খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১৮ অক্টোবর ২০১৮ | ২ কার্তিক ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

“শরীয় বিধানে দেনমোহর”

মুহাম্মদ মাহফুজুর রহমান আশরাপী | প্রকাশিত ১২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০৩:০০

মোহর নারীর নিজস্ব অধিকার। এর মালিক সে নিজেই। বিবাহের দিন মোহর ছাড়া অন্য কোন শর্ত করা ইসলামী শরীয়তে বৈধ নয়। “মোহর” শব্দটি আরবী হিব্র“ ভাষায় “মোহর” এবং সিরীয় ভাষায় “মাহরা” বলে। যার অর্থ হল, বিবাহ্ বন্ধনের মাধ্যমে স্ত্রীর (কনের) প্রাপ্য হক। শরীয়তের পরিভাষায়, যে মূল্যকে যা বিবাহের সময় বরের পক্ষ হতে হাসি খুশী মনে পাত্রীকে দেয়ার ওয়াদা করা হয়। আল্লামা শাওকানীর মতে, “দেনমোহর বধূর প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তার মনকে আকৃষ্টি করার উদ্দেশ্যেই ধার্য করা হয়েছে। শরীয়তে মোহর এর অনেক গুরুত্ব রয়েছে।
মোহরের প্রকারভেদ ঃ মোহর দুই শ্রেণীতে বিভক্ত। যথা (১) মোহরে মুসাম্মা (নির্ধারিত) (২) মোহরে মিসাল। বিবাহ্ সম্পাদন কালে স্বামী স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নির্ধারিত মোহরকে “মোহরে মুসাম্মা বলে। বিবাহের সময় মোহরের উল্লেখ না থাকলে অথবা মোহর আদৌ নির্ধারণ করা না হয়ে থাকলে সেই ক্ষেত্রে স্ত্রীর পিতকূলের অন্যান্য মহিলার মোহরের পরিমাণ বিবেচনায় রেখে তার জন্য যে পরিমাণ মোহর নির্ধারণ করা হয় তাকে ‘মোহরে মিসাল’ বলে। প্রকাশ থাকে যে, পরিশোধের সময় সীমার দিক থেকে  ‘মোহরে মুসাম্মা’ দুই ভাগে বিভক্ত (ক) মোহরে মু’আজ্জাল ঃ অর্থাৎ বিবাহের সময় যে মোহর নগদ আদায় করা হয় তাকে ‘মোহরে মু’আজ্জাল বলে। (খ) মোহরে মুয়াজ্জালঃ অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রীর বিবাহ্ বিচ্ছেদ অথবা তাদের কোন একজনের মৃত্যুর কারণে যে মোহর পরিশোধ তাৎক্ষনা বাধ্যতামূলক হয় তাকে ‘মোহরে মুয়াজ্জাল’ বলে।
মোহরের বিধি বিধান ঃ স্বামী ও স্ত্রীর পারস্পারিক সু-সম্পর্ক রক্ষার জন্য মোহরের গুরুত্ব অপরিসিম। নিম্নে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধিবিধাণ তুলে ধরা হলঃ
(১) মোহর না দেয়ার শর্তে বিবাহ অনুষ্ঠিত হলে শর্তটি বাতিল গণ্য হবে এবং মোহরে মিসাল প্রদান অপরিহার্য হবে।
(২) বিবাহ হওয়ার পর স্বামী-স্ত্রী একত্রে নির্জনে মিলিত হওয়ার পূর্বে তালাক সংঘটিত হলে এবং মোহর পূর্বে নির্ধারিত হয়ে থাকলে স্ত্রী অর্ধেক মোহর প্রাপ্য হবে। (৩) স্ত্রীর মোহর আদায় জারিমানা মনে করা যাবে না। এতে নানা রকম তিক্ততার সৃষ্টি হয়। স্ত্রীকে পাওনাদার হিসেবে স্বামীর উপর অর্পিত দায়িত্ব খুশী মনে সন্তুষ্ট চিত্তে আদায় করতে হয়। যার কারণে মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে “নিহলাতন” শব্দটি উল্লেখ করেছেন, যার অর্থ “খুশী মনে সানন্দ চিত্তে”।
(৪) যদি কোনো নারী স্বেচ্ছায় তার স্বামীকে ক্ষমা করে দেয় তা স্বতন্ত্র কথা। কোনো নারী স্বেচ্ছায়, সানন্দে যদি তার মোহরের অর্থ ও সম্পদ স্বামীকে দান করে তাহলে তার স্বামীর জন্য তা বৈধ হবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “যদি স্ত্রী নিজের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছায় মোহরের কোনো অংশ ক্ষমা করে দেয় তবেই তোমরা তা সন্তুষ্ট চিত্তে ভোগ করতে পার।” (আননিসা-৪)
(৫) মোহর নির্ধারণের ক্ষেত্রে লোক দেখানো প্রবণতা, বংশ মর্যাদা ও আভিজাত্য প্রদর্শনের জন্য লক্ষ্য লক্ষ্য টাকা মোহর নির্ধারণ করা হয়। এ মোহর স্বামীর পক্ষ থেকে আদায় করা আবশ্যক মনে করে না। ফলে সারা জীবন মহরের দেনা নিয়ে স্বামীর করবে যেতে হয়। যার কারণে শরীয়তে ছেলের অর্থ আয়ের উপর ভিত্তি করে “মোহর” ধার্য করতে নির্দেশ দিয়েছে। একেভারে কমওনা, হয় আবার অতিরিক্ত না হয়। “নায়লুল আওতার” গ্রন্থে’ আছে, “নবী করিম (সাঃ) বলেছেন, মোহরের মধ্যে সেই পরিমাণ মোহর-ই উত্তম, যা আদায় করা সহজ সাধ্য।
(৬) ইসলামী আইন শাস্ত্রবীদগণ বলেন, মোহর মাফ চেয়ে নিলে, অথবা ছলে-বলে, কৌশলে বা চাপ প্রয়োগ করে মাফ করিয়ে নিলে মাফ হবে না। নবী করিম (সাঃ) বলেন, “সাবধান, জুলুম কর না। মনে রেখ, কারো পক্ষে অন্যের সম্পদ তার আন্তরিক তুষ্টি ব্যতীত গ্রহণ করা হালাল হবে না। (সূত্র: মিশকাত-২৪৫)
(৭) আজকাল দেখা যায়, বিবাহের অনুষ্ঠানে বরের পক্ষ থেকে নতুন বধূকে সাজ খোজের যে পয়নামা সাজনী কাপড় চোপড় দেয়া হয়, তা থেকে ধার্যকৃত মোহর থেকে উসূল করা হয়, যা শরীয়ত দৃষ্টিতে বৈধ নয়।
ইসলামে মোহর ধার্য্যরে রহস্য ঃ মানুষ সৃষ্টি করেছেন যিনি, মানব সম্পর্কে জানেনও তিনি, নারী জন্মের পরে বাবা অথবা ভাইয়ের দায়িত্বে বড় হয়, বিয়ে হলে সে স্বামীর হিফাজতে থাকে, স্বামী মারা গেলে ছেলে সন্তানদের দায়িত্বে থাকে। কিন্তু কোন হতভাগা নারীর জীবনে এমন অবস্থা নেমে আসতে পারে যে স্বামী মারা গেছে অথবা তালাক প্রাপ্ত হয়েছে। এদিকে বাবা ভাই কেহ দুনিয়াতে বেঁচে নেই, ছেলে-মেয়ে শিশু তখন নারী এই অবস্থায় কি করবে। যার কারণে কোন নারী পথে নামতে না হয়, সে জন্য ইসলাম মোহর, পিতা, মাতা, স্বামী, ছেলে ও ভাইয়ের সম্পদে অংশীদারীর ব্যবস্থা করছে।
স্ত্রীর সঙ্গে মোহর নিয়ে প্রতারণার কৌশল ঃ আমাদের সমাজে স্ত্রীর মোহর নিয়ে নানা রকম টাল বাহনা চলে। তার মানে হলো স্ত্রীর কাছ থেকে ছলে-বলে, কলে-কৌশলে মাফ চেয়ে মোহর মাফ করিয়ে নেয়া, বিশেষ করে দাদা, নানা, ভগ্নিপতি, দাদি, নানিরা শিখিয়ে দেন যে, বরকে প্রথম রাত্রে অর্থাৎ “বাসর ঘরে” স্ত্রীর কাছে মাফ চেয়ে নিও। এদিকে মেয়ে মহরের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে কিছুই জানেনা, এবং প্রথম প্রথম সে মানসিক ভাবে অতি দুর্বল থাকে, সেই ফাঁকে পুরুষ সময়ের সৎ ব্যবহারের সুযোগটি খুঁজে নেয়। অথচ নারী জানে এই মোহর মহান আল্লাহ্ প্রদত্ত একটি বিধান এবং স্ত্রীর অর্থনৈতিক জীবনের গ্যারান্টি। প্রকৃত ভাবে বাসর রাতে আবেগ উচ্ছাস আর স্বামী নামক স্বপ্নর রাজ পুরুষ, যখন তার হাত ধরে ক্ষমা চায় তখন ক্ষমা না করে উপায় থাকে না, তখন নব বধূ বলে, মোহর দিয়ে কি করব, “আমি তোমাকে চাই। মোহর নিয়ে এরূপ নাটক করার জন্য আল্লাহ কুরআনের আয়াত নাজিল করে মোহর দেয়া বাদ্ধতামূলক এবং পরিশোধ যোগ্য করেছেন। স্ত্রীকে মোহর না দিয়ে কৌশল করে ফাঁকি দিলে মানব সমাজে অনেক প্রকার ক্ষতি সাধন হয়, আল্লাহ প্রদত্ত এই বিধান অমান্য করলে সমাজ পাপিষ্ট হয়। 
মূলতঃ মোহর দেনা স্বরূপ, তা অনাদায়ের ক্ষেত্রে স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রীর এই অধিকার রহিত হয় না। সে তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে নিজের মোহর উসূল করে নিতে পারে। তাই উলটো স্ত্রীর কাছে “যৌতুক” দাবি না করে তার প্রাপ্য মোহর আনা খুশী মনে আদায় করা উচিত। মহান আল্লাহর হুকুম এবং বিশ্বনবী (সাঃ) প্রদর্শিত সুন্নাতের উপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন ছুম্মা আমিন।

লেখক: প্রভাষক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, মাতৃভাষা ডিগ্রী কলেজ।
শরণখোলা, বাগেরহাট।
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

যে আগে সালাম দেয় সে অহংকার মুক্ত

যে আগে সালাম দেয় সে অহংকার মুক্ত

০৫ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:১০

“অকাল মৃত্যু” একটি ভ্রান্ত ধারণা

“অকাল মৃত্যু” একটি ভ্রান্ত ধারণা

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:১২


রহস্যময় আবে যমযম কূপ

রহস্যময় আবে যমযম কূপ

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০৯

পবিত্র আশুরা  ২১ সেপ্টেম্বর

পবিত্র আশুরা  ২১ সেপ্টেম্বর

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০


হজে গুনাহ মাফ হয়

হজে গুনাহ মাফ হয়

১৬ জুলাই, ২০১৮ ১৩:২৫

শাওয়ালের ছয় রোজা

শাওয়ালের ছয় রোজা

২০ জুন, ২০১৮ ১৩:১১

দুই ঈদের রাত খুবই বরকতময়

দুই ঈদের রাত খুবই বরকতময়

১৪ জুন, ২০১৮ ০১:৪৫





ব্রেকিং নিউজ











শারদীয় দুর্গোৎসবের  আজ মহানবমী

শারদীয় দুর্গোৎসবের  আজ মহানবমী

১৮ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:৪৯