খুলনা | সোমবার | ১৯ নভেম্বর ২০১৮ | ৫ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

মৃত্যুর ১ বছর পর শেষ ইচ্ছা পূরণ হলো ইতালিয় নাগরিকের 

লাখো মানুষের ভালবাসায় মোংলায় সমাহিত হলেন ভিনদেশী মুক্তিযোদ্ধা ফাদার মারিনো রিগন

মাহমুদ হাসান, মোংলা  | প্রকাশিত ২২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:৫৩:০০


জাতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে লাখো মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হলেন ভিনদেশী মুক্তিযোদ্ধা ফাদার মারিনো রিগন। মৃত্যুর ১ বছর পর হলেও তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে মানুষের ঢল নামে মোংলা উপজেলা পরিষদের মাঠে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানের পর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, কেসিসি মেয়র, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ একে একে তাকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। তার ইচ্ছা অনুযায়ী গতকাল রবিবার বিকাল সাড়ে ৪টায় মোংলার শেহালাবুনিয়ায় সেন্ট পলস ক্যাথলীক গির্জার পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। 
গতকাল সকাল সাড়ে ৯টায় হেলিকপ্টার যোগে ঢাকা থেকে মোংলার শেখ রাসেল স্টেডিয়ামে রিগনের লাশ এসে পৌঁছায়। এখানে জেলা-উপজেলা প্রশাসন ও ক্যাথলিক মিশনের পক্ষ থেকে তার কফিন গ্রহণ করা হয়। এ সময় স্টেডিয়ামে হাজারো ভক্তরা জড়ো হন। হেলিকপ্টারে করে তার কফিন নিয়ে আসেন ফাদার মারিনো রিগনের ভাগ্নে মিঃ কস্টেভো, স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত লেঃ কর্নেল (অবঃ) কাজী সাজ্জাদ আলী জহির ‘বীর প্রতীক’, ইতালি দূতাবাসের বাংলাদেশের কনস্যুাল জেনারেল ইকবাল আহম্মেদসহ মুক্তিযোদ্ধা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি। সরকারের সাবেক সচিব নমিতা হালদারও এ সময় তার লাশ বহনকারী হেলিকপ্টারে ছিলেন। 
সকাল পোনে ১১টায় বাংলাদেশের পতাকাবাহী একটি ট্রাক তার কফিন নিয়ে যায় উপজেলা মাঠে। সেখানে তাকে বাগেরহাট জেলা পুলিশ সুপার পঙ্কজ চন্দ্র রায়ের নেতৃত্বে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। পরে তার কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান, কেসিসি মেয়র আলহাজ্ব তালুকদার আব্দুল খালেক, ইটালিয়ান রাষ্ট্রদূত মারিও পালমা, বাগেরহাট জেলা প্রশাসক তপন কুমার বিশ্বাস, মোংলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ রবিউল ইসলাম, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ফকির আবুল কালাম আজাদ, ডেপুটি কমান্ডার ও জেলা পরিষদের সদস্য শেখ আব্দুর রহমানসহ স্থানীয় ক্যাথলিক মিশনের পালক ও পুরোহিতরা। রাষ্ট্রীয় মর্যাদার পাশাপাশি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান এখানকার সর্বস্তরের মানুষ। পরে রিগনের প্রতিষ্ঠিত সেন্ট পল্স উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য নেয়া হয় কফিন।
শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী মৃত্যুর এক বছর ফাদার মারিনো রিগন পর লাল-সবুজের জমিনেই ফিরেছেন। এ দেশের মুক্তিযুদ্ধ ও শিক্ষা বিস্তারে তার ছিল অনান্য অবদান। ইতালিয়ান নাগরিক হলেও এ দেশের মানুষের কাছে তার কতটুকু জনপ্রিয় তা প্রমাণ করলো শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের ঢল। আর এ মানুষগুলোকে ফাদার রিগন কথা দিয়েছিলেন অনন্তকাল এদেশের মাটিতে ঘুমাতে চান তিনি। সে কথা রেখেছেন বাংলাদেশ সরকারসহ মোংলার সর্বস্তরের মানুষ। সর্বশেষ মোংলায় নিজ হাতে গড়া শেলাবুনিয়া ক্যাথলিক মিশনে ফিরে এসেছেন ফাদার মারিনো রিগন। 
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আলহাজ্ব তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে সহায়ক হিসেবে কাজ করেছেন মারিনো রিগন। তিনি ১৯৬৪ সালে কবি রবীন্দ্রনাথ রচিত গীতঞ্জলীসহ ৪০টিরও বেশী কাব্যগ্রন্থ ইতালিয় ভাষায় অনুবাদ করেন। এছাড়াও কবি জসিম উদ্দিন, শরৎচন্দ্র চট্রপধ্যায়, ও সুকান্ত ভট্টাচার্য ও লালন শাহ’র গান, কবিতা এবং কাব্যগ্রন্থ অনুবাদ করেন। সাহিত্য চর্চায় তিনি ১৯৮২ সালে ১৪ মার্চ কবি জসিমউদ্দিন একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় রিগন অসুস্থ ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় এবং সেবা দেয়ার মধ্যদিয়ে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখেন। এ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালে তাকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করে। 
মোংলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ রবিউল ইসলাম জানান, ফাদার মারিনো রিগন মোংলায় থাকাকালীন ২০১৪ সালের ফেব্র“য়ারিতে অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিবারের লোকজন তাকে ইতালিতে নিয়ে যান। এরপর সেখানেই তিনি মারা যান। মারা যাওয়ার দীর্ঘ এক বছর পর তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী মোংলায় এনে সমাহিত করা হলো। 
খুলনা বিভাগীয় বিশপ রেভাঃ জেমস রমেন বৈরাগী বলেন, ফাদার মারিনো রিগন ১৯২৫ সালের ৫ ফেব্র“য়ারী ইতালির ভেনিস শহরের অদুরে ভিচেন্সার ভিল্লা ভেলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা রিকার্ডো রিচার্ড রিগন একজন কৃষক ও সংস্কৃতমনা ছিলেন। মা ইতালিয়া মনিকা ছিলেন শিক্ষিকা। ৮ ভাই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। ২৬ বছর বয়সে ১৯৫১ সালের ১০ মার্চ খ্রিস্টয় ধর্মযাজক হিসেবে ইতালীর পিয়াছো শহরের জেভেরিয়ান সম্প্রদায়ের যাজক নির্বাচিত হন, এর পরে তিনি বাংলাদেশে আসেন। এদেশে আসার পর বাংলা সাহিত্য চর্চা শুরু করেন তিনি। শিক্ষায় তিনি ১৯৬৩-১৯৬৪ সালে কানাডায় সামাজিক নেতৃত্ব বিষয়ে ডিপ্লোমা অর্জন করেন। ভিনদেশী এ মানুষটি সেবা ধর্মের  পাশাপাশি এ দেশের সাহিত্য, শিক্ষা, দারিদ্র মোচন, চিকিৎসা, নারী উন্নয়নসহ সমাজের বিভিন্ন উন্নয়ন ও কল্যাণে নিজের অবদান রাখতে পিছ পা হননি। ফাদার মারিনো রিগন মনে প্রাণে একজন বাঙালী ছিলেন। তিনি দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে শেহালাবুনিয়া গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। এ দেশের মাটিতেই যেন মৃত্যু হয় এমন বাসনা ছিল তার। 
জেলা প্রসাশক তপন কুমার বিশ্বাস বলেন, আমার জানা মতে ১৯৫১ সালের ১০ মার্চ ইতালিতে ধর্ম যাজক হিসাবে অভিষেক ঘটে ফাদার রিগনের। এরপর ১৯৫৩ সালের ৭ জানুয়ারি তিনি বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) আসেন। সহকারী পালক পুরোহিত হিসাবে যোগ দেন কুস্টিয়ার ভবরপাড়া মিশন পল্লীতে। ১৯৫৪ সালে মোংলার মালগাজী মিশনে, ১৯৫৭ সালে খুলনায়, ১৯৬৪ সালে যশোর, ১৯৭০ সালে গোপালগঞ্জের বানিয়ারচর এবং ১৯৭৯ সাল থেকে মোংলার শেহালাবুনিয়ায় তিনি অবস্থান করেন। ফাদার মারিনো রিগন নামেই তিনি দেশ বিদেশে পরিচিত। পরিবারের ৮ ভাই-বোনের মধ্যে তিনিই বড়। খ্রিস্ট ধর্মযাজক হলেও তিনি সব ধর্মের মানুষের কাছে ছিলেন এক হাস্যোজ্জ্বল মানবপ্রেমী সাদা মনের মানুষ। তার কাছ থেকে দুঃখ পেয়েছেন এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুস্কর। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন তিনি বানিয়াচরে একটি চিকিৎসা কেন্দ্রে কর্মরত ছিলেন। সে সময়ে তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজ হাতে সেবা করেছেন অসংখ্য যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাকে। যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি আহত মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনে চিকিৎসা দিতেন। যোগান দিতেন খাবার দাবারসহ মুক্তিযোদ্ধাদের থাকার ব্যবস্থা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি হানাদারদের গতি প্রকৃতি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতেন। তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী এখানে সমাহিত করা হয়েছে। ফাদার রিগনকে এ অঞ্চলের সর্বস্তরের মানুষ আজীবন মনে রাখবে । 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

খুলনায় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ৩ জনের

খুলনায় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ৩ জনের

১৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০১:০০













ব্রেকিং নিউজ

খুলনায় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ৩ জনের

খুলনায় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ৩ জনের

১৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০১:০০








খালেদা জিয়াকে  নিয়ে বই প্রকাশ

খালেদা জিয়াকে  নিয়ে বই প্রকাশ

১৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:৫০



এইডস ঝুঁকিতে খুলনাসহ ২৩ জেলা

এইডস ঝুঁকিতে খুলনাসহ ২৩ জেলা

১৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:৪৮