খুলনা | রবিবার | ১৮ নভেম্বর ২০১৮ | ৪ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

ক্রিসেন্ট জুট মিলে পিএলপি ইউনিট স্থাপন 

পাটপণ্যের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিতে লেমিনেটেড ব্যাগ উৎপাদন  

মোহাম্মদ মিলন | প্রকাশিত ২২ অক্টোবর, ২০১৮ ০১:২০:০০

পাটজাত পণ্যের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত লেমিনেটেড ব্যাগ তৈরি করছে দেশের বৃহত্তম পাটকল খুলনার ক্রিসেন্ট জুট মিল। এজন্য মিলে স্থাপন করা বিশেষ ইউনিটের নাম ‘প্রিমিয়াম লেমিনেশন প্লান্ট’ (পিএলপি)। নতুন এই ইউনিটে উৎপাদন হচ্ছে লেমিনেটেড ব্যাগ এবং স্লাইবার ক্যানশীট নামে দু’ধরনের পণ্য। বীজ সংরক্ষণের জন্য দুই ধরনের লেমিনেটেড ব্যাগ বিশেষভাবে তৈরি করা হচ্ছে। চলতি বছরের জুলাই মাসে কাজ শুরু করা হলেও বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায় আগস্ট মাসে। বর্তমানে এই ইউনিটে প্রায় ৫০ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ শ্রমিক কাজ করছে। অন্য ইউনিটগুলোতে উৎপাদিত পণ্যে বিক্রি করে লোকসানে থাকলেও লেমিনেশন ব্যাগে লাভের মুখ দেখেছে মিলটি। গত দু’মাসে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের বীজ সংরক্ষণের জন্য প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার পিস ব্যাগ তৈরির অর্ডার পূরণ করা হয়েছে। বিজেএমসি ও মিল কর্তৃপক্ষের এ পদক্ষেপে বহুমুখী পাটজাত পণ্যের বাজারে নতুন মাত্রা যোগ করে মিলকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রুপ নিয়েছে। 
পিএলপি ইউনিটের কর্মকর্তারা জানান, মিলের তাঁতে তৈরি চটের ওপর পিএলপি মেশিনের মাধ্যমে লেমিনেশনের করে চটের ব্যাগ তৈরি করা হচ্ছে। বর্তমানে দুই ধরনের ব্যাগ তৈরি হচ্ছে একটি ১০ কেজি এবং অন্যটি ২০ কেজি ওজনের। শুধু ব্যাগই নয়, পিএলপি প্লান্টটিতে তৈরি হচ্ছে স্লাইবার ক্যানশীট। যা পাটকলগুলো প্রয়োজনীয় একটি পণ্য। এই স্লাইবার ক্যানশীট খুলনা-যশোর অঞ্চলের ৯টি পাটকলের চাহিদা পূরণ করেও বাহিরে বিক্রি করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন মিল কর্তৃপক্ষ।  পাটজাত পণ্যকে বহুমুখী ব্যবহারের প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে বিশেষ পদক্ষেপ এটি। বিশেষ করে চিনি, সার, সিমেন্ট, বীজসহ বিভিন্ন পণ্যের মোড়কীকরণে যাতে পণ্যের মান সঠিকভাবে থাকে সেদিক লক্ষ্য করে এবং পাটজাত পণ্যের বাজারে যুগের চাহিদা অনুসারে পণ্যের মোড়ক তৈরি করাও একটি উদ্দেশ্য।
ইউনিটের শ্রমিক ফিরোজ জানান, এখানে ‘নো ওয়ার্ক নো পে’ ভিত্তিতে তারা কাজ করছেন। তারা প্রশিক্ষণ নিয়ে ব্যাগ তৈরির কাজ করছেন। 
নারী শ্রমিক শিমু আক্তার বলেন, ঢাকায় গার্মেন্টেসে চাকুরী করতাম। পরে খুলনায় এসে লেমিনেশন ব্যাগ তৈরির কাজ করছি। গার্মেন্টেসে একটানা ১২ থেকে ১৩ ঘন্টা কাজ করা লাগতো। কিন্তু জুটমিলে একটানা ৮ ঘন্টা কাজ করি। এছাড়া সপ্তাহে শুক্রবার একদিন ছুটি পাচ্ছি। ফলে কিছুটা বিশ্রাম পেয়ে থাকি। 
মিসেস সালমা বলেন, এখানে ব্যাগ তৈরি করি সকাল ৭টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত। দৈনিক মজুরি প্রদান করা হচ্ছে ২৭১ টাকা। সপ্তাহে ১৬২৬ টাকা পাচ্ছি। এই টাকা সংসারে ব্যয় করছি। পাশাপাশি মেয়ের নামে ব্যাংকে একাউন্টে জমা করছি।  
লেখাপড়ার পাশাপাশি কাজ করছে ফাতেমা। তিনি বলেন, কিছুদিন আগে পরীক্ষা শেষ হয়েছে। এ জন্য প্রশিক্ষণ নিয়ে এখানে লেমিনেশন ব্যাগ তৈরির কাজ করছি। 
ইউনিটের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মোঃ শাহাবুদ্দীন কাজী বলেন, হেশিয়ান কাপড় পিএলপি মেশিনে দিয়ে তাঁতে লেমিনেশন করা হচ্ছে। একই সাথে এখানে স্লাইভার ক্যানশীটও তৈরি করা হচ্ছে।  
মিলের ডেপুটি ম্যানেজার (উৎপাদন) পিএলপি ইউনিট ইনচার্জ গোলাম রসুল রাকিব বলেন, তিনটি মিলে এই প্লান্ট হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার আমিন জুট মিলে এবং চট্টগ্রামের লতিফ বাউয়ানী জুট মিলে আর খুলনার ক্রিসেন্ট জুট মিলে। ক্রেতারা চায় নতুন নতুন পণ্য। এই প্লান্টের মাধ্যমে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করে সরবরাহ করা সম্ভব। এখানে শ্রমিকদের ইউসেফ থেকে ট্রেনিংপ্রাপ্ত এবং স্থানীয়দের ট্রেনিং দিয়ে দক্ষ শ্রমিক হিসেবে গড়ে তুলে কাজ করানো হচ্ছে। বিএডিসিকে এই পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। এই লেমিনেটেড ব্যাগে জলীয় বাষ্প প্রবেশ করতে পারবে না। ফলে পণ্যের গুণগত মান ভালো থাকবে। 
ক্রিসেন্ট জুট মিলের মহাব্যবস্থাপক গাজী সাহাদাত হোসেন এ প্রতিবেদককে জানান, বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন ও পাট মন্ত্রণালয়ের উপদেশ মোতাবেক ক্রিসেন্ট জুট মিলে চলতি বছরের জুলাই মাসে প্রিমিয়াম লেমিনেশন প্লান্ট (পিএলপি) প্রজেক্ট চালু করেছি। এখানে বীজ রাখার জন্য দুই ধরনের ব্যাগ তৈরি করা হচ্ছে। একটি ১০ ও ২০ কেজির দু’টি ব্যাগ তৈরি হচ্ছে। প্রতিদিন এই প্লান্ট থেকে ১০ হাজার পিস ব্যাগ তৈরি করা সম্ভব। গত জুলাই মাস থেকে কাজ করেছি। আগস্ট মাস থেকে কমার্শিয়াল অপারেশনে গিয়েছি। ইতোমধ্যে ১ লাখ ৫২ হাজার ব্যাগ বিক্রির অর্ডার পেয়েছি। যা তৈরিও হয়ে গেছে। বিজেএমসির উৎপাদিত অন্যসব পণ্যে লোকসান থাকলেও এই প্লান্টটিতে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে লাভ হচ্ছে। গত দুই মাসে যে পরিমাণ পণ্য উৎপাদন হয়েছে তাতে লাভ হয়েছে। এছাড়াও বিজেএমসির পাটকলগুলোতে স্লাইভার ক্যান নামে একটি পণ্যের প্রয়োজন হয়। এই স্লাইভার ক্যানসীটে সাধারণত সূতা, স্লাইভার রাখা হয়। এটাও এই প্লান্টে তৈরি করা হচ্ছে। শুধু ক্রিসেন্ট জুট মিলই নয়, খুলনা-যশোর অঞ্চলের ৯টি মিলের চাহিদা মিটিয়েও বাহিরে বিক্রি করতে পারি। 
তিনি বলেন, এ ধরনের ব্যাগ আগে শুধুমাত্র লতিফ বাউয়ানী জুট মিলে করা হতো। এটার অনেক চাহিদা রয়েছে। চিনি, সার, খাদ্যশষ্যসহ বিভিন্ন পণ্যে এই নেমিনেশন এই ব্যাগের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। এই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব এই প্লান্টের মাধ্যমে। 
মিলের মহাব্যবস্থাপক  বলেন, এখন ১০ কেজি ২০ কেজি ব্যাগ তৈরি করছি। ভবিষ্যতে মানুষের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করা হবে। এই প্লান্ট দিয়ে বহুমুখী পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হবে। বর্তমানে সারাবিশ্বে যে পরিমাণ পরিবেশ দূষণ হচ্ছে তাতে পাটপণ্য ব্যবহারের বিকল্প নেই। পাটপণ্য মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে এবং সার তৈরি করে। কিন্তু প্লাস্টিক ব্যাগে কোন সুফল নেই, কুফলই বেশি। এটি শষ্যের ক্ষতি, পরিবেশ পানি সবকিছুরই ক্ষতি হয়। এই ধরনের প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার থেকে বিরত থেকে পাটপণ্য ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে পারবো।  


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ