খুলনা | রবিবার | ১৮ নভেম্বর ২০১৮ | ৪ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

“তাওবা করার নিয়ম ও পদ্ধতি”

মুহাম্মদ মাহফুজুর রহমান আশরাফী | প্রকাশিত ২৬ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:১০:০০

তাওবা আরবী শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ প্রত্যাবর্তন করা, ফিরে আসা, ক্ষমা প্রার্থনা, অনুতাপ করা প্রভৃতি। পরিভাষায়, “কোন অন্যায় কাজ হয়ে যাবার পর অনুতাপ, অনুশোচনা করে সেই কাজের জন্যে ক্ষমা চাওয়া এবং সেই অন্যায় কাজ ছেড়ে ভাল কাজে ফিরে আসাকেই তাওবা বলে। মূলতঃ তাওবা বলতে যা বুঝি তাহলো, “অনুতাপের সাথে পাপ পরিহার করে আল্লাহ্র দিকে ফিরে আসার নাম তাওবা।” এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ তায়ালা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা সকলেই আল্লাহ্র কাছে তাওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার (সূরাঃ নূর আয়াত নং-৩১)। নবী করিম (সাঃ) বলেছেন, “হে লোক সকল, তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা কর এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আমি প্রতিদিন একশতবার তাওবা করে থাকি (মুসলিম)।
তাওবা গুনাহর ক্ষমার উপায় ঃ মানুষ শয়তানের ধোঁকায় পড়ে গুনাহ্ করে, আর এই গুনাহ্ থেকে পরিস্কার হওয়ার মাধ্যম হল, খালেস দিলে তাওবা পড়া, তাহলে মহান আল্লাহ্ বান্দাদের ক্ষমা করে দিবেন। পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে, “কেয়ামতের দিন তাদের শাস্তি দ্বিগুন হবে এবং তথায় লাঞ্চিত অবস্থায় চিরকাল বসবাস করবে, কিন্তু যারা তওবা করে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের গোনাহকে পূণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু” (সূরা ফুরকান, আয়াত নং-৬৯-৭০)।
তাওবা গুনাহর নিরাময়কারী ঃ যেমনিভাবে আল্লাহ্ তায়ালা প্রবৃত্তি ও শয়তান এই দুই শত্র“কে সৃষ্টি করেছেন যা মানব জাতিকে জাহান্নামের ভয়াবহ্ আগুনের দিকে নিয়ে যেতে চায়, তেমনিভাবে এ দু’শত্র“র প্রতিরোধ ও নিরাময়কারী ব্যবস্থাও সৃষ্টি করেছেন। তাই হচ্ছে তাওবাহ্ ও ইস্তিগফার। অতএব, আমাদের গুনাহ্ দূর করার হাতিয়ার হচ্ছে তাওবাহ্-ইস্তিগফার। যখনই গুনাহর কোনো বিষক্রিয়া আমাদের আক্রান্ত করে ফেলবে সাথে সাথে তাওবা-ইস্তিগফার নামক প্রতিষেধক ব্যবহার করে গুনাহর বিষক্রিয়া পানি করে দিতে হবে। 
প্রকৃত তাওবা কী ঃ তিনটি বিষয়ের সমষ্টি হলো খাঁটি তাওবা। সাধারণত এ বিষয়ে দু’টি শব্দই মানুষের মুখে বলতে শোনা যায় একটি ইস্তিগফার, অপরটি তাওবা। তাওবা মূলত আসল, আর ইস্তিগফার হলো তাওবার দিকে যাওয়ার পথ এই তাওবা তিনটি বিষয়ের সমষ্টি যতক্ষণ পর্যন্ত এই তিনটি বিষয় একত্রিত না হয়ে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাওবা পরিপূর্ণ হবেনা। উক্ত বিষয় তিনটি হলঃ (১) কৃত গুনাহর উপর লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া। (২) সংঘটিত গুনাহ্ তৎক্ষণাৎ ছেড়ে দেয়া। (৩) ভবিষ্যতে গুনাহ্ না করার দৃঢ় অঙ্গীকার করা। এ তিনের সমন্বয় যখন হবে, তখন তাওবা পরিপূর্ণ হবে। মহান আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, “হে ইমানদারগণ! তোমরা তাওবা কর আল্লাহ্র কাছে খাঁটি মনে” (সূরা তাহরীম, আয়াত নং-৮)।
তাওবার গুরুত্ব ও তাৎপর্য ঃ মূলতঃ কৃতপাপের জন্য অনুতপ্ত ও লজ্জিত হওয়ার নামই তাওবাহ্। নবী করিম (সাঃ) আরো বলেন, “যে ব্যক্তি পাপ থেকে তাওবা করে সে এমন হয়ে যায়, যেন তার কোন পাপই নেই” (মিশকাত, পৃষ্ঠা নং-২০৬)। অপর এক হাদিসে আছে, “আদম সন্তান সবাই পাপ করে থাকে, আর পাপীদের মধ্যে তারাই অধিক ভাল যারা বেশী বেশী তাওবা করে” (তিরমিযী ও ইবন মাজা, সূত্রঃ মিশকাত, পৃষ্ঠা নং-২০৪)। অন্য এক হাদিসে উল্লেখ আছে, মহান আল্লাহ্ পাপী বান্দার তাওবায় ঐ ব্যক্তির অপেক্ষা অধিক সন্তুষ্ট হন যে উটের পিঠে খাদ্য, পানীয় ও যাবতীয় প্রয়োজনীয় দ্রব্য সম্ভার বোঝাই করে উত্তপ্ত মরু প্রান্তর পাড়ি দিতে গিয়ে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়লো এবং পথিমধ্যে কোন মরুদ্যানের একটা ছায়ায় উট রেখে পরিশান্ত দেহ খানি মাটির উপর রেখে নিদ্রা গেলো। কিছুক্ষন পর সে ঘুম থেকে জেগে দেখলো সে, তার উটটি সেখানে নেই। ফলে সে অস্থির হয়ে উটটি খুঁজতে লাগলো এবং তার অবস্থা এমন হল যে, ক্ষুধা, তৃষ্ণায় কাতর হয়ে সে নিরাশ হয়ে পড়ল এবং একটি গাছের নিচে শুয়ে পড়লো। এ অবস্থায় সে হঠাৎ দেখতে পায় যে, তার উটটি খাদ্য, পানীয় ও সমস্ত দ্রব্যসম্ভারসহ তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। অতঃপর সে আনন্দের আতিশষ্যে ভুল বশত বাক্যটি উল্টা বলে ফেলল, “আল্লাহ্ আমি তোমার রব, আর তুমি আমার দাস!” (সূত্রঃ মিশকাত, পৃষ্ঠা নং-২০৩) মূলকথা খাদ্য, পানীয় ও সমস্ত দ্রব্যসম্ভারসহ উটটি ফিরে পেয়ে বেদুইন লোকটি যে রূপ আনন্দিত হয়েছিল, শয়তানের প্ররোচনায় খাহেশাতে নাফসানীর তাগিদে যখন কোন মানুষ গুহানের কাজ করার পর অনুতপ্ত হৃদয় তাওবা করে এবং গুনাহ্ মাফ চায়, আল্লাহ্ সে ব্যক্তির চাইতেও অধিক আনন্দিত হন। নবী করিম (সাঃ) বলেন, “পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়ার আগ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সে ব্যক্তি গুনাহের জন্য তাওবা করবে, তার তাওবা আল্লাহ্ তায়ালা কবুল করবেন”। (সূত্রঃ মেশকাত -২০৩)। কিন্তু যথা সময়ে তাওবা না করে মুমূর্ষ অবস্থায় অনুশোচনা করলে তা কোন কাজে আসবে না। মহান আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করছেন, “তাওবা তাদের জন্য নয়, যারা আজীবন মন্দ কাজ করে এবং তাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হলে সে বলে, আমি এখন তাওবা করছি, এবং তাওবা তাদের জন্য নয়, যারা মারা যায় কাফির অবস্থায়, এরাই তারা, যাদের জন্য আমি শাস্তির ব্যবস্থা করেছি (সূরা নিসাঃ আয়াত নং-১৮)। তাই আমাদের উচিত খালেস দিলে প্রকৃতভাবে খাঁটি তাওবা করা।
লেখক: মুফাসসিরে কোরআন ও প্রভাষক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, মাতৃভাষা ডিগ্রী কলেজ। শরণখোলা, বাগেরহাট।


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

আত্মহত্যা একটি মহাপাপ

আত্মহত্যা একটি মহাপাপ

১৬ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০৫



চেয়ারে বসে নামায ও শরয়ী হুকুম

চেয়ারে বসে নামায ও শরয়ী হুকুম

১৯ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:১০

“শরীয় বিধানে দেনমোহর”

“শরীয় বিধানে দেনমোহর”

১২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০৩

যে আগে সালাম দেয় সে অহংকার মুক্ত

যে আগে সালাম দেয় সে অহংকার মুক্ত

০৫ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:১০

“অকাল মৃত্যু” একটি ভ্রান্ত ধারণা

“অকাল মৃত্যু” একটি ভ্রান্ত ধারণা

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:১২


রহস্যময় আবে যমযম কূপ

রহস্যময় আবে যমযম কূপ

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০৯

পবিত্র আশুরা  ২১ সেপ্টেম্বর

পবিত্র আশুরা  ২১ সেপ্টেম্বর

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০


হজে গুনাহ মাফ হয়

হজে গুনাহ মাফ হয়

১৬ জুলাই, ২০১৮ ১৩:২৫


ব্রেকিং নিউজ