খুলনা | বুধবার | ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ | ৫ পৌষ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

বিশ্বনন্দিত মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)

মুহাম্মদ মাহফুজুর রহমান আশরাফী | প্রকাশিত ২১ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:১০:০০

শেখ সাদীর ভাষায়, “বালাগাল উলা বিকামালিহী/কাশাফাদ্দুজা বি জামালিহী হাসুনাত জামিউ খিসালিহী/সালু আলাইহি ওয়া আলিহী।”

পথভ্রস্ট মানুষকে পথ দেখানোর জন্য মহান রববুল আলামীন যুগে যুগে নবী রাসুল পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তারই ধারাবাহিকতায় হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসুল। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, “মুহাম্মদ তোমাদের পুরুষদের মধ্যে কারো পিতা নন। বরং তিনি হলেন আল্লাহ্র রাসূল এবং নবীদের ধারাবাহিকতা সমাপ্তকারী। (সূরা আহযাব, আয়াত নং-৪০), আরবসহ সারা বিশ্ব পৃথিবীতে যেন অন্যায়, অবিচার, অনাচার, অধম এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। আরবের অবস্থা ছিলো বেশী শোচনীয়, জ্ঞান-বিবেক, যুক্তি, বুদ্ধি, ধর্মচিন্তা শয়তানের নারকীয় উল্লাসে প্রকম্পিত হচ্ছিলো। আকাশ, বাতাশ, যখন অন্ধোকারে নিমিজ্জিত হয়েছিল, জগতে শান্তি বলে কিছুই ছিলনা, অশান্তির আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিল, ঠিক সেই সময় শান্তির পয়গাম নিয়ে ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার সুহবে সাদিকের সময় মহানবী হযরত মুহাম্মদ বিশ্ববাসীর কাছে রহমত স্বরূপ এই দুনিয়াতে আগমন করলেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, “আপনাকে কেবল সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত হিসাবেই প্রেরণ করিয়াছি।” (সূরা আম্বিয়া, আয়াত নং-১০৭)।
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ছিলেন সর্বশেষ ও সর্বশ্রষ্ঠ নবী। আর মহান আল্লাহ্ তায়ালা ও মহা মানবকে শিশুকাল থেকেই অতান্ত ভদ্র, নম্র, বিনয়ী, সত্যবাদী, বিশ্বস্ত তথা সার্বিক দিক থেকে উত্তম চরিত্রের অধিকারী করে গড়ে তোলেন, যার কারনে আরববাসীরা তার কাছে আমানতদার হিসেবে টাকা পয়সা, মালামাল গচ্ছিত রাখতো। মহান আল্লাহ্ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন, “আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিষ্ঠিত।” (সূরা কলম, আয়াত নং-৫) আল্লামা সায়্যিদ কুতুব বলেন, “ইহা হচ্ছে স্বয়ং আল্লাহর স্বাক্ষ্য, আল্লাহ্র নিজস্ব মানদন্ডে নিজের একান্ত প্রিয় বান্দার মূল্যায়ন এই যে, তুমি অতি উন্নত ও মহৎ চরিত্রের অধিকারী। স্বয়ং আল্লাহ্ তায়ালা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) চরিত্রের সার্টিফিকেট প্রদান করে বলেন, “তোমাদের জন্য আল্লাহ্র রাসূলের মধ্যে রহিয়াছে উত্তম আদর্শ” তিনি ছিলেন শিশুকাল থেকেই অত্যন্ত ভদ্র, নম্্র, বিনয়ী।” (সূরা আহযাব, আয়াতন নং-২১), সত্যবাদী, বিশ্ববন্দু, যার কারণে তিনি নবুয়াত পাওয়ার পূবেই স্বজাতির মধ্যে থেকে “আল-আমীন” উপাধি লাভ করেন। 
তাকওয়া বা আল্লাহ্ ভীতি ঃ নবী করিম (সাঃ) সভার চেয়ে বেশী তাকওয়া অবলম্বনকারী ছিলেন। তিনি গোপনে ও প্রকাশ্যে মহান আল্লাহকে সবচেয়ে বেশী ভয় করছেন। হযরত আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেন, “আল্লাহ্ সম্পর্কে আমি তাদের চেয়ে বেশী অবগত এবং আল্লাহকে আমি তাদের চেয়ে বেশী ভয় করি। (বুখারী, হাদিস নং-৫৭৫০)
ধৈর্য ও সহনশীলতা ঃ ধৈর্য, সহনশীলতা ও ক্রোধ সংবরনে আল্লাহ্র নবী ছিলেন অনুপম আদর্শ। শত্র“দের শত বাধা বিপত্তি, নির্যাতন সত্ত্বেও কখনো তাঁর পক্ষ থেকে কোন প্রতিশোধ নেয়া হয়নি। এমনকি কখনো কোন সেবক বা কোন স্ত্রীকে গাল মন্দ ও প্রহার করেনি। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা ব্যতীত তিনি কখনো কাউকে স্বীয় হাতের দ্বারা প্রহার করেন নি। এমনকি উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ এর মুখমন্ডল আঘাত প্রাপ্ত হয় এবং কয়েকটি দাঁত ভেঙে গেল। মাথায় পরিধেয় শিরস্রান খন্ড বিখন্ড হল। তার পরেও তিনি কুরাইশদের বিরুদ্ধে বদ-দু’আ করেননি। মহা ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। বরং তিনি বলেছেন “হে আল্লাহ্! আমার জাতিকে ক্ষমা করুন, কেননা, তারা জানেনা।” 
সমাজ সংস্কারের মহা প্রবর্তক ঃ আইয়ামে জাহিলিয়ার পাপাসক্ত সমাজে আগাছা পরিস্কার করে একটি শাক্তিপূর্ণ তাওহিদ ভিত্তিক সমাজ নির্মাণ করেছিলেন। সামাজিক সাম্য, অকৃত্রিম ভ্রাতৃত্ব এবং মানবতার ভিত্তিতে সমাজ গঠন করেছিলেন। নারীদের কে, কন্যা, স্ত্রী ও মায়ের মর্যাদা দান করে ঘোষণা দিলেন, “মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত” অথচ জাহেলিয়ার যুগে নারীদের কোন মর্যাদা ছিলোনা, প্রাচীন যুগে নারী জাতিতে “বোতলা” বলে ডাকা হত এবং জীবন্ত কবর দেয়া হত। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, “যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে।” (সূরা তাকবীর, আয়াত নং-৮) গোত্রীয় দ্বন্দের অবসান, দাসত্ব প্রথা উচ্ছেদ, ভিক্ষাবৃত্তির উচ্ছেদ, প্রতিবেশীর অধিকার, আর্থ-সামাজিক অসাধুতা দূর অর্থাৎ প্রতারণা, মিথ্যাচার, দুর্নীতি, হঠকারিতা, কালোবাজারী, মজুতদারী, স্বজনপ্রতি ও আত্মীকরণ ইত্যাদি সকল অনাচার অনাসৃষ্টি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। 
শান্তির অগ্রদূত শেষ নবী ঃ বিশ্ব গণতন্ত্র ও বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের প্রতিষ্ঠায় যার ছিল অনান্য পদক্ষেপ, খ্রীস্টান, ইহুদী, অন্যান্যদের শান্তি ও সন্ধিচুক্তি, বিশেষ করে হুদায়বিয়ার সন্ধি ছিল বিশেষ উদাহরণ। বিচারক হিসেবে শেষ নবী কখন পক্ষপাতিত সালিশ বিচার করেননি, আরবের ফাতেমা নামে এক যুবতী চুরি করার দায় তার হাত কাটার নির্দেশ দেন। এবং পরিস্কার ভাষায় বলেন, “যদি আমার নিজ কন্যা ফাতেমা আজ চুরি করলে তাঁর হাত টাকার নির্দেশ দিতাম। নবী করিম (সাঃ) বলেন, “চল্লিশ বছরের নফল ইবাদতের অপেক্ষা একটি ন্যায় বিচার শ্রেষ্ঠ। সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি স্থাপনে তাঁর অবদান ছিল অপরিসীম। সংখ্যালঘুদের জন্য তিনি অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করে ছিলেন। তিনি কারও উপর আক্রমন করেন নি, বরং তিনি নিজেই আক্রান্ত হয়েছিলেন। জীবনে যতগুলো যুদ্ধো হয়ে ছিল তার কারণ বিশ্লেষণ করলে দেয়া যায়, আল্লাহ্ নবী যুদ্ধো করেননি তাকে যুদ্ধো করতে বাধ্য করা হয়েছিল। যিনি ছিলেন মুকুটবিহীন সম্রাট। নিজের শান্তির জন্য তেমন কিছু করেন নি। সারাজীবন জাতির মুক্তি ও কল্যাণের জন্য কাজ করেগেছেন, যা উপলদ্ধি করছিলেন খুব কম বয়সে, তাই সমাজে শান্তির জন্য “হিলফুল ফুজুল” নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করছিলেন। 
সর্বজনীন উত্তম আদর্শ ঃ সারা জীবন লিখলে যার জীবনী ও তার ইতিহাস লেখা শেষ হবেনা, তিনি হলেন, মানবতার বন্ধু হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)। তাঁর চরিত্র মাধুরী, সততা, উদারতা, সহিষ্ণুতার উদাহরন সারা দুনিয়াব্যাপী, তাঁর মত সুন্দর মানুষ দুনিয়াতে আসেনি এবং আর আসবেনা। যিনি ৬৩ বছর বয়সে একটি মিথ্যা কথা বলেননি এমন দৃষ্টান্ত জগতে নজীরবিহীন। ইয়াতীম অসহায়ের প্রতি, গরীবদের প্রতি, মাজলুম জনতার প্রতি যার ছিল অঢেল দরদ। এমনকি জীবজন্ত, পশু  প্রাণির প্রতি ও ছিল তার ভালোবাসা। শিশুদের প্রতি ছিল অনেক স্নেহ ও মমতা। যার জীবন ছিল বিশ্ববাসীর কাছে খোলা মেলা। বিশ্বের এমন কোন নেতা নেই যার জীবনের ইতিহাস প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) জীবনের প্রথম  অর্থাৎ জন্ম হতে জীবনের শেষ দিন মৃত্যু পর্যন্ত সব ইতিহাস স্পষ্টভাবে যানা যায়। আবু তালিবের ঘরে শেষ পালক বালক শেষ নবী হতে সিরিয়ার বাণিজ্য পথে বণিকরূপে শেষ নবী। খাদিজার নিষ্ঠাবান কৃতকার্য কর্মচারী হতে খাদিজার প্রাণপ্রিয় স্বামীরূপে শেষ নবী। স্ত্রী-পুত্র, কন্যা নিয়ে প্রকৃত সংসারী শেষ নবী হতে হেরা গুহায় মোরাকাবায় শিক্ষার ও জ্ঞানের ধ্যানস্থ শেষ নবী। জীবনের এ বহু বিচিত্র জ্ঞানের অধিকারী মানুষের চরিত্রকে জানার আর কোন অসুবিধে নেই। যার যে দিকে ইচ্ছে, তিনি সে দিকই জেনে নিতে পারেন। এক কথায় বলা যায়, বিশ্ব নবীর চরিত্র ছিল “পবিত্র কুরআনের ন্যায়” আজ সারা বিশ্বের অশান্তির লেলিহান বদ্ধ করার জন্য হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর অনুসরণ ও অনুকরণ এবং তাঁর জীবন আদর্শ মেনে নেযা ছাড়া আর কোন বিকল্প পথ নেই। তাহলে হবে, সমগ্র মানব মন্ডলীর ও অখন্ড মানবতার এক চূড়ান্ত উত্তরণ। আজ নবী দিবসে এই হাউক সকলে দীপ্ত শপথ। আমিন ছুম্মা আমিন। 
লেখক ঃ মুফাসিরে কুরআন ও প্রভাষক। ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, মাতৃভাষা ডিগ্রি কলেজ, শরণ খোলা, বাগেরহাট।
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ


বঙ্গবন্ধুই আমার প্রেরণা 

বঙ্গবন্ধুই আমার প্রেরণা 

১৫ অগাস্ট, ২০১৮ ০০:৫০







সমাজ ও গ্রন্থাগার

সমাজ ও গ্রন্থাগার

০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ০০:০০


জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ

জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ

১০ জানুয়ারী, ২০১৮ ০০:২৩

এই ছবিটি যেন ‘বিরল’ হয়ে না থাকে

এই ছবিটি যেন ‘বিরল’ হয়ে না থাকে

২১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০


ব্রেকিং নিউজ