খুলনা | রবিবার | ১৮ নভেম্বর ২০১৮ | ৪ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

দখল আর দূষণে অস্তিত্ব সংকটে মহানগরীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া তিন নদী

নিজস্ব প্রতিবেদক  | প্রকাশিত ১৩ অক্টোবর, ২০১৮ ০১:১০:০০

দখল আর দূষণের ফলে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে খুলনা মহানগরীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া তিনটি নদী। এর মধ্যে মহানগরীর বুক চিরে প্রবাহিত ময়ূর নদীর অস্তিত্ব এখন বিলুপ্তির পথে। পাশাপাশি রাসায়নিক বর্জ্য, মহানগরী থেকে নিসৃত বর্জ্যসহ মানব বর্জ্য বিষাক্ত করে তুলেছে ভৈরব ও রূপসা নদীর পানি। এছাড়া নদীতে চলছে দখলের মহোৎসব। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারী না থাকায় নদীর পাড় গিলে খাচ্ছে ভূমিদস্যুরা। 
খুলনা মহানগরীর তিন দিক রূপসা, ভৈরব ও কাজীবাছা নদী দ্বারা বেষ্টিত। এছাড়া ময়ূর নদী চলে গেছে নগরীর বুক চিরে। এর মধ্য রূপসা ও ভৈরবের দুই তীরে রয়েছে অসংখ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের রাসায়নিক বর্জ্য প্রতিনিয়ত নদীর পানিতে মিশছে। ফলে দূষিত হচ্ছে নদীর পানি। প্রতিনিয়ত কমে যাচ্ছে নদীর পানির দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা। অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় জলজ প্রাণিও অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। আর ময়ূর নদের জলজ প্রাণি একেবারেই বিলুপ্তির পথে। এদিকে নদীগুলো দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে ভূমিদস্যু ও কতিপয়  রাজনৈতিক নেতা-কর্মী। দূষণ ও দখলে নদীগুলো অস্তিত্ব সংকটে থাকলেও বিভাগীয় শহর খুলনায় নেই কোন নদী গবেষনা ইনষ্টিটিউট। নদী গবেষনা ইনস্টিটিউট রাজধানীর বাইরে শুধু ফরিদপুরে রয়েছে একটি। 
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র মতে, প্রতিমাসে পরিবেশ অধিদপ্তরের কেমিস্ট শাখা থেকে নদীর পানি পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় দেখা যায় রূপসা, কাজিবাছা ও ভৈরব নদের পানির লবণাক্ততা ও অক্সিজেনের পরিমান কিছুটা স্বাভাবিক রয়েছে। তবে ময়ূর নদের পানিতে অক্সিজেনের পরিমান অত্যাধিক কম। পরিবেশ অধিদপ্তরের সিনিয়র কেমিষ্ট মোঃ কামরুজ্জামান সরকার জানান, “নদীর পানিতে সাড়ে ৪ মিলিগ্রামের ওপরে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা থাকতে হবে। খুলনার রূপসা, ভৈরব ও কাজীবাছা নদীতে খুব বেশি অস্বাভাবিক না থাকলেও ময়ূর নদে দ্রবীভূত অক্সিজেনে মাত্রা অস্বাভাবিক হারে কম। তিনি আরো বলেন পানি প্রবাহের মাত্রা কমে গেলে দূষণের মাত্রা বেড়ে যায়। গত আগস্ট মাসের গবেষণায় দেখা যায়,  রূপসা নদীতে ৫.৩ মিলিগ্রাম, ভৈরব নদে ৫.৪ মিলিগ্রাম পর্যন্ত অক্সিজেনের মাত্রা থাকলেও ময়ূর নদে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা মাত্র ১.২। 
অনুসন্ধানে জানা যায়, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পাওয়া কারখানার বর্জ্য শোধন করে রূপসা নদীতে ফেলার নিয়ম থাকলেও খরচ বাঁচাতে অনেক প্রতিষ্ঠানই সে নিয়ম মানছে না। ফলে মাছ ও জলজ প্রাণির স্বাভাবিক বেঁচে থাকার পরিবেশ বিঘিœত হওয়ার পাশাপাশি মৎস্য পোনার নার্সারি গ্রাউন্ড ধ্বংস হচ্ছে। এছাড়া ভৈরব ও রূপসার দুই তীরে রয়েছে বেশ কয়েকটি পাটকল। এসব প্রতিষ্ঠানের বর্জ্যও মিশে যাচ্ছে নদীর পানিতে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ও ম্যাচ ফ্যাক্টরির রাসায়নিক বর্জ্য নদীতে ফেলার অভিযোগ রয়েছে। কেসিসির ২২ খাল ও কয়েকশ’ ড্রেনের পানি কোন ধরনের শোধন ছাড়াই ড্রেনের মাধ্যমে সরাসরি গড়িয়ে পড়ছে নদীতে। এছাড়া নদী তীরে রয়েছে অসংখ্য ঝুলন্ত পায়খানা। এসব ঝুলন্ত পায়খানা থেকে নির্গত মানব বর্জ্য, শত শত ড্রেন ও নালা-নর্দমা থেকে বেয়ে আসা ময়লা-আবর্জনা বিষাক্ত করে তুলছে নদীর পানিকে। অপরদিকে ময়ূর ও রূপসা, কাজিবাছা ও ভৈরব  নদের দুই তীর দখল করে গড়ে ওঠেছে একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ইট ভাটাসহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্তৃপক্ষ বারবার নদী দখলদারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার উদ্যেগ নিলেও পারেনি সফল হতে।  
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এম রাকিব উদ্দিন বলেন, বর্জ্য নিষ্কাষন খুলনার নদী দূষণের অন্যতম কারণ। খুলনা অঞ্চলের নদীগুলো ঘিরে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন শিল্প কারখানা। এই শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর শিল্প বর্জ্যই নদী দূষণের অন্যতম কারণ। তিনি আরো বলেন, শহরের মধ্য খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোল ঘেষে গড়ে ওঠা ময়ূর নদীকে তো খালও বলা যায় না। নদীটির অস্তিত্ব পুরোপুরি বিপন্ন। যার প্রধান কারণূ নগরীর ড্রেনগুলো থেকে বর্জ্য নিষ্কাষনসহ অবৈধ দখল। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, খুলনা বিভাগীয় শহর হলেও এখানে নেই কোন নদী গবেষণা ইনষ্টিটিউট।      
পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় পরিচালক মোঃ হাবিবুল হক খান বলেন, ড্রেন ও নালা-নর্দমার ময়লা-আবর্জনা ও দূষিত পানি নদীতে গিয়ে পড়ায় নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে সব স্তরের মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে কিছুটা হলেও নদী দূষন রোধ হবে। নদীর পাশে গড়ে ওঠা শিল্প কারখানার ব্যাপারে বলেন, নদীর পাশের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে যাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান।


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন






ব্রেকিং নিউজ