খুলনা | বুধবার | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ১০ আশ্বিন ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

বোধনের আগেই দেবী দুর্গার বিসর্জনের শঙ্কা

কপোতাক্ষের ভাঙন রোধে ব্লক স্থাপন নয় লুব কাটিং চায় ক্ষতিগ্রস্তরা

পারভেজ মোহাম্মদ ও অলিউল্লাহ গাজী  | প্রকাশিত ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০১:০৩:০০

কপোতাক্ষের ভাঙনে চল্লিশ বছরের সংসার জীবনে সুভাষি বিশ্বাসের ঘর ভেঙেছে আট বার। রামনাথপুর পূর্বপাড়া পূজা মন্ডপের দুর্গা দেবীর বোধনের আগেই বিসর্জনের শঙ্কায় দিন কাটছে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের। পূর্ব পুরুষদের ভিটে-মাটি দরগাহমহলের মিজানের কাছে এখন শুধুই স্মৃতি। সর্বগ্রাসী নদের আগ্রাসনে দিশেহারা এ অঞ্চলের মানুষ। শুধু বসতভিটা নয়, শেষ ঠিকানার (কবর) জায়গাটুকুও কিনেছে অন্য অঞ্চলে। জোয়ার-ভাটার মির্মম রসিকতায় প্রতি ঘন্টায় বদলে যাচ্ছে এ অঞ্চলের মানচিত্র। ভাঙছে নদী, পুড়ছে কপাল। অভাবের দাবানলে ক্ষুধার্ত শিশুর হাহাকার আর বাস্তহারা হওয়ার যন্ত্রণায় কাতর ভাঙন কূলের মানুষ। শত দুঃখ-কষ্টের মাঝেও তাদের চোখে মুখে আত্ম প্রত্যায়ের ছাপ। করুণার চাল কিংবা নদীর ভাঙন রক্ষায় নামে উপহাসের ব্লক স্থাপন বাতিল করে কপোতাক্ষ নদের মূল স্রোতধারায় লুব কাটিং এর দাবি তাদের। স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ মোঃ নূরুল হকও পানি সম্পদ মন্ত্রী বরাবর এক ডিও লেটারের মাধ্যমে একই দাবি জানিয়েছেন। 
গত ১৪ আগস্ট ডিও নং-বাজাসস/১০৪/খুলনা-৬/২০১৮-১০৫৬ স্মারকে উল্লেখ করা হয় , আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সভ্যতার প্রাচীনত্বের সাথে কপোতাক্ষ গভীর ভাবে যুক্ত। বর্তমান সরকার কপোতাক্ষের অপমৃত্যু ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে ২৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে খনন কাজ পরিচালনা করছে। ইতোমধ্যে কপোতাক্ষের কপিলমুনি থেকে বালিয়া অংশের খনন কাজ শেষ হয়েছে। বালিয়া থেকে নিম্নগামী অংশের তীব্র স্রোতের কারনে পাইকগাছা উপজেলার আগড়ঘাটা, রামনাথপুর, দরগাহমহল, হাবিবনগরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার শত শত পরিবার ভিটে মাটি ছাড়া। ঐ ভাঙন রোধ করতে পানি উন্নয়ন বোর্ড সেখানে ব্লক স্থাপনের প্রকল্প হাতে নিয়েছে। স্থানীয় সাংসদ তার ডিও লেটারে আরও উল্লেখ করেন, নদী পাড়ের মানুষ আমরা, নদীর গতিপথ ও জোয়ার-ভাটার সাথে আজন্ম পরিচয়। এ অঞ্চলের ভাঙন রোধে ব্লক স্থাপনের যে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে তা কোন ভাবেই বাস্তবসম্মত নয়। ইতিপূর্বে কয়েকবার ব্লক স্থাপন করে সরকারি টাকা অপচয় হয়েছে। তিনি মামুদকাটির পূর্বভাগ থেকে সিলেমানপুর পর্যন্ত কপোতাক্ষের পুরনো প্রবাহ বরাবর লুব কাটিংয়ের দাবি জানান।
সরেজমিন ভাঙন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কপোতাক্ষের অব্যাহত ভয়াবহ ভাঙনে শুধু বাপ-দাদার ভিটা মাটিই নয়, ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, কবরস্থানসহ হাজার হাজার ফলজ ও বনজ বৃক্ষ। পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি ও হরিঢালী ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ শতাধিক পরিবার হয়েছে গৃহহীন। পাঁচ হাজারের অধিক মানুষ প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই ভয়াবহ ভাঙনে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সাথে আলাপ করে জানা যায়, প্রায় দু’যুগ ধরে প্রতিনিয়ত ভাঙ্গছে নদী আর গৃহহীনদের তালিকা হচ্ছে দীর্ঘ। ইতোমধ্যে অনেকে বাস্তভিটা ছেড়ে হয়েছে উদ্বাস্তু। সব হারিয়ে ভিক্ষাবৃত্তির পথ বেছে নিয়েছে কেউ কেউ। রামনাথপুর জেলে পাড়া ভাঙন কূলে পৌঁছাতে হলো জরাজীর্ণ খুপড়িতে জড়োসড়োভাবে বেঁচে থাকা কয়েকশ’ মানুষের হাহাকার, হতাশা আর অভিযোগের বোঝা মাথায় নিয়ে। জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রশাসনের কাউকে পাশে না পাওয়া আক্ষেপের বহিঃপ্রকাশ। কার্ত্তিক বিশ্বাস, মনিষা, কালিদাসী, লিপিকা, বনদাসী আর বিকাশ বিশ্বাসের কথা যেন অভিন্ন। ঘর ভাঙা, ফসলি জমি আর সহায় সম্বল হারানো গল্পটা হয়ত অর্থের মাপ কাঠিতে কম বেশি হবে কিন্তু ক্ষুধা, দারিদ্র আর বেদনার ভাষা এক। দরগাহমহলের মেহেরুন্নেছার (৬৫) অভিযোগের সাথে উঠে আসে বেঁচে থাকার আত্মবিশ্বাসে সাহসী পদক্ষেপের কথা, পাঁচবার বাড়ি ভেঙেছে তার। স্থানীয়দের অনেকের অভিযোগ, নদী শাসন, জলবায়ুর পরিবর্তন এবং নদীর মূল স্রোতধারা পরিবর্তন হওয়ার কারনে ভাঙন বৃদ্ধি পেয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, খননের মাধ্যমে কপোতাক্ষকে তার মূল ঠিকানায় ফেরাতে হবে। জানা গেল, দরগাহমহল প্রাক্তন ইউপি সদস্য জব্বার সরদার, মাওঃ মোঃ সাইফুল, হাজী শেখ আবু বক্কার, শেখ আব্দুল রাজ্জাক, মান্দার সরদার, শেখ আব্দুল মান্নান, মধু মন্ডল, সৈয়দ আবুল কালাম আজাদসহ অনেকেই তাদের বসত ভিটা হারিয়েছেন নদীর ভাঙনে। বাবা-মার কবর হারাবার শঙ্কায় আছে প্রাক্তন ইউপি সদস্য শেখ সাদেকুজ্জামান। হুমকীর মুখে পড়েছে পাইকগাছা-কয়রা পল্ল¬ী বিদ্যুতের মেইন লাইন, খুলনা পাইকগাছা সড়ক (দ্বিতীয় দফায়), এতিম খানাসহ মানচিত্রে কোন রকম স্মৃতি আঁকড়ে পড়ে থাকা দরগাহমহল ও রামনাথপুর গ্রাম। যাদের অনেকেই বাপ-দাদার ভিটা হারিয়ে অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে আশ্রয় নিয়েছে ফেলে যাওয়া ভিটায়, রাস্তার ধারে কিংবা ভাঙন কূলের খুপড়িতে। তেমনি একজন মুক্তিযোদ্ধা কার্ত্তিক চন্দ্র বিশ্বাস (৮২)। বঙ্গবন্ধুর হাতে হাত দেয়া কার্ত্তিক চন্দ্রের নদী ভাঙনে সব হারিয়ে ঠাঁই হয়েছে নদী পাড়ে জরাজীর্ণ খুপড়িতে। 
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তভিটা হারিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করলেও তাদের ওপারে জেগে ওঠা চরে নেই আশ্রয়। স্থানীয় এক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ও তার শ্যালকের রক্ত চক্ষুতে সেখানেও ঠাঁই নেই মুক্তিযোদ্ধা কার্ত্তিক কিংবা বনদাসী বিশ্বাসদের। শুধু মুক্তিযোদ্ধা কার্ত্তিক নয়, সুকলা গাইন, সুভাষি বিশ্বাস, দিপক, নির্মল, অজিদ, সামাদসহ স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তরা জেগে ওঠা চরে নিজ ঠিকানায় ফিরতে চায়। স্থানীয় অনেকেই ইতোমধ্যে বসত ভিটা নয় শেষ ঠিকানার স্থানটি কিনেছেন আগ্রাসী কপোতাক্ষের তীর থেকে বেশ দূরে কোন স্থানে। রামনাথপুর পূর্বপাড়া পূজা মন্দিরে গিয়ে দেখা গেল চলছে দুর্গা প্রতিমা তৈরির কাজ। এলাকাবাসীর দাবি, চলমান সমস্যা সমাধানে যেন মূল ম্যাপ অনুযায়ী কপোতাক্ষ খনন করা হয়। অন্যদিকে গৃহহীন পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁইটিও হবে নিজ ঠিকানায়। কপোতাক্ষ ফিরে পারে তার চিরচেনা গতিপথ। 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ












তৃতীয় ফাইনাল নাকি স্বপ্ন ভঙ্গ

তৃতীয় ফাইনাল নাকি স্বপ্ন ভঙ্গ

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:৫৫