খুলনা | শনিবার | ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮ | ১ পৌষ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

পুলিশ মেমোরিয়াল ডে

কাজী মোতাহার রহমান | প্রকাশিত ০২ মার্চ, ২০১৭ ০০:৩৪:০০

ব্রিটিশ শ্বাসিত ভারতবর্ষে পুলিশি ব্যবস্থার গোড়াপত্তন। এ ভূখন্ডে পুলিশ প্রশাসনের কার্যকাল ১৪শ’ বছরের বেশি সময়। মোগল আমলে বিচার বিভাগের অনুষঙ্গ হিসেবে গড়ে ওঠে শক্তিশালী পুলিশ বিভাগ। সে আমলে শহরে পুলিশ প্রশাসনের বাইরে সমগ্র প্রদেশের গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে মিশ্র পুলিশ প্রশাসন ছিল। মোগল শাসনের সাড়ে ৪শ’ বছর ধরে একমাত্র ফৌজদারেরই দায়িত্ব ছিল রাজ্যের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করা। আইন-ই আকবর থেকে জানাযায়, শহরের শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব কোতোয়াল নামক পুলিশ অফিসারের ওপর। বাংলার জমিনদারী প্রশাসন প্রাচীর সামন্ত রাজাদের বিচার ও পুলিশের উত্তরাধিকারী। নবাব সিরাজের পতনের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যামানায় (১৭৫৭-১৯৪৭) আধুনিক পুলিশের কাঠামোর সূত্রপাত। জনগণের শান্তির জন্য বিচার প্রশাসনের দিকে ইংরেজ শাসক ওয়ারেন হেস্টিংস অনেক আগ্রহ দেখান। ১৮৮৭ সালে ইংরেজ শাসক লর্ড কর্ণওয়ালিস ইংল্যান্ড থেকে এ দেশে এসে সমস্যা মোকাবেলায় একটি নিয়মিত পুলিশ বাহিনী গঠনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। নতুন পুলিশ প্রথা কমিশনের সিদ্ধান্তের তুলনায় ভাল হলেও এ সময়ে পুলিশ বাহিনী ছিল অদক্ষ ও দুর্নীতিগ্রস্ত। আমাদের দেশে পুলিশ বাহিনীর ভিত্তি স্থাপিত হয় ১৮৬১ সালে ৫নম্বর আইনের দ্বারা। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের অভ্যুদয়ের পর ১৯৪৮ সালে বৈষম্যের কারণে পুলিশ বাহিনী ধর্মঘট করে। ৪৮ এ পুলিশের বিদ্রোহের পর পূর্ব পাকিস্তান সরকারের টনক নড়ে। তখন পুলিশ বাহিনীতে সংস্কার হয়। পুলিশ বিভাগের উন্নয়ন ও সংস্কারে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়িত না হওয়ায় ১৯৫৫ সালে ঢাকায় পুলিশ বিদ্রোহ হয়। যুক্তফ্রন্ট সরকারের আশ্বাসে ধর্মঘট প্রত্যাহার হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি ভাষা আন্দোলনে পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবী পুলিশের গুলিতে এ দেশের বীর সন্তানেরা শহিদ হয়। তখন পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের পুলিশের আরো বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। বেতন ও সুযোগ-সবিধা ছিল দু’রকমের। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা থেকে স্বাধীকারের বিষয় স্পষ্ট হওয়ায় বাঙালি পুলিশ বিদ্রোহের মানসিক প্রস্তুতি নেয়। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী ২৫ মার্চ রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে হামলা করলে বাঙালি পুলিশ সশস্ত্রযুদ্ধে অবতরণ হয়। হাজার হাজার পুলিশ সদস্য শহিদ হন। প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে বলতে হয় ২৭ মার্চ খুলনা শহরের বয়রার কাছে প্রতিরোধ যুদ্ধে পুলিশের হাবিলদার মোফাজ্জেল হোসেন শহিদ হয়। বয়রা বাজারের কাছে তার দাফন সম্পন্ন হয় (ডক্টর শেখ গাউস মিয়া রচিত মহানগরী খুলনার আলোকে)। ২৬ মার্চ দৌলতপুর কালিবাড়ির কাছে রেজাউল হক নামে এবং ফুলবাড়িগেট এলাকায় প্রতিরোধ যুদ্ধে মুন্সী মোজাম্মেল হক শহিদ হন। ২৫ মার্চ রাত ৩টা নাগাদ খালিশপুর পিপলস জুট মিলে অবস্থিত পুলিশ ফাঁড়ির ওয়্যারলেস অপারেটর আফিল উদ্দীন ওয়্যারলেস চালু করেন। জেলা পুলিশ ওয়্যারলেস অপারেটর গাজী মউনুদ্দীন শিল্পাঞ্চলের অপারেটরকে জানান পাকিস্তানী সেনারা খুলনা জেলা পুলিশ ওয়্যারলেস অফিসে আক্রমণ করেছে। পাকিস্তানী সেনারা জেলা পুলিশ সুপার আব্দুল রকিব খন্দকারকেও গ্রেফতার করে। রাত ২টা নাগাদ জেলা পুলিশ লাইনে সেনাবাহিনী অবিরাম গুলি চালায়। তারা ব্যর্থ হয়ে অফিসার্স ক্লাব ক্যাম্পে ফিরে আসে। ১৭ ডিসেম্বর ভোরে আইডব্লিউটিএ ভবনে পাকিস্তানী পতাকা নামানোর সময় পুলিশ কর্মকর্তা এম এম আমিনুল ইসলামকে পাকিস্তান বাহিনী গুলি করে হত্যা করে। স্বাধীনতার পর আমাদের পুলিশ বাহিনী দক্ষতার সাথে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে প্রচেষ্টা চালায়। ৭৩ সালে নকশাল ও অস্ত্রধারীদের গ্রেফতার করার পাশাপাশি স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে তাদের তৎপরতা ছিল প্রশংসনীয়। দক্ষিণাঞ্চলে ৯০ এর দশকে চরমপন্থী দমনেও পুলিশের সাহসী ভূমিকা সকল মহলে প্রশংসনীয় ছিল। জেএমবি ও জঙ্গি দমনে পুলিশ বাহিনী অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। অপরাধী দমন এবং কর্তব্য পালন করার সময় ২০০৭ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আবুল হাসান মোল্লা, কঙ্কন কুমার মন্ডল, আব্দুস সালাম, লোকমান হোসেন, শাহাজাহান শেখ, জুলফিকার আলী, প্রদীপ কুমার সরকার, নাসির উদ্দীন সরকার, মোসলেম আলী ও কয়রায় মফিজুল ইসলাম নিহত হয়। কর্তব্যরত অবস্থায় নিহত ও মৃত পুলিশ সদস্যদের স্মৃতি রক্ষার্থে আজ মেট্টো পলিটন পুলিশ লাইনে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গর্বিত পুলিশ সদস্যদের উপর গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করবেন। দীর্ঘদিন পরে হলেও এ ধরেণের উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। এর মধ্যদিয়ে পুলিশ বাহিনীতে উৎসাহিত হবে। নিহত পরিবারবর্গ সান্তনা খুঁজে পাবে। এই প্রেক্ষাপটে গেল ১৪শ’ বছরের বিভিন্ন দাঙ্গা দমনে, মুক্তিযুদ্ধে, জঙ্গি দমনে এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সহায়তায় নিহত পুলিশদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি। ‘পুলিশ মেমোরিয়াল ডে’ চির স্মরণীয় হয়ে থাকুক। গর্বিত পুলিশদের সাহসী ভূমিকা কর্মরতদের অনুপ্রেরণা যোগাবে। দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। আজকের দিনে আমাদের প্রত্যাশা পুলিশ জনগণের বন্ধু হিসেবে সেবায় নিয়োজিত হবে।

 

বার পঠিত

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ



বঙ্গবন্ধুই আমার প্রেরণা 

বঙ্গবন্ধুই আমার প্রেরণা 

১৫ অগাস্ট, ২০১৮ ০০:৫০







সমাজ ও গ্রন্থাগার

সমাজ ও গ্রন্থাগার

০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ০০:০০


জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ

জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ

১০ জানুয়ারী, ২০১৮ ০০:২৩


ব্রেকিং নিউজ