খুলনা | শুক্রবার | ১৮ জানুয়ারী ২০১৯ | ৪ মাঘ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

‘ডায়াবেটিস প্রতিটি পরিবারের উদ্বেগ’

ডাঃ এম বি জামান | প্রকাশিত ১৪ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:১০:০০

১৯৯১ সাল থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ও আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশন এর যৌথ সিদ্ধান্তে প্রতি বছর ১৪ নভেম্বর বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস পালন করা হয়। মূলতঃ ইনসুলিনের আবিষ্কারক নোবেল বিজয়ী চিকিৎসক ফ্রেডারিক ব্যান্টিং-এর জন্মদিনকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যই এই দিনটিকে নির্বাচন করা হয়েছে। ফেডারিক ব্যান্টিং তার সহযোগী গবেষক চার্লস বেস্টকে সাথে নিয়ে অধ্যাপক ম্যাকলিয়ডের গবেষণাগারে ১৯২১ সালে ডায়াবেটিস রোগের মহৌষদ ইনসুলিন আবিস্কার করেন। পরবর্তীতে তাদের সবাইকে চিকিৎসা শাস্ত্রের এই মূল্যবান আবেদনের স্বীকৃতি স্বরূপ নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। 
বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছেঃ “ডায়াবেটিস প্রতিটি পরিবারের উদ্বেগ”। এই প্রতিপাদ্য থেকে এটা স্পষ্ট যে পরিবর্তীত জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসের কারণে প্রতিটি পরিবারেই রয়েছে ভবিষ্যৎ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে। তা ছাড়া যে সব পরিবারে ডায়াবেটিস আছে তাদেরও ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগে কাটাতে হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে নগরায়ণ ও পরিবর্তীত জীবনধারনের কারণে যেমন ডায়াবেটিস বাড়ছে তেমনি গর্ভকালীন ডাযাবেটিসের সংখ্যাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায় অপরিকল্পিত গর্ভধারণের কারণে শিশু অপুষ্টির শিকার হলে এবং সেই শিশু পূর্ণবয়স্ক হবার পর অতিরিক্ত ওজন হলে তার ডায়াবেটিস হবার ঝুঁকি বহুগুণ বেশি থাকে। প্রয়োজনীয় সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি প্রসবকালীন নারী ও শিশু মৃত্যুর হার যেমন কমানো সম্ভব হবে, তেমনি নারীসহ আগামী প্রজন্মকেও ডায়াবেটিসের ভয়াবহ প্রকোপ থেকে অনেকাংশে রক্ষা করা সম্ভব হবে। 
দীর্ঘমেয়াদী, ব্যয়বহুল ও ক্ষয়িষ্ণু এই ডায়াবেটিস রোগকে প্রতিরোধ করার জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর সর্বসম্মতিক্রমে একটি বিল পাশ করেছে এবং সেটি বাস্তবায়নের লক্ষে এক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তারই পথ ধরে ২০০৭ সাল থেকে প্রতি বছর বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসকে জাতিসংঘের একটি দিবস হিসাবে গণ্য করা হয়। দেশে দেশে ব্যাপক প্রচারণা ও গণসচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ দিবসটি পালিত হয়। যার মূল লক্ষ হচ্ছে ডায়াবেটিস রোগের লক্ষণ, চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণ রাখার ব্যবস্থা সম্পর্কে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করা। 
পৃথিবীতে প্রতি ১০ সেকেন্ডে ১ জন ডায়াবেটিস রোগীর মৃত্যু হয় পক্ষান্তরে ২ জন নতুন ডায়াবেটিস রোগী সনাক্ত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য ও ডায়াবেটিক ফেডারেশনের দেয়া এই তথ্য স্বভাবতই আমাদের চমকে দেয়। বলা হয়ে থাকে হৃদরোগ, ক্যান্সার এর পাশাপাশি নিরব ঘাতক নামে খ্যাত এই ডায়াবেটিস অতি দ্রুত মহামারী আকারে দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। 
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় ৪১.৫ কোটির অধিক লোক এই রোগে আক্রান্ত এবং বাংলাদেশে এর সংখ্যা ৮৪ লক্ষাধিক। ২০৪০ সাল নাগাদ সারা বিশ্বে এর সংখ্যা ৬৪ কোটির বেশী ছড়িয়ে যাবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় এ রোগের ব্যপকতা খুবই বেশী। এখানকার  কোন কোন রোগীর সংখ্যা প্রতি দশকে দ্বিগুন হারে বেড়ে যাচ্ছে। জাতিগত অবস্থান, গড় আয়ু বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ন, অসামঞ্জস্য খাদ্যাভ্যাস, খেলাধুলা ও শরীর চর্চার সীমাবদ্ধতা এবং বর্ধিত মানসিক চাপের গোলক ধাঁ ধাঁ এ রোগ বৃদ্ধির প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। 
উল্লেখ্য যে বাংলাদেশে শহরাঞ্চলে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা আনুমানিক শতকরা ১০.৫ ভাগ এবং গ্রামাঞ্চলে এর সংখ্যা শতকরা ৪.২ ভাগ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে ৪০-৫৯ বছরের মধ্যে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বেশী পাওয়া যাচ্ছে। 
ডায়াবেটিস একটি বিপাকজনিত রোগ যা সারাজীবনের জন্য হয়ে থাকে। সুচিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায় তবে ছোঁয়াচে নয়। অনিন্ত্রিত ডায়াবেটি থেকে হৃতরোগ, কিডনী রোগ, দন্তরোগ, চর্মরোগ, অন্ধত্ব ও পক্ষাতসহ নানা ধরনের রোগ দেখা দিতে পারে। ফলশ্র“তিতে এক ডায়াবেটিস রোগ বহুরোগে রূপান্তরিত হয়। চিকিৎসার ব্যয়ভার বেড়ে যায় বহুগুন। অনেক সময় রোগীদের ক্ষেত্রে এই ব্যয় বহন করা অসম্ভব হয়ে উঠে। যা পক্ষান্তরে দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামের উপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করছে। শুধুমাত্র ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনের ব্যয়ভার যে কোন দেশের স্বাস্থ্যসেবা বাজেটের ৫ থেকে ১০ শতাংশ গিয়ে দাঁড়িয়েছে যা ভবিষ্যতে আরও বাড়ার আশংকা করা হচ্ছে। 
ডায়াবেটিস অনেক ক্ষেত্রে কোন লক্ষণ ছাড়াই সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ধরা পড়ে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অথচ উপসর্গহীনতার কারণে শতকরা ৫০ বাগ রুগীই জানে না যে তাদের ডায়াবেটিস আছে। তাই অনেক সময় রুগীরা আমাদের কাছে ডায়াবেটিসের মারাত্মক জটিলতা নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসেন। ডায়াবেটিস যে কোন বয়সে যে কোন সময়ে হতে পারে। ডায়াবেটিসের জন্য বংশগত প্রভাব দু’টোই দায়ী। যাদের বংশে ডায়াবেটিস আছে, ওজন বেশী, ব্যায়াম কিংবা শারিরীক পরিশ্রম করেন না তাদের ডায়াবেটিস  হওয়ার সম্ভাবনা থাকে খুবই বেশী। 
ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে হলে সবার জন্য নিয়মিত ব্যায়াম, পরিমিত সুষম খাবার, ওজন বেশী থাকলে কমিয়ে নেয়া এবং মাঝে মধ্যে বছরে অন্ততঃপক্ষে দু’বার রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা করে নিজের অবস্থান জেনে নিবেন। আর যাদের ইতিমধ্যে ডায়াবেটিস হয়ে গেছে তারা এগুলোর পাশাপাশি সঠিক জ্ঞান ও নিয়মিত সুচিকিৎসার মাধ্যমে এর জটিলতা প্রতিরোধ করতে পারবেন। ডায়াবেটিস স্বাস্থ্য সেবা একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা। এখানে চিকিৎসকের স্বাস্থ্যসেবা ও পরামর্শ গ্রহণের পাশাপাশি রোগীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ও তার পরিবারের সদস্যদের একান্ত সহযোগিতা প্রয়োজন। চিকিৎসার সুফল নির্ভর করে রোগীদের সঠিক জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গী এবং তার ধারাবাহিক অনুশীলনের উপর। শুধুমাত্র তাহলেই ডায়াবেটিস ও তার জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব। 
ডায়াবেটিস সম্পর্কে একটি কথা পরিস্কার হয়ে যাওয়া দরকার তা হল এ রোগ সারে না তবে তার অর্থ এই নয় যে, রোগীর ভবিষ্যত একেবারেই অন্ধকার। শৃঙ্খলাই জীবন এই মূলমতেস্ত্র উজ্জীবিত হয়ে পরিমিত খাদ্য, নিয়মিত ঔষধ ও সু-শৃঙ্খল জীবন এই তিনটি নীতিতে অটল থাকলে অবশ্যই স্বাভাবিকের কাছাকাছি জীবন যাপন করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে, যারাই স্বাস্থ্য সম্মত জীবন ব্যবস্থা মেনে চলবেন তারাই ডায়াবেটিস ও তার জটিলতা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবেন। আসুন সবাই মিলে ডায়াবেটিসকে বুঝতে চেষ্টা করি এবং আমাদের আগামী প্রজন্মকে ডায়াবেটিস থেকে রক্ষা করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করি তাহলেই স্বার্থক হবে আজকের বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসের কর্ম তৎপরতা।

লেখক ঃ সিনিয়র মেডিকেল অফিসার, খুলনা ডায়াবেটিকস হাসপাতাল। 
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ








স্তন ক্যান্সার: আমরা কতটা সচেতন?

স্তন ক্যান্সার: আমরা কতটা সচেতন?

০৩ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০৫

পাইলস রোগের সাধারণ আলোচনা

পাইলস রোগের সাধারণ আলোচনা

২৭ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০





ব্রেকিং নিউজ





নগরীতে পদ্মা তেল  ডিপোতে আগুন 

নগরীতে পদ্মা তেল  ডিপোতে আগুন 

১৮ জানুয়ারী, ২০১৯ ০০:৫৪