানুষের হৃদয় নন্দিত নেতা, জনমানুষের বন্ধু চিরমৃত্যুঞ্জয়ী খান আলী মুনসুর। হৃদয়ে সম্মুখে তুমি নাই, নয়নের মাঝখানে নিয়েছো যে ঠাঁই। তার সম্পর্কে তাই মহাকবি মাইকেলের ভাষায় বলা যায়-“সেই ধন্য নরকূলে/লোকে যারে নাই ভোলে/মনের- মন্দিরে নিত্য সেবে সর্বজন”।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ


ভারত ভ্রমণে নয় দিন

ভারত ভ্রমণে নয় দিন

০৮ মে, ২০১৯ ০০:৫৯

হাতে হাত রেখে গড়বো খুলনা

হাতে হাত রেখে গড়বো খুলনা

২৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:১৬


গ্রন্থাগার সভ্যতা ও সংস্কৃতির ফসল

গ্রন্থাগার সভ্যতা ও সংস্কৃতির ফসল

০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ০০:১০



বঙ্গবন্ধুই আমার প্রেরণা 

বঙ্গবন্ধুই আমার প্রেরণা 

১৫ অগাস্ট, ২০১৮ ০০:৫০






ব্রেকিং নিউজ