খুলনা | শনিবার | ১৭ নভেম্বর ২০১৮ | ৩ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

আইয়ুব বাচ্চুর জানাজা আজ, কাল দাফন

রূপালি গিটার ফেলে চলে গেলেন

খবর প্রতিবেদন | প্রকাশিত ১৯ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০৬:০০

বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতকে এগিয়ে নেওয়ার অন্যতম অগ্রপথিক আইয়ুব বাচ্চু আর নেই (ইন্নালিল্ল¬াহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন-আমরা তো আল্ল¬াহর এবং আমরা আল¬াহর কাছেই ফিরে যাবো)। বৃহস্পতিবার সকালে তাকে অচেতন অবস্থায় ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন । 
ব্যান্ড দল এলআরবির লিড গিটারিস্ট ও ভোকালিস্ট আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন একাধারে গীতিকার, সুরকার এবং পে¬ব্যাক শিল্পী। চার দশক বাংলাদেশের তরুণদের গিটারের মূর্ছনায় মাতিয়ে রাখা রকস্টারের বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর। গিটার বাদনে তার খ্যাতি ছিল পুরো ভারতীয় উপমহাদেশেই। সকালে তার মৃত্যুর খবরে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। ভক্ত শ্রোতাদের পাশাপাশি সংগীত জগতের অনেকেই ছুটে আসেন হাসপাতালে।
আইয়ুব বাচ্চুর প্রতি সর্বসাধারণের শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য আজ (শুক্রবার) সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তাঁর মরদেহ রাখা হবে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ নেওয়া হবে জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। সেখানে জানাজা শেষে আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ নেওয়া হবে চট্টগ্রামের পৈতৃক নিবাসে। সেখানে শনিবার মায়ের কবরের পাশে চিরনিন্দ্রায় শায়িত হবেন আইয়ুব বাচ্চু।
আইযুব বাচ্চুর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ রাজনৈতিক অঙ্গনের অনেকেই শোক প্রকাশ করেছেন।
জানা গেছে, গতকাল সকালে শরীর খারাপ লাগলে আইয়ুব বাচ্চুর ব্যক্তিগত গাড়িচালক তাঁকে নিয়ে স্কয়ার হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। গাড়িতে তোলার সময়ই তাঁর মুখ থেকে ফেনা বের হচ্ছিল। সকাল সোয়া নয়টার দিকে তাঁকে স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা।
চিকিৎসকেরা জানান, হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যু হয়েছে। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সকাল সোয়া ৯টার দিকে তিনি মারা যান।
স্কয়ার হাসপাতালের মেডিকেল ডিরেক্টর ডাঃ মির্জা নাজিম উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, জরুরী বিভাগে কার্ডিয়াক কনসালট্যান্ট মুনসুর মাহবুবের উপস্থিতিতে ১৫ থেকে ২০ মিনিট ধরে আইয়ুব বাচ্চুর হৃৎস্পন্দন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে আইয়ুব বাচ্চুকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মির্জা নাজিমুদ্দিন বলেন, আমরা আইয়ুব বাচ্চুকে মৃত অবস্থাতেই পাই। তার পরেও আমাদের স্পেশাল টিম তাঁকে ফিরিয়ে আনার সব রকমের চেষ্টা করে। তিনি বহুদিন ধরে হৃদরোগে ভুগছিলেন। তাঁর হার্টে কার্ডিয়োমাইপ্যাথি ছিল। ২০০৯ সালে তাঁর হার্টে একটি স্টেন্ট পরানো হয়।
মির্জা নাজিমুদ্দিন জানান, তিন সপ্তাহ আগে আইয়ুব বাচ্চু স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁর হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা ছিল ৩০ শতাংশ, যেখানে একজন সুস্থ মানুষের থাকে ৭০ শতাংশ। এ জন্যই বারবার তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হতো। হার্টের কার্যকারিতা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে তাঁর মুখ থেকে পানির মতো ফেনা বের হচ্ছিল। বাংলা ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসের এই কিংবদন্তি শিল্পী ১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। 
ব্যান্ডতারকা লাবু রহমান বলেছেন, আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন একজন শিক্ষক। আমাদের দেশে ব্যান্ডসংগীতে এ রকম শিক্ষক নেই বললেই চলে। তাঁর মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। আমরা সবাই তাঁকে মিস করব। আইয়ুব বাচ্চুর কণ্ঠে ফেরারী এই মনটা আমার, আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি, একদিন ঘুম ভাঙা শহরে, চল বদলে যাই, এখন অনেক রাত, রূপালি গিটার, হাসতে দেখ গাইতে দেখ’র মত বহু গান শ্রোতাদের হৃদয়ে বাজবে বহুদিন। ফেসবুকে এক পোস্টে কলকাতার শিল্পী অঞ্জন দত্ত লিখেছেন-টেরিবল লস...আইয়ুব বাচ্চু...
এলারবির সদস্য শামিম বলেন, বাচ্চু বেশ কিছুদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। হৃদরোগের কারণে সপ্তাহ দুই আগেও একবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। মগবাজারের বাসায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে সকালে তাকে স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।
গত ১৬ অগাস্ট নিজের জন্মদিনে আইয়ুব বাচ্চু এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, চার দশকের সংগীত জীবনে তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি শ্রোতাদের উচ্ছ্বাস, মানুষের ভালোবাসা। বলেছিলেন একটি আত্মজীবনী লেখার পরিকল্পনার কথা।
আইয়ুব বাচ্চুর ডাক নাম রবিন। জন্ম ১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট, চট্টগ্রামে। সেখানেই কেটেছে কৈশোর আর তারুণ্যের দিনগুলো। এক সাক্ষাৎকারে বাচ্চু বলেছিলেন, ছেলে বেলায় গান শুনতে শুনতে নিজে চেষ্টা করতে গিয়েই তার গায়ক হয়ে ওঠা। পশ্চিমা সংগীতের প্রেমে পড়ে হাত দেন গিটারে। জিমি হেন্ডরিক্স, জো স্যাটরিনি, স্টিভ মুরের মত শিল্পীদের কাজ থেকে পেয়েছেন অনুপ্রেরণা। কলেজে পড়ার সময় বন্ধুদের নিয়ে বাচ্চু গড়ে তোলেন একটি ব্যান্ডদল। শুরুতে গোল্ডেন বয়েজ’ নাম দিলেও পরে বদলে রাখা হয় আগলি বয়েজ। পাড়া মহল¬ার বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে চলত তাদের পরিবেশনা। পেশাদার ব্যান্ডশিল্পী হিসেবে বাচ্চুর ক্যারিয়ার শুরু ১৯৭৮ সালে। ব্যান্ড দলে ফিলিংস এর সঙ্গে সে সময় চট্টগ্রামের বিভিন্ন অভিজাত হোটেলে পারফর্ম করতেন তিনি। দুই বছরের মাথায় যোগ দেন জনপ্রিয় ব্যান্ড দল সোলসে। টানা দশ বছর সোলসের লিড গিটার বাজানোর পর ১৯৯১ সালের ৫ এপ্রিল আইয়ুব বাচ্চু গড়ে তোলেন নতুন ব্যান্ড এলআরবি। সে সময় তার সঙ্গী ছিলেন জয়, স্বপন আর এস আই টুটুল। শুরুতে এলআরবির পুরো নামটি ছিল ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’, পরে তা বদলে নাম হয় ‘লাভ রানস ব¬াইন্ড’।
এলআরবির প্রথম কনসার্ট হয়েছিল ঢাকার একটি ক্লাবে। সেখানে ইংরেজি গানই পরিবেশন করেছিলেন তারা। কিছুদিন পর ঢাকা শিশু একাডেমিতে এক কনসার্টে প্রথমবারের মত ক্লাব বা হোটেলের বাইরে দর্শকদের সামনে আসে এলআরবি। ১৯৯২ সালে দলের নামেই বাজারে আসে এলআরবির জোড়া এ্যালবাম এলআরবি- ১ ও ২। এরপর গত ২৭ বছরে সুখ, তবুও, ঘুমন্ত শহরে, স্বপ্ন, ফেরারী মন, বিস্ময়, যুদ্ধ, স্পর্শসহ ১৪টি এ্যালবাম শ্রোতাদের সামনে এনেছে এলআরবি। আইয়ুব বাচ্চুর প্রথম একক অ্যালবাম ‘রক্ত গোলাপ’ বাজারে আসে ১৯৮৬ সালে। তখনও তিনি সোলসে। প্রথম এ্যালবাম খুব একটা সাড়া না পেলেও ১৯৮৮ সালে ‘ময়না’ এ্যালবামে গায়ক হিসেবে বাচ্চু শ্রোতাপ্রিয় হতে শুরু করেন। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত বাচ্চুর তৃতীয় একক এ্যালবাম কষ্ট দারুণ ব্যবসা সফল হয়। পরের বছরগুলোতে সময়, একা, প্রেম তুমি কি, কাফেলা, পথের গান, জীবন, রিমঝিম বৃষ্টি, বলিনি কখনোর মত একক অ্যালবাম নিয়ে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছেনে আইয়ুব বাচ্চু। ২০১৫ বাজারে আসে তার একক অ্যালবাম জীবনের গল্প । এছাড়া লাল বাদশা, গুণ্ডা নাম্বার ওয়ান, ব্যাচেলর ও চোরাবালি সিনেমায় প্লে¬ব্যাক করেছেন বাচ্চু। চলচ্চিত্রে তার গাওয়া প্রথম গান-অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’ দারুণ জনপ্রিয় হয়। 
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ