খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৪ আশ্বিন ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

তেরখাদায় ভাসমান বেডে সবজি চাষ : আশার সঞ্চার করেছে

মোঃ আবদুর রহমান | প্রকাশিত ১২ জানুয়ারী, ২০১৯ ০০:১০:০০

বাড়ির পাশের জমিতে থৈ থৈ পানি। এ পানিতে কচুরিপানা পূর্ণ থাকার কারণে বছরের প্রায় ছয় মাস কোনো ফসল চাষ করতে পারেন না নাজমা বেগম। অথচ এ বছর তিনি জলমগ্ন এ জমির কচুরিপানা স্তুপ করে ভেলার মতো ধাপ তৈরি করে তার ওপর উন্নত পদ্ধতিতে লাউ ও লালশাক চাষ করে ব্যাপক সাফল্য লাভ করেছেন। তাকে দেখে আশে-পাশের নারীরাও ভাসমান বেডে সবজি চাষে উৎসাহিত হয়েছেন। সফল নারী নাজমা বেগম খুলনা জেলার তেরখাদা উপজেলার নেবুদিয়া গ্রামের কৃষক ইসমাইল শেখের স্ত্রী। 
নাজমা বেগম জানান, তিনি তেরখাদা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শ ও সহযোগিতায় এ বছর জলাবদ্ধ জমিতে কচুরিপানা দিয়ে ভাসমান বেড তৈরি করে তার ওপর লাউ ও লালশাক চাষ করতে উৎসাহিত হয়েছেন। তিনি পাশাপাশি চারটি ভাসমান বেডে সবজি চাষ করেছেন। পানির ওপর কচুরিপানা স্তরে স্তরে সাজিয়ে ৩০ হাত লম্বা, ৪ হাত চওড়া ও ৩ হাত উঁচু করে প্রতিটি বেড তৈরি করা হয়েছে বলে তিনি জানান। নাজমা বেগম জানান, তেরখাদা উপজেলা কৃষি অফিসের উদ্যোগে ভাসমান বেড তৈরির জন্য প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বীজ, ফেরোমন ফাঁদ ও অন্যান্য উপকরণ দেয়া হয়েছে। এ বেড থেকে এ পর্যন্ত তিনি ২৭০ কেজি লাউ এবং ১৫০ কেজি লালশাক উৎপাদন করেছেন। প্রতি কেজি লাউ ১০/- টাকা দরে মোট ২৭০০/- টাকা এবং প্রতি কেজি লালশাক ১৫/- টাকা দরে মোট ২২৫০/- টাকা এবং সর্বমোট ৪৯৫০/- টাকা বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন। আরো লাউ ও লালশাক বিক্রি করতে পারবেন বলে তিনি জানান। এ কাজে নাজমা বেগমের স্বামী ইসমাইল শেখ ও তিন ছেলে আসগর, তামিম ও জোবায়ের তাকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছেন। তাছাড়া উক্ত এলাকার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোঃ জেহাদুল ইসলাম শেখ সব সময় এ বেডের সবজি দেখাশুনা করেছেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন বলে তিনি জানান। 
এ প্রসঙ্গে তেরখাদা উপজেলা কৃষি অফিসার কাজী শাহনেওয়াজ জানান, ভাসমান বেডে সবজি চাষ একটি লাভজনক প্রযুক্তি। এ পদ্ধতিতে জলমগ্ন পতিত জমি চাষের আওতায় আনা যায়। এটি পরিবেশ বান্ধব ও জৈব পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে খুব কম সার ও বালাইনাশক ব্যবহার করে সবজি উৎপাদন করা যায়। চাষের খরচ তুলনামূলকভাবে কম। এতে জলাবদ্ধ এলাকার কচুরিপানা ও জলজ আগাছার সদ্ব্যবহার হয়। 
তিনি আরো জানান, তেরখাদা উপজেলার নিচু এলাকাসমূহ (বিশেষ করে ভূতিয়ার বিল, বড়নাল, বিলবাসুয়াখালি ও সলিমপুর) বর্ষা মৌসুমে প্রায় ছয় মাস (সাধারণত জুন থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত) জলমগ্ন ও পতিত থাকে। এ সময় এসব এলাকার জমি কচুরিপানা ও জলজ আগাছায় পূর্ণ থাকে। এ কারণে জলমগ্ন জমিতে কোনো ফসল চাষ করা সম্ভব হয় না। নিচু এলাকার এসব জলমগ্ন পতিত জমি চাষের আওতায় আনার লক্ষে তেরখাদা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে ‘ভাসমান বেডে সবজি ও মশলা চাষ গবেষণা, সম্প্রসারণ ও জনপ্রিয়করণ’ প্রকল্পের আওতায় এবছর খরিপ-২ মৌসুমে এসব এলাকায় ২২টি ভাসমান বেডে সবজি প্রদর্শনী স্থাপনের কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় আজগড়া ইউনিয়নের শ্রীপুর গ্রামে ২টি, পশ্চিম শেখপুরায় ১টি, বারাসাত ইউনিয়নের হাড়িখালি গ্রামে ১টি. বারাসাতে ৩টি, সাচিয়াদাহ ইউনিয়নের কামারোল গ্রামে ৩টি, নাচুনিয়ায় ১টি, কড়লিয়া গ্রামে ১টি, ছাগলাদাহ ইউনিয়নের নেবুদিয়া, চরকুশলা ও রাজনগর গ্রামে ১টি করে, তেরখাদা সদরে ৪টি, বলর্ধনা গ্রামে ২টি ও আদমপুর ১টি প্রদর্শনী বাস্তবায়িত হচ্ছে। ভাসমান বেডে সবজি চাষ এর প্রদর্শণীভূক্ত এসব কৃষকরা হলেন- ফারুক মোল্লা, শ্যাম সরকার, ছিয়ারুন নেছা, আসমা, এহিয়া, আব্বাস আলী, মনিরুজ্জামান, গোলাম মোস্তফা, নাজমা বেগম, বিউটি বেগম, মনোয়ারা বেগম, মৃনাল বিশ্বাস, দুলালী বিশ্বাস, হরিশ বিশ্বাস, অনিতা বিশ্বাস, ডালিম বেগম, সোহরাব মোল্লা, মান্নু শিকদার, বুরুজা খাতুন, মন্নু শেখ, জোসনা বেগম ও আব্দুল্লাহ শেখ। তাঁরা এসব ভাসমান বেডে এ মৌসুমে শসা, করলা, উচ্ছে, লাউ, বেগুন, মিষ্টি কুমড়া, মরিচ, ধনিয়া, ডাঁটাশাক, লালশাক, ঢেঁড়শ এসব সবজি চাষ করে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন বলে জানান।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জলমগ্ন জমিতে ভাসমান বেডে সবজি চাষ প্রযুক্তিটি এসব এলাকার কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ পদ্ধতিতে সবজি চাষ তাদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তারা আগামীতে আরো ব্যাপক এলাকার ভাসমান বেডে সবজি চাষ করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। 
সর্বোপরি, জলাবদ্ধ এলাকার দরিদ্র কৃষকদের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা এবং আর্থিক অবস্থার উন্নয়নের লক্ষে ভাসমান বেডে সবজি ও মশলা চাষ কৃষি প্রযুক্তিটি উন্নতকরণ ও এর সম্প্রসারণ করা একান্ত আবশ্যক। 

লেখক: উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস, তেরখাদা, খুলনা


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ




সবজি চাষে কৃষকের ভাগ্য বদল

সবজি চাষে কৃষকের ভাগ্য বদল

০৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ০১:১০








গলদার মূল্য হ্রাসে রেকর্ড

গলদার মূল্য হ্রাসে রেকর্ড

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০২:১০


ব্রেকিং নিউজ