খুলনা | বুধবার | ২৭ মার্চ ২০১৯ | ১৩ চৈত্র ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

গণ আদালতের রায়ে কপিলমুনিতে  মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় ১৫৬ রাজাকার

অলিউল্লাহ গাজী, কপিলমুনি | প্রকাশিত ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:১০:০০

গণ আদালতের রায়ে কপিলমুনিতে  মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় ১৫৬ রাজাকার

৪৮ ঘন্টা রক্ষক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে ১৫৬ রাজাকারের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ খুলনার সর্ব বৃহৎ শত্র“ ঘাঁটির পতন ঘটে। ঐ দিন উপস্থিত হাজার হাজার জনতার রায়ে আত্মসমর্পণকৃত ১৫৬ জন রাজাকারকে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে রায় কার্যকর করা হয়। মুক্তিযোদ্ধাকালীন ইতিহাসে এই ব্যতিক্রম ঘটনার সাক্ষী কপিলমুনি সহচরী বিদ্যামন্দিরের খেলার মাঠ। 
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, তৎকালীন পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর দোসররা সারা দেশব্যাপী সাধারণ নিরীহ মানুষের উপর অবর্নণীয় অত্যচারের নির্যাতন চালাতে থাকে। আর এ অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকার মত জেলার পাইকগাছার সর্বত্র প্রতিরোধ দুর্গ গড়ে ওঠে। এ সময় পাক দোসররা বিশাল অস্ত্রে-শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঘাঁটি করে ঐতিহ্যবাহী কপিলমুনিতে। অত্যাচারি বহু পরিবার সে সময় বিদেশে পাড়ি জমায়। কপিলমুনির পরিত্যাক্ত স্বর্গীয় রায় সাহেব বিনোদ বিহারী সাধুর সুরম্য বাড়িটি পাকিস্তানি দোসররা ঘাঁটি হিসেবে বেছে নেয় এবং এলাকায় নিযার্তনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত থাকতো কার্ফু। এ সময় তারা এলাকায় নিরীহ মানুষেদের ধরে এনে কপোতাক্ষ নদের তীরে ফুলতলা নামক স্থানে শরীরের বিভিন্ন অংশে কেটে লবণ দিত। এমনকি ইট দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে লাশ নদীতে ফেলে দিত। এখানেই শেষ নয় এলাকার হিন্দুদের বসবাস বেশী থাকায় এখানকার হিন্দুদের উপর চলত অমানুষিক অত্যাচার নির্যাতন। তাদের ধন সম্পদ লুট, এমনকি তাদেরকে জোর করে হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্মেও দীক্ষিত করা হত। বাধ্য করা হতো মুসলমান ধর্ম গ্রহণে। এ সব অত্যাচারের বিরুদ্ধে পাইকগাছার রাড়–লি, বাঁকা, বোয়ালিয়া ও গড়–ইখালি মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্প গড়ে তোলে। খুলনাঞ্চলের মধ্যে কপিলমুনির শত্র“ ঘাঁটি ছিল সবচেয়ে বড় ঘাঁটি। সাড়ে ৩শ’র বেশি পাকসেনা ও তাদের দোসররা এখানে অবস্থান নেয়। ছাদের উপরে সব সময় তাক করা থাকত ভারী অস্ত্র, কামান ও মেশিনগান। ১৯৭১ সালের ১১ নভেম্বর ক্যাপ্টেন আরেফিনের নেতৃত্বে একদল মুক্তি বাহিনী প্রথমে কপিলমুনি রাজাকারদের ঘাঁটিতে আঘাত করে। কিন্তু সুরক্ষিত দুর্গ আর রাজাকারদের শক্ত অবস্থানের কারনে সেই যুদ্ধে কোন সফলতা পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে পুনরায় পরিকল্পনা করে দক্ষিন খুলনার বিভিন্ন এলাকার কমান্ডিং অফিসাররা উপজেলার রাড়–লীর বাঁকা ক্যাম্পে এসে সকলে একত্রিত হন এবং কপিলমুনিকে রাজাকার মুক্ত করতে পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ঐ সময় পরিকল্পনায় অংশ গ্রহণ করেন নৌ-কমান্ডার গাজী রহমত উল¬াহ দাদু, শেখ কামরুজ্জামান টুকু, স ম বাবর আলী, গাজী রফিক, ইউনুস আলী ইনু, ইঞ্জিনিয়ার মুজিবর রহমান, শেখ শাহাদাত হোসেন বাচ্চু, মোড়ল আব্দুস সালাম, আবুল কালাম আজাদসহ অনেকে কপিলমুনি মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযোদ্ধারা ৫টি ভাগে বিভক্ত হয়ে অবশেষে ৭ ডিসেম্বর রাতে চারিদিক থেকে কপিলমুনির শত্র“ ঘাঁটি আক্রমণ করে। দীর্ঘ যুদ্ধ শেষে ৯ ডিসেম্বর বেলা ১১টার দিকে অস্ত্র ফেলে সাদা পতাকা উড়িয়ে ১৫৬ জন রাজাকার পাকিস্তানি দোসররা আত্মসমর্পণ করে। সাথে সাথে পতন ঘটে খুলনাঞ্চলের বৃহত্তর শত্র“ ঘাঁটির। এই যুদ্ধে খুলনার আনোয়ার ও সাতক্ষীরার আশাশুনির গলডাঙ্গা গ্রামের গাজী আনসার আলী নামে দুই মুক্তিযোদ্ধা মৃত্যুবরণ করেন বলে জানিয়েছেন যুদ্ধকালীন কমান্ডার ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার শেখ শাহাদাৎ হোসেন বাচ্চু। শত্র“দের বন্দী করে নিয়ে আসা হয় কপিলমুনি সহচরী বিদ্যামন্দির ঐতিহাসিক ময়দানে। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে, এলাকার হাজার হাজার জনতার ঢল নামে ময়দানে। জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাৎক্ষণিক যুদ্ধকালীন কমান্ডাররা সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজাকারদের প্রকাশ্যে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে জনতার রায় কার্যকর করা হয়। যেটি ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমধর্মী অধ্যায়। বাস্তবায়িত হয় গণআদালতের রায়। 
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

একাত্তরের স্মৃতির রোডম্যাপ

একাত্তরের স্মৃতির রোডম্যাপ

২৬ মার্চ, ২০১৯ ০১:৪৩


স্বাধীনতা ও আমাদের প্রত্যাশা

স্বাধীনতা ও আমাদের প্রত্যাশা

২৬ মার্চ, ২০১৯ ০১:৪২




৭১ এর সেই কালো রাতের গল্প

৭১ এর সেই কালো রাতের গল্প

২৬ মার্চ, ২০১৯ ০১:৪০




১৯৭১ সালের এক ভয়াল রাত

১৯৭১ সালের এক ভয়াল রাত

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:১০

বাংলাদেশ

বাংলাদেশ

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:১০


ব্রেকিং নিউজ







একাত্তরের স্মৃতির রোডম্যাপ

একাত্তরের স্মৃতির রোডম্যাপ

২৬ মার্চ, ২০১৯ ০১:৪৩


স্বাধীনতা ও আমাদের প্রত্যাশা

স্বাধীনতা ও আমাদের প্রত্যাশা

২৬ মার্চ, ২০১৯ ০১:৪২