গায়েবি মামলায় থানা-আদালতে দৌড়াচ্ছে  বিএনপি ও সমমনা নেতা-কর্মীরা!


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে গণভবনে দু’দফায় ঐক্যফ্রন্টের সংলাপে সমাঝোতার দিকে দৃষ্টি ছিল দেশবাসীর। স্পষ্ট সমাঝোতা না হওয়ায় আন্দোলনের পথে হাঁটছে বিএনপি সমমনাদলগুলো। নির্বাচনমুখী আ’লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট। সরকারে থাকা এ জোটের সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থীরাও আগে ভাগে দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে প্রস্তুত। সম্ভাব্য এসব প্রার্থীরা পুরোদমে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে পড়েছেন। ক্ষমতাসীনরা প্রচারণায়, অন্যদিকে গায়েবি মামলায় থানা ও আদালতে দৌড়াচ্ছে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর নেতা-কর্মীরা। 
দলীয় সূত্রমতে, গত ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশের দায়ের করা মহানগরের ১৮টি মামলার কপি কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে পাঠিয়েছে নগর বিএনপি। নগরে বিএনপি নেতা-কর্মীদের নামে অন্তত ৭০টি রাজনৈতিক মামলা রয়েছে গত দশ বছরে। আর জেলা বিএনপি ৩৪টি মামলার কাগজপত্র পাঠিয়েছে কেন্দ্রে। সম্প্রতি নগরীতে ১২০ ও জেলা থেকে ২৫ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে অভিযোগ দলটির। এসব মামলায় এজাহারনামীয় ও অজ্ঞাত আসামি গ্রেফতারে প্রতিদিন অভিযানে নেতা-কর্মীদের হয়রানি করা হচ্ছে বলে বার বার অভিযোগ করেছে বিএনপি নেতৃবৃন্দ। নগর, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কমিটি তালিকা ধরে গ্রেফতার অভিযান চলছে বলে অভিযোগ তাদের। এতে বর্তমান ও সাবেক জনপ্রতিনিধি, আইনজীবী, পেশাজীবী এমনকি অরাজনৈতিক ব্যক্তিরা গ্রেফতারের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিএনপি তথা বিরোধী দল-মতের নেতা-কর্মী ও অনুসারীরা ঘর-বাড়ি ছেড়ে আত্মগোপনে দিনাতিপাত করছেন। একাধিকবার সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। এ অবস্থাকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সন্তোষজনক পূর্ব পরিস্থিতি নয় বলে সাম্প্রতিক ঘটনাবহুল নিয়ে মন্তব্য খুলনার অরাজনৈতিক বিশিষ্টজনদের।
এদিকে, গত সন্ধ্যায় ভোটের দিনক্ষণ নির্ধারণ করে তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। আজ থেকে দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ শুরু করলো আ’লীগ। একই সাথে আগামী ১১ নভেম্বর রবিবার থেকে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের জন্য ফরম বিতরণ শুরু হবে। অন্যদিকে, আজ শুক্রবার দুপুর ২টায় রাজশাহীর জনসভায় যাচ্ছে ড. কামাল হোসেন ও মির্জা ফখরুল ইসলামী আলমগীরের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট। সবমিলিয়ে দেশবাসীর দৃষ্টি এখন রাজনীতিতে আবদ্ধ।
এ সম্পর্কে সংবিধান প্রণেতা প্রবীণ আইনজীবী শেখ এনায়েত আলী বলেন, “সকল দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্যে অবশ্যই গণতন্ত্র চর্চা থাকতে হবে। দেশে কি এখন গণতন্ত্র আছে? রাষ্ট্রের সব স্বাধীন অরগ্যানগুলো নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। দেশবাসী আশা করেছিল-সংলাপে অর্থবহ কিছু একটাতো হবে। সমাঝোতা না হওয়ায় আন্দোলনে যাচ্ছে বিএনপি। তবে এখনো সময় আছে, দোয়া করি-বড় কোন সংকটে না পড়েই সমস্যা সমাধান হোক।” অংশ গ্রহণমূলক নির্বাচন হলে খুলনার ছয়টি আসনেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবে আ’লীগ ও বিএনপি।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের ‘সুজন’র বিভাগীয় সভাপতি অধ্যক্ষ জাফর ইমাম বলেন, ‘এমুহূর্তের অবস্থা খুব দ্রুত পরিবর্তন হবে, এমনটাই আশা করছি। অংশগ্রহণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে রেফারির ভূমিকা পালন করতে হবে। যেখানে সমান সুযোগ-সুবিধা পাবেন সকলেই। অহেতুক মামলায় বিরোধী দল-মতের নেতা-কর্মীদের নাজেহাল করা উচিত হয়। সুষ্ঠু সমাধান হলে ক্ষয়ক্ষতি থেকে মুক্তি পাবো সকলেই। গণতন্ত্রের সুফল পেতে সকলকেই ছাড় দিতে হবে।”
জনউদ্যোগ খুলনার আহ্বায়ক এড. কুদরতে-ই-খুদা বলেন, “মানুষ এখন রাজনীতি সম্পর্কে জানতে, বলতে ও শুনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। রাজনীতিকদের সৃষ্ট সংকটের সমাধান তাদেরই ভাল করে জানা। সকল রাজনীতিকই তো ভাল এবং জনগনের কল্যাণের প্রস্তুতি দেন সকলেই। তাহলে সকলে মিলে কেন সমস্যা সমাধান করছেন না।?”
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার বিভাগীয় সমন্বয়ক এড. মোমিনুল ইসলাম বলেন, “ভোট নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। সকল নাগরিকের নির্বিঘœ ভোটাধিকার প্রয়োগের আয়োজনের দায়িত্ব রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের। কিন্তু সেই দায়িত্বশীলরা যদি দখলদার হয়ে উঠেন, তখন তো মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটে। নিরাপরাধীদের হয়রানি, অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কল্পকাহিনীর মামলায় নাজেহাল এখন নিত্যদিনকার ঘটনা। এসবের সমাধান রাষ্ট্রের পরিচালকদের করা উচিত। সাম্প্রতিক অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে-সব কিছু কেমন জানি ক্ষমতাসীনদের হাতের মুঠোয়। এ  অবস্থাকে সুষ্ঠু, অবাধ ও সর্বজন গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সম্পূর্ণ বিপরীত।”
জেলা বিএনপি’র সভাপতি এড. শফিকুল আলম মনা বলেন, “সুষ্ঠু নির্বাচন হলে খুলনা-১ থেকে ৬ পর্যন্ত প্রত্যেকটি আসনে বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী বিজয় লাভ করবে। যদিও সরকার সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে হাঁটছে না, তাহলে আন্দোলন ছাড়া বিকল্প কোন পথ দেখছি না। তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা কেন্দ্রের নির্দেশের অপেক্ষায়। কোন ঘটনা না ঘটিয়েই যদি গায়েবী মামলার আসামি হতে হয়, তাহলে নির্যাতিত সে সব নেতা-কর্মীর মনের ভাষাতো সরকারকে অনুভব করা উচিত।”
নগর বিএনপি’র সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, “ড. কামাল-ফখরুলের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট দেশকে সংকট থেকে উত্তোরণের তাগিদে ক্ষমতাসীনদের সংলাপে বসেছিলেন। সরকারের কোটে বল; অথচ সরকার ফ্যাসিবাদী অহমিকায় সংকট উত্তরণের পথে হাঁটলো না। তাহলে তো দুর্বার আন্দোলন ছাড়া সামনে কিছুই দেখছি না। নির্বাচন পরে হবে, আগে নির্বাচন ব্যবস্থায় অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট গ্রহণের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে আন্দোলন, আন্দোলন এবং আন্দোলন।”
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “জামায়াতের প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। দলীয়ভাবে আইনী বাধ্যবাধকতা থাকলে প্রয়োজনে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়া যেতে পারে। তবে আন্দোলনের মাধ্যমেই একটি অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ রচনা করতে হবে। আন্দোলনের বিকল্প কিছু নেই বলেও মনে করেন তিনি।”
খুলনা ১৪ দলীয় মহাজোটের সমন্বয়ক ও নগর আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ মিজানুর রহমান এমপি বলেন, “দলীয় মনোনয়ন দলের যেকোন নেতা-কর্মী চাইতেই পারেন। দলের সভানেত্রী যাকে যেখানে প্রয়োজন সেখানে মনোনীত করবেন। শুধু আ’লীগ নয়, দেশবাসী সংবিধান মোতাবেক নির্বাচনমুখী। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে শেখ হাসিনার বিকল্প কিছু নেই; এটা দেশবাসী ভালো করেই জানে। তাই সকলকে নৌকা প্রতীকে ভোট দেবার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।”


footer logo

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।