খুলনা | বুধবার | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ১০ আশ্বিন ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

একটি স্বপ্নের মৃত্যু আর ডাক্তারের নির্লজ্জ ক্লিনিকবাজী !

আব্দুস সালাম তরফদার  | প্রকাশিত ০৩ অগাস্ট, ২০১৮ ০০:২১:০০


সানজিদা (ছদ্মনাম) আমার অতি নিকট আত্মীয় । ওর শিশু-কিশোরী বেলার অনেকটাই কেটেছে  আমার পরম আদর-স্নেহে আর ভালোবাসায়, কন্যাসম বললে অমূলক হবে না। মিষ্টি মেয়ে সানজিদা এক সময় ওদের সারা বাড়িতে দুষ্টমী আর হৈ চৈ-এ আমাদেরকেও বেশ উৎফুল্ল করে রাখত সারাটা বেলা। ছোট ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ও ছিল আমার চরম ভক্ত। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে সবে স্নাতকে ভর্তি হয়েছে সানজিদা। ওর বাবা উঠে পড়ে লেগে গেলেন একমাত্র কন্যাটি পাত্রস্থ করবে বলে। আমরা সবাই সহযোগিতা করলাম। আমি চেয়েছিলাম অল্প বয়সে বিয়ে হচ্ছে মেয়েটির, সুখে থাকুক ঠিক ওর মত করে। ভালো জামাই পাওয়া গেল। স্মার্ট, সুদর্শন আর অসম্ভব বিনয়ী ছেলে আহসান (ছদ্মনাম)। ঢাকাতে কর্পোরেট চাকুরি করে। ভালো টাকা বেতনও পায়। ঢাকার উত্তরা এলাকাতে থাকে। সুখেই রেখেছে আমাদের সানজিদাকে। কিন্তু বড় অতৃপ্তি হলো, ওরা নিঃসন্তান। আমরা বুঝি ওর কষ্টটা, কারণ আমরাও এক সময় ওদের মত নিঃসন্তান ছিলাম। 
প্রায় ৬/৭ বছর হয়ে গেল অনেক চিকিৎসার পরেও কোন সন্তান এলো না সানজিদার। অবশেষে একদিন সানজিদার সু-খবরটা পেলাম। সে মা-হতে যাচ্ছে। আমার স্ত্রী ও আমি বেজায় খুশী। চরম খুশী সানজিদার মা-বাবা ও দাদীজান। ঢাকার উত্তরার এক নামী-দামী বেসরকারি হাসপাতাল/ক্লিনিক-এ নেওয়া হলো সন্তান প্রসবের জন্যে। একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তান হলো সানিজদার। অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা সানজিদা-আহসানের। হৈ চৈ আনন্দ আর মিষ্টি মুখ। কিন্তু বিধিবাম, নবজাতকটি বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আপ্রাণ প্রচেষ্টা চলছে ডাক্তারদের। নাহ! কোন মতেই কিছু করা গেল না। ভেঙে চুমমার হয়ে গেল সকল আশার প্রাসাদ বাড়ি সানজিদা-আহসানে। স্বপ্নের মৃত্যু হলো ২/১ ঘন্টার ব্যবধানে। সান্ত্বনার ভাষা জানা নেই। খুলনা হতে খবর পেলাম। আইসিসিইউতে কন্যা শিশুটিকে রাখা আছে। সম্মানিত ডাক্তারগণ সহজে মৃত্যু খবর দিলেন না। ডাক্তার ও ২/৪ জন কর্মচারী মিলে শুরু হলো লোলুপ ক্লিনিকবাজী। নির্লজ্জের একটা সীমা থাকা চাই। অর্থ নিয়ে কেউ কবরবাসীও হয় না, কিংবা চিতায়ও ওঠে না ডাক্তারদের পক্ষ হতে একজন সানজিদার আত্মীয়দের আশান্বিত করে একটা জুয়াড়ী প্রস্তাব ছুড়ে দিলেন। তাহলো যদি ৩ লাখ টাকা যোগাড় করে তাদের হাতে দেয়া যায় তাহলে নাকী তারা নতুন করে বাচ্চাটিকে বাঁচিয়ে তোলার শেষ চেষ্টা করবেন। ভাবটা এমন আজরাইল ফেরেস্তার সাথে তাদের একটা গোপন আর চুড়ান্ত চুক্তি নির্ঘাত হয়ে গেছে এর মধ্যে ।
ইতোমধ্যে একজন মানবতাবাদী সিনিয়র স্টাফ নার্স খুব কৌশলে সানজিদার এক আত্মীয়কে ডেকে নিয়ে গেল গোপন স্থানে। তিনি যা বললেন তাতে রীতিমত অবাক করার মত ব্যাপার। তিনি তার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান যে, আপনাদের বাচ্চাটির প্রায় ১ ঘন্টারও বেশি আগে মৃত্যু ঘঠেছে। তারা এভাবে টাকা নেয়ার ফাঁদ পেতে নির্লজ্জ লোলুপ আচরণ করছে । যাই হোক, শিশুর লাশ নিয়ে চলে গেল সানজিদা-আহসানের পরিবার। তারা বুঝে গেছে ইতোমধ্যে যে ৩ লাখ কেন ৩০০ কোটি টাকাতেও ফিরবে না শিশুটি ।
উপরের ঘটনায় আমার শৈশবের কথা মনে পড়ে গেল। ছোট বেলাতে গ্রামে দেখতাম গরু মারা গেলে আমাদের গ্রামে বসবাসকারী ঋসি সম্প্রদায়ের লোকের মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতা ছিল কে আগে চামড়াটা খসিয়ে নিতে পারে, কারণ সেটা বিক্রি করে কিছু পয়সা তারা পাবে। তাই তাদের প্রাণান্ত ছুটা-ছুটি যে যে  আগে মরাগুরুটি ছুঁতে পারবে তাকে টাকার একটা ভাগ দেয়া হতো। ঠিক তেমনই হাসপাতালে আশরাফুল মাকলাতের লাশ নিয়ে দু’পয়সা কামাই-এর ধান্ধা-ফিকির আর কী? কতিপয় ডাক্তার নামের দেশের কলঙ্ক আর নির্লজ্জ লোভী কিছু ইতর কর্মচারী যারা লাশের ট্রলি ছুঁয়েও পয়সা কামাই করে। ভাবটা এমন যতজন ট্রলি ছুঁয়ে লাশ হস্তান্তর করবে ততজন টাকার দাবিদার। হোক সে শিশু, তরতাজা যুবক-যুবতি বা বৃদ্ধ-বৃদ্ধা।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার একটা উপন্যাসে পড়েছিলাম ‘হিংস্র প্রাণি বাঘ বাঘকে মারে না, সিংহ সিংহকে মারে না কিন্তু মানুষ মানুষকে মারে একেবারে জানে-প্রাণে মারে।’ আমরা সে মানুষ জাতি। মায়া-মমতা-বিবেক-মানবিকতা-মনুষ্যত্ববোধ কী অর্থের কাছে হেরে যাচ্ছে? এটা কী আর ফিরে পাবার নয়?  মানুষের মৃত্যুভয় কী আর একজনের মৃত্যুতেও হৃদয় স্পর্শ করতে পারে না। হায়রে খোলস পরা মানুষগুলো, তোরা আসল মানুষ কবে হবি?


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ


বঙ্গবন্ধুই আমার প্রেরণা 

বঙ্গবন্ধুই আমার প্রেরণা 

১৫ অগাস্ট, ২০১৮ ০০:৫০






সমাজ ও গ্রন্থাগার

সমাজ ও গ্রন্থাগার

০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ০০:০০


জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ

জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ

১০ জানুয়ারী, ২০১৮ ০০:২৩

এই ছবিটি যেন ‘বিরল’ হয়ে না থাকে

এই ছবিটি যেন ‘বিরল’ হয়ে না থাকে

২১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ব্রেকিং নিউজ












তৃতীয় ফাইনাল নাকি স্বপ্ন ভঙ্গ

তৃতীয় ফাইনাল নাকি স্বপ্ন ভঙ্গ

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:৫৫