খুলনা | মঙ্গলবার | ১৩ নভেম্বর ২০১৮ | ২৯ কার্তিক ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

আমার স্মৃতিতে অম্লান, অনির্বাণ-শিক্ষাবিদ-গবেষক

একজন খাঁটি মাটির মানুষ ড. মোসলেম উদ্দিন জোয়ার্দার

আবদুল কাদের খান | প্রকাশিত ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২২:৫৪:০০

“... রাত্রে রেডিওতে যখন খবর বলে
কানে আঙুল দিয়ে থাকি
সকালে খবরের কাগজ এলে
ছুঁতেও ভয় করে
লাইনবন্দী চেনামুখগুলো
একের পর এক
একের পর এক ভেসে ওঠে।”
(১৭১ পৃ: ।। শ্রেষ্ট কবিতা।। সুভাষ মুখোপাধ্যায়)
জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কল্লোলিত জীবন প্রবাহে ৭৩টি বছর পার করে তিনি চলে গেলেন। আলো-ছায়াময় পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে তিনি চলে গেছেন এক না ফেরার দেশে। জানি, তাঁকে নিয়ে আক্ষেপ করা অনর্থক, তবুও কিছু কথা এসে গেল।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার ভাষায়, একটি যুগ সন্ধিক্ষনে যখন, রাত্রে রেডিওতে খবর বলে কানে আঙুল দিয়ে রাখি/সকালে খবরের কাগজ এলে ছুঁতেও ভয় করে, ঠিক সে মুহূর্তে ৬ই সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবারে সময়ের খবর বাংলাদেশের দক্ষিণ উঠানের সব চেয়ে জনপ্রিয়, পাঠক নন্দিত পত্রিকাটি হাতে নিয়ে, প্রথম পৃষ্ঠার লেফট বটম এ বক্স আইটেম এ একটি খবর... শিক্ষাবিদ মোসলেম উদ্দিনের ইন্তেকালে/সময়ের খবর পরিবারের শোক।” খবরের দেহে চোখ বুলাতেই দেখলাম, এতো আমার প্রিয় মোসলেম ভাইয়ের খবর।
মুহূর্তে বুকের ভেতর একটা কামড় দিয়ে হৃদপিন্ডে মোচড় খেলো। শান্ত স্বভাবের, নম্র কোমল, সদালাপি, মিশুক মনের হাজারে একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক, বহু গ্রন্থের লেখক, মুক্তবিবেক, মুক্তচিন্তার বড় মাপের খাঁটি মাটির মানুষ, সাদামনের মানুষ- প্রফেসর ড. মোসলেম ভাই নেই। নিজের মনের কাছে নিজেকে বড় পাপী মানুষ বলে মনে হলো। কারণ? .......... কারণ, এতদিন এই মানুষটির কোন খবর রাখিনি। চা আড্ডায়, কোনো একান্ত পরিবেশে মোসলেম ভাই কিছু মুখে তোলার আগে স্নেহের অনুজ বিবেচনায় যে সম্বোধনটি করতেন একান্ত অগ্রজ হিসেবে নাম ধরে। তার কোন তুলনা চলে না।

১৯৯১-’৯২ খ্রিস্টাব্দের কোন এক সময় পত্রালাপে সংবাদপত্রে অভিনন্দন জানানোর মাধ্যমে তাঁর সাথে আমার পরিচয়। প্রফেসর মোসলেম উদ্দিন সাহেব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে গবেষণায় পিএইচডি করেন। স্থানীয় দৈনিক পূর্বাঞ্চল পত্রিকায় মিকশিমিলের বাসিন্দা, সরকারী মহিলা কলেজের প্রভাষক (তখন প্রভাষক)-এর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন সংক্রান্ত খবরটি মনে সাংঘাতিক দোলা দিল। সংবাদপত্রে অভিনন্দন, শুভেচ্ছা জানিয়ে তার কাটিং কপিসহ আলাদা চিঠিতে তাঁকে অভিনন্দন জানানোয় উনি দারুন খুশী হয়ে অনুজ প্রতীম এ অভাজনকে একটি চিঠিও দিলেন। ব্যস এই পর্যন্ত। তারপর অগ্রজপ্রতিম মোসলেম ভাইয়ের স্নেহ সিক্ত হয়েছি যে কত শতবার তা’ বলাই বাহুল্য। 
এখন তো পরপারের বাসিন্দা মৃত মোসলেম ভাইয়ের জবানবন্দী নেয়া যাবে না, তাই কী করে বুঝাবো, তাঁর-আমার মধ্যে তেমন সম্পর্ক ছিলো! যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান কবি, প্রফেসর বাল্য বন্ধু হাফিজের (হাফিজুর রহমান) বাসায় যশোর বোর্ডের পরীক্ষার খাতা নিরীক্ষণ কাজের ফাঁকে ফাঁকে কত সুন্দর মধুর নির্দোষ হাস্যরসের আড্ডা, চিরকাল সিনেমা স্লাইডের মতো মনে অম্লান বন্দী থাকবে। প্রফেসর হাফিজের ঘরণী ডুমুরিয়া মহাবিদ্যালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হোসনে আরা ভাবি বরিশালের মেয়ে, ভীষণ অতিথিয়েতা প্রবণ মমতাময়ী রমনী। তিনি ঘন্টায় ঘন্টায় আমাদের দু’ভাইসহ ডুমুরিয়ার মাওলানা ভাসানী কলেজের (বানিয়াখালি) সহকারী অধ্যাপক আমার ও অনুজ প্রতীম হযরত আলি খানের সৌজন্যে টিব্রেক দিচ্ছিলেন, আর মোসলেম ভাই চা এবং পান খেয়ে ছোট্ট ছোট্ট গল্পের মাধ্যমে পরীক্ষার খাতা নিরীক্ষণের মতো নিরস কাজে বিনোদনের আনন্দঘেরা রস সঞ্চার করছিলেন। সেই আড্ডা, সেই প্রাণবন্ত মুহূর্তের স্মৃতি আজও ভুলতে পারিনে।
মনে হয় সেদিনের কথা, তাও প্রায় দেড় যুগ পার হয়েছে, বানরগাতি বাজারে সহসা দেখা হওয়ায় ধরে নিয়ে যান নিজের বাসায়, নানা রকম আপ্যায়নের পর অগ্রজ প্রতীম মোসলেম ভাই তার নিজস্ব স্টাইলের সম্বোধনে বললেন, ‘কাদের তুমিতো একজন প্রফেসর মানুষ, নাও আমার লেখা অনার্স, প্রিলিমিনারী ক্লাসের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য (লেখা) এই বাংলা গাইড খানা।’ ঢাকার বাংলা বাজারের আব্দুল্লাহ এন্ড সন্সের প্রকাশনা সংস্থা প্রফেসর ড. মোসলেম উদ্দিন সাহেবের বই ছাপে। সরল ভাষা, সুখপাঠ্য ও প্রকাশনার মূল লেখক ছিলেন আমার অগ্রজ প্রতীম প্রফেসর ড. মোসলেম উদ্দিন। আমি বলার আগেই যেন মেঘের আগেই না চাইতে জল অর্থাৎ মোসলেম উদ্দিন সাহেবের গাইড বই আমার কলেজে পৌঁছে যেতো। এর কারণ? আমি এর একটি কারণ খুঁজে পেয়েছি তা হলো “We were both men of the same soil” অর্থাৎ আমরা একই মাটিতে জম্মেছি এবং বেড়ে উঠেছি। এলাকার দরদই ছিল মুখ্য।
পেশাগত কনট্রাক্টের কারনে আমি যখন সাংবাদিকতা ছেড়ে ডুমুরিয়া সদরে ১৯৯৪ সালে সদ্যস্থাপিত শহীদ স্মৃতি মহিলা কলেজে চাকরীর জন্য দরখাস্ত করেছি, প্রফেসর ড. মোসলেম উদ্দিন, সিটি কলেজের হেলাল খানসহ ৬ জন এক্সপাটের ছল জওয়াবের মুখে আমি লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় প্রথম হই। প্রফেসর ড. মোসলেম উদ্দিনের কাছে ঐ প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ (সে অন্য স্কুুলে কর্মরত, রাজনৈতিক বিবেচনায় মনোনীত) চাকরীর জন্য আমার প্রথম হওয়া রেজাল্ট পাল্টে আমাকে বাদ দেয়ার প্রস্তাব নিয়ে মোসলেম ভাইয়ের কাছে যান। নীতির প্রশ্নে বজ্রের মতো কঠিন, আপোসহীন প্রফেসর ড. মোসলেম উদ্দিন সাহেব ঐ অধ্যক্ষকে (ভারপ্রাপ্ত) জানান, “দেখো তুমি আমার আত্মীয় হতে পারো, কিন্তু কাদের খানের ঐ রেজাল্ট এবং মার্কস আমি উল্টাতে পারবো না। ঐ রেজাল্ট এক্সপার্টদের সম্মিলিত রেজাল্ট।” পরে গল্প প্রসঙ্গে পরম স্নেহের আদ্রমাখানো কণ্ঠে ৮/১০ বছর পর তখন আমি ডুমুরিয়ার শহীদ স্মৃতি মহিলা কলেজে বাংলা বিভাগের প্রধান, উনিই (মোসলেম ভাই) এই গোপন ক্যূ প্রচেষ্টার খবরটি আমাকে জানিয়েছিলেন।
প্রফেসর ড. মোসলেম উদ্দিন কত বড় মাপের শিক্ষাবিদ ছিলেন তা বোধকরি তাঁর ছাত্ররা ভালো বলতে পারবে। পিতার স্নেহ, অমনি দরদমাখা অন্তরের আলোকিত শিক্ষাবিদ আমি খুব কমই দেখেছি। প্রফেসর ড. মোসলেম উদ্দিন সাহেবের সাথে কথা হচ্ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যজীবন নিয়ে। আমি ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ১৬৯ নং কক্ষের ছাত্র ছিলাম।
অগজ মোসলেম উদ্দিন সাহেবকে বলতে হতো কোন প্রফেসর কী পড়াতেন। ড. আহমদ শরীফ বঙ্কিম উপন্যাস, ড. নীলিমা ইব্রাহিম রবীন্দ্রকাব্য, ড. হুমায়ূন আজাদ ভাষাতত্ত্ব, ড. মুনিরুজ্জামান ভাষার ইতিহাস, ড. সৈয়দ আকরাম হোসেন রবীন্দ্র উপন্যাস, ড. ওয়াকিল আহমেদ মধ্যযুগের সাহিত্য, ড. রফিকুল ইসলাম নজরুল কাব্য, ড. আবুল কালাম মঞ্জুর মোরশেদ মানিক বঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস, ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল জসীম উদ্দিনের কাব্য, ড. নরেশ বিশ্বাস ছন্দ বিষয়ক। এ সব প্রসঙ্গ নিয়ে সবিস্তারে  আলোচনা হতো।
ড. মোসলেম ভাই অল্প সময়ের মধ্যে কাউকে কাছের মানুষ বানানোর স্রষ্টাপ্রদত্ত একটা অলৌকিক গুন ছিল। নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে জাহির করার কোনো অহংকার বা আহম্মক দুর্বুদ্ধি তার ছিল না। আজ মনে হচ্ছে, তার জীবদ্দশায় আরও যেতে পারলাম না কেন?..... এ আক্ষেপ রাখবো কোথায়? ওমর খৈয়ামের সেই কথা, শুধু মোসলেম ভাইয়ের বেলায় ঠিক বলে মনে হয়: “দিন কতকের মেয়াদ শুধু/ ধার করা এই জীবন মোর/হাসি মুখে ফেরত দেবো/সময়টুকু হলে ভোর।”
৫ই সেপ্টেম্বর শারদীয় দিপ্রহর না গড়াতেই এই নির্বিরোধ সজ্জন ব্যক্তিটি মাত্র ৭৩ বছর কাটিয়ে চলে গেলেন, আমাদের তার কাছে পাওয়া স্নেহের চির কাঙ্গাল করে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-পরিচালক গাজী আলাউদ্দিন আহমদ এবং তাঁর অগ্রজ খুলনা সরকারি মহিলা কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ প্রফেসর জালাল উদ্দিন আহমদসহ তার শুভানুধ্যায়ী প্রত্যেকেই তার এই অকাল প্রস্থানে ভীষণ থমকে গেছে, সবাই শোকার্ত, মর্মাহত। আমি জানি, ওপারে যেয়ে এই মানুষটি পৃথিবীর মালিকের যথেষ্ট সহানুভূতি পাবেন। কারণ ক্ষনায়ূ জীবনে প্রফেসর ড. মোসলেম উদ্দিন মনে করতেন,
                    “Ask not
                    What your Country can do for you
                    Ask
                    What you can do for your country.”
- Canadee
ভদ্রা-পদ্মার বিধৌত পলল মাটির এই কৃতী সন্তানটি কখনো সুখ্যাতি সুনাম, অর্থ-যশ-প্রতিপত্তির পেছনে ছোটেননি, যারা তার সান্নিধ্য পেয়েছিলেন, আজ অকপটে একথাটিই বার বার বলতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ ধনে গরীব, কিন্তু মনের গরীব হলে কী চলবে স্বাধীন একটি দেশে, যে সমাজে যে দেশে গুনীজনের মূল্যায়ন হয় না, সে সমাজে বা দেশে গুনীজন জন্মায় না। আসুন আমরাও বলি, রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণে আরেক কালজয়ী কথা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র যেমন বলেছিলেন, “এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরনে তাহাই তুমি করে গেলে দান।”
প্রফেসর ড. মোসলেম উদ্দিন সাহেবের একাধিক গ্রন্থ, তাঁর লেখা, তাঁর প্রকাশনা তাঁকে নি:সন্দেহে চিরজীবী করবে তাঁর এক দীন ভক্ত হিসেবে এ প্রত্যাশা মনে মনে লালন করি। প্রফেসার ড. মোসলেম উদ্দিন জোয়ার্দার মিকশিমিলের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম শিক্ষিত বনেদী পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ, বিশাল শিক্ষকতা জীবনে কখনও গম্ভীর, বিষন্ন, বিদ্যাভারে আক্রান্ত দেখিনি। তার জীবন, রেখে যাওয়া নীতি আদর্শ আমৃত্যু আমাদের প্রেরণা জোগাবে। সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা তার ভক্ত, শুভানধ্যায়ী, সজনের সাথে এই স্মৃতিচারনমূলক কথামালা ব্যক্ত করে বলতে চাই, “তোমার কর্মের চেয়ে তুমি যে মহৎ/তাই তব জীবনের রথ ফেলিয়া যায় র্কীতিতে তোমার।” প্রফেসর ড. মোসলেম ভাই আপনার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। 
রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, আবারও বলি...... “জীবনে যা’ প্রতিদিন ছিল মিথ্যা অর্থহীন ছিন্ন ছড়াছড়ি মৃত্যু কী ভরিয়া সাজি রাখিয়াছে তারে আজি অর্থপূর্ণ করি।”
(লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট)


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

বঙ্গবন্ধুই আমার প্রেরণা 

বঙ্গবন্ধুই আমার প্রেরণা 

১৫ অগাস্ট, ২০১৮ ০০:৫০







সমাজ ও গ্রন্থাগার

সমাজ ও গ্রন্থাগার

০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ০০:০০


জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ

জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ

১০ জানুয়ারী, ২০১৮ ০০:২৩

এই ছবিটি যেন ‘বিরল’ হয়ে না থাকে

এই ছবিটি যেন ‘বিরল’ হয়ে না থাকে

২১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ব্রেকিং নিউজ

খুলনায় ৫ জনের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ

খুলনায় ৫ জনের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ

১৩ নভেম্বর, ২০১৮ ০১:০২