খুলনা | রবিবার | ১৮ নভেম্বর ২০১৮ | ৪ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

স্তন ক্যান্সার: আমরা কতটা সচেতন?

ডাঃ ফারুকুজ্জামান | প্রকাশিত ০৩ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০৫:০০

মাত্র দুই দিন আগেই শেষ হয়েছে অক্টোবর মাস, মাসটিতে বিশ্বব্যাপী “স্তন ক্যান্সার সচেতনতার মাস” হিসাবে পালিত হয়েছে। আমাদের দেশেও বিভিন্ন জায়গায় এ উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। সচেতনতা বাড়াতে সভা, সাইন্টিফিক সেমিনার, র‌্যালি, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ইত্যাদি অনেক কিছুই হয়েছে। এসব সচেতনতা কার্যক্রমের সব কিছুই চলেছে ভারী মেডিকেল বিষয়াদি নিয়ে, ইংরেজি ভাষায় (এমনকি ব্যানার, পোস্টার, শ্লোগান সবই ইংরেজি ভাষায়), যা একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা অত্যন্ত দুরূহ। চিকিৎসক হিসাবে আসলেই আমরা কতটুকু পেরেছি সাধারণ মানুষকে এই বিষয়ে সচেতন করতে তা ভাববার বিষয়?
কয়েকদিন আগে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারী বিভাগে ভর্তি হন আমেনা (ছদ্ম নাম)। বয়স ৩৬ বছর। কয়েক বছর ধরে বাম বুকে চাকার চিকিৎসা নিচ্ছিলেন এক গ্রাম্য ডাক্তারের কাছ থেকে। এখন বগল আর গলায় নতুন করে কয়েকটা চাকা বের হয়েছে। জানালেন শ্বাসকষ্টও হচ্ছে কয়েক সপ্তাহ ধরে। পরীক্ষা নিরীক্ষা থেকে বোঝা গেলো, স্তন ক্যান্সার, শেষ পর্যায়। ইতি মধ্যে ক্যান্সার বগল আর গলার লসিকা গ্রন্থিসহ ছড়িয়ে পড়েছে ফুসফুসে। ফুসফুসে পানি জমে গিয়ে শুরু হয়েছে শ্বাসকষ্ট। ভাবতে খারাপ লাগছিলো, সামনে বসা মানুষটির লাইফ এক্সপেক্টন্সি (সম্ভব্য জীবনকাল) আর মাত্র কয়েক মাস (তিনি সে খবর জানেন না)।
সায়রা বানু (ছদ্ম নাম)। বিধবা মহিলা, বয়স ৭০ ছুঁই ছুঁই। তারও সমস্যা বাম বুকে চাকা। দুই বছর ধরে হোমি চিকিৎসা নিয়েছেন। ভালো ছিলেন। কিন্তু দিন দিন চাকাটা বড় হয়ে যাচ্ছে। উপজেলার একটা ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে একটা আলট্রাসাউন্ড করিয়েছেন বুকের। রিপোর্ট এ বলা হয়েছে, ফাইব্রোএডেনোমা (এক ধরণের অপেক্ষাকৃত ভালো টিউমার, ক্যান্সার নয়)। শহরে এসে পড়লেন দালালের হাতে। তাদের ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে করিয়েছেন নানান পরীক্ষা নিরীক্ষা বুকে সুই ঢুকিয়ে মাংস পরীক্ষাও (FNAC) করা শেষ (তাতেও রিপোর্ট একই, ফাইব্রোএডেনোমা)। অবশেষে গেলেন শহরের এক প্রাইভেট ক্লিনিকে, কিন্তু অপেরেশনের খরচ বেশি হওয়াতে, ভর্তি হলেন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। নিশ্চিত হবার জন্য তাকে আবার FNAC পরীক্ষা করানো হলো। এবার রিপোর্ট সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্তন ক্যান্সার (Invasive Ductal Carcinoma)।  
আকলিমা (ছদ্ম নাম)। বয়স ৩২ বছর। পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে জানা গেলো স্তন ক্যান্সারের শেষ পর্যায়। তার স্বামী জানালেন, কয়েক মাস আগে থেকেই সহবাসের সময় তার স্ত্রীর বুকে শক্ত চাকা তিনি বুঝতে পারতেন, কিন্তু বাসার মুরুব্বিদের (মা, বোন, শাশুড়ি) সাথে আলাপ করে তারা জানতে পারেন, বাচ্চা বুকের দুধ খাওয়ানোর ফলে বুকে দুধ জমে গিয়ে এধরণের চাকা হওয়া স্বাভাবিক। তাই বিষয়টা তারা বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখেন নাই তখন।  
স্তন ক্যান্সার বিশ্বব্যাপী মহিলা রোগী মৃত্যুর অন্যতম কারণ । এই রোগের পর্যায় চারটি। প্রথম এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে এই রোগ অপেরেশনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। তৃতীয় পর্যায়ে অপেরেশনের পাশাপাশি সহ-চিকিৎসা হিসাবে নিতে হয় কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, হরমোন থেরাপি ইত্যাদি ফলাফল আশানরুপ। কিন্তু চতুর্থ বা শেষ পর্যায় নিরাময়যোগ্য নয়।     
স্তন ক্যান্সার চিকিৎসার প্রধান প্রতিবন্ধকতা সমূহ হলো: ১) এই রোগে আক্রান্ত রোগী প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন না (সমস্যা না হওয়া পর্যন্ত, তারা জিনিসটা গোপন রাখেন কিংবা হোমিও বা কবিরাজি চিকিৎসা গ্রহণ করেন), ২) অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকের অনভিজ্ঞতা, দালাল, অনির্ভরযোগ্য পরীক্ষার রিপোর্ট ইত্যাদি কারণেও সঠিক রোগ নির্ণয় বিলম্বিত হয়, ৩) আমাদের দেশে এখনো পর্যন্ত শুরু হয়নি কোনো ফ্রি স্ক্রীনিং প্রোগ্র্যাম (যেখানে বিনামূল্যে স্তন পরীক্ষা করে প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগ ধরা যায়, যে ব্যবস্থা অনেক উন্নত এবং অনুন্নত দেশেই ইতিমধ্যে চালু আছে), ৪) আমাদের মা বোনেরা এখনো পর্যন্ত “ সেলফ ব্রেস্ট এক্সামিনেশন” (নিজেই নিজের স্তনের অবস্থা অনুধাবন করার প্রশিক্ষণ) বিষয়টির সাথে পরিচিত নন।
আরেকটা কথা প্রয়োজন, এ বিষয়ে নারীদের পাশাপাশি, পুরুষদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে, সঠিক সময়ে লজ্জা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত।   

ডাঃ ফারুকুজ্জামান 
এমবিবিএস (সিএমসি), বিসিএস (স্বাস্থ্য),
এমআরসিএস (এডিনবার্গ, ইংল্যান্ড),
এমএস (সার্জারী)-বারডেম হাসপাতাল, ঢাকা,
সহকারী রেজিস্ট্রার, সার্জারী বিভাগ 
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ




পাইলস রোগের সাধারণ আলোচনা

পাইলস রোগের সাধারণ আলোচনা

২৭ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০










ব্রেকিং নিউজ