খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১৫ নভেম্বর ২০১৮ | ১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

মাদকবিরোধী অভিযানে আশানুরূপ সফলতা মিলছে না

খুলনায় তালিকার বাইরে অসংখ্য বিক্রেতা-ডিলার ও শেল্টারদাতা!

সোহাগ দেওয়ান  | প্রকাশিত ০৯ জুলাই, ২০১৮ ০০:৩৭:০০

সারাদেশে গত ২/৩ মাস ধরে চলছে মাদক বিরোধী বিশেষ অভিযান। ইতোমধ্যেই এ অভিযানকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদক বিক্রেতাদের সাথে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে কমপক্ষে দেড়শ’ জন। তবে থেমে নেই মাদকের কেনা-বেচা। কৌশল পরিবর্তন করে মাদক ব্যবসা চালাচ্ছে বিক্রেতারা। মাদক ব্যবসায়ী ও গডফাদারদের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী র‌্যাব-পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত থাকলেও খুলনায় আশানুরূপ সফলতা মিলছে না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ছে না তালিকাভুক্ত চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও গডফাদাররা। রাজনৈতিক দলের কতিপয় নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থেকে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা পার পেয়ে যাচ্ছেন। তাছাড়া আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকাভুক্ত নয় এ ধরনের মাদক বিক্রেতা, ডিলার ও শেল্টারদাতার সংখ্যাও কম নয়। তালিকাভুক্ত না হওয়ায় ফুর ফুরে মেজাজে স্ব-স্ব এলাকায় তারা মাদকের কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তাদের সম্পর্কে কোন তথ্য না থাকায় অভিযানের আওতায় আসছে না এ মহলটি। তবে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি এলাকায় চিহ্নিত হয়েছে এ ধরনের কয়েকটি মাদক সিন্ডিকেট। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে মাদসহ  একটি সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশ হওয়া মাদকের তালিকাভুক্ত নন এ ধরনের অনেকেই মাদক বিক্রেতাদের শেল্টার দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। 
তালিকায় নাম না থাকায় ফুরফুরে মেজাজে রয়েছেন ওই সকল পৃষ্ঠপোষকেরা। বিশেষ করে খুলনা মহানগরীতে ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে তালিকায় নাম না থাকা একজন নারীর নাম ওঠে এসেছে। তাকে শেল্টার দিচ্ছেন স্থানীয় পর্যায়ে সরকার দলের একজন থানা পর্যায়ের নেতা। বিশেষ পেশার নাম ভাঙিয়ে ওই নারীকে দিয়ে নগরীতে ইয়াবার চালান করা হচ্ছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। তাদের সহযোগিতায় খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের দুই থেকে তিনজন উপ-পুলিশ পরিদর্শকের নামও শোনা যাচ্ছে। তবে এ সকল পুলিশ কর্মকর্তাদের নামও মাদকের ওই তালিকায় নেই। 
এদিকে সারাদেশে মাদক বিরোধী অভিযানে মহানগরীসহ খুলনা জেলার চিত্র কিছুটা হতাশাজনক। র‌্যাব পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানে খুচরা ক্রেতা-বিক্রেতারা ধরা পড়লেও রাঘব বোয়ালরা থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। দেশের অন্য জেলার তুলনায় খুলনায় মাদকবিরোধী অভিযান অনেকটাই শিথিল। সারাদেশে প্রচুর রাগব-বোয়ালরা ধরা পরলেও খুলনায় চিহ্নিত ও তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ীরা অদৃশ্য কারণে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছেন। আর যাদেরকে ধরা হচ্ছে অধিকাংশ মাদকের খুচরা ক্রেতা-বিক্রেতা এবং মাদকসেবী।
এছাড়া খুলনার চিহ্নিত ও তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ীরা গা ঢাকা দিয়ে ব্যবসার ধরণ পরির্বতন করে মাদক তুলে দিচ্ছে আসক্তদের হাতে। অভিযান শুরুর পর গ্রেফতার এড়াতে শহর ছেড়ে একটু নিজেদের আঁড়ালে রেখেছেন তারা। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আসক্তদের গ্রামে ডেকে নিয়ে মাদক কেনা বেচা করছে মাদক ব্যবসায়ীরা। আর তালিকায় নাম নেই এ ধরনের নারী-পুরুষদের হাতে চলে গেছে মরণ নেশা ইয়াবার বাণিজ্য। 
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো মাদক ব্যবসায়ী ও পৃষ্ঠপোষকদের তালিকায় মহানগরীসহ খুলনা জেলায় ২৭২ জন মাদক ব্যবসায়ীর নাম উঠে এসেছে। এসব ব্যবসায়ীর আশ্রয়দাতা হিসেবে ৫০ জনের নাম তালিকায় রয়েছে। আর পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চোরাকারবারিদের সহযোগিতা করে এমন ৩৪ জনের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবে সম্প্রতি সময়ে মাদকের পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতার অভিযোগে উঠে আসা তালিকা নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়ায় খুলনার মাদক বিরোধী অভিযানে আশানুরূপ সাফল্য মেলেনি। 
পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, মাদকসহ হাতে নাতে গ্রেফতার হওয়া আসামির স্বীকারোক্তিমতে ডিলারদের আসামি করা হলেও তারা শেষ পর্যন্ত বিচারের আওতায় আসে না। আইনের নানা ফাঁক ফোঁকর দিয়ে তারা মামলা থেকে রেহাই পেয়ে যায়। তাছাড়া অল্প পুঁজিতে অধিক লাভের এ ব্যবসা থেকে আয় হওয়া প্রচুর টাকার মধ্যে একটি বড় অংশ ব্যবসা টিকিয়ে রাখার পেছনে ব্যয় করেন তারা।
মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান সম্পর্কে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিটি পুলিশিং) সোনালী সেন বলেন, মাদকের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযান সব সময় চলমান থাকে। যা বর্তমানে আরো কঠোরভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
র‌্যাব-৬’র স্পেশাল কোম্পানি কামন্ডার মোঃ এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি মাদকের ব্যপারে র‌্যাবের অভিযান আরও জোরদার করা হচ্ছে। মাদক বিক্রেতারা নানাপন্থা অবলম্বন করছে। আমাদের গোয়েন্দারাও সেইভাবে তাদের নজরদারি করছেন। তিনি বলেন, মাদক বিক্রেতারা যতই নতুন নতুন পন্থা অবলম্বন করুক ধরা পড়তেই হবে। 
খুলনা জেলার পুলিশ সুপার এসএম শফিউল্লাহ বলেন, মাদকের বিষয়ে কোন আপোষ নেই। মাদকের সাথে জড়িত যে হোক তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। মাদক ব্যবসায়ীদের ধরতে পুলিশের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান চলছে বলেও জানান তিনি।
জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোঃ রাশেদুজ্জামান বলেন, সম্পৃতি সময়ে যারা মাদকসহ গ্রেফতার হচ্ছে তারা তালিকাভুক্ত না হলেও বড় ধরনের ব্যবসায়ী ও ডিলার। প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীরা নিজেদের সিস্টেম পাল্টে অভিনব কায়দায় মাদক বিক্রি শুরু করেছে। তিনি বলেন, গত ১ জুলাই বিকেলে নগরীর সদর থানাধীন মুন্সিপাড়া এলাকা থেকে ১১০ পিস ইয়াবাসহ মিলন নামের একজন খুচরা বিক্রেতাকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর তাকে জিজ্ঞাসাবাদে ডিলারের সন্ধানে গিয়ে লবণচরা থানাধীন দারোগার লিজ এলাকার রায়পাড়া রোডের একটি বাড়ি থেকে সাড়ে ৭ হাজার পিস ইয়াবাসহ মাদকের ডিলার সেলিমের স্ত্রীকে গ্রেফতার করা হয়। তবে এদের কারও নাম ইতিপূর্বে কোন তালিকাভুক্ত ছিল না বলেও তিনি জানান। তবে  মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জনবল ও যানবাহন সংকটের কারনে অভিযান কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি মাদক বিরোধী সাঁড়াশি অভিযানে খুলনা জেলা ও মহানগরীতে ইয়াবা, গাঁজা, ফেন্সিডিলসহ বেশ কিছু আসামি গ্রেফতার হয়েছে। খুলনার আদালতের বিভিন্ন মামলার রায় ও এজাহার সূত্রে দেখা গেছে, মহানগরীসহ খুলনা জেলার শতকরা ৯০ ভাগ মামলার আসামিরা খুচরা বিক্রেতা ও বহনকারী। মাদক মামলার ৩৫ ভাগ আসামি নারী, ৪০ ভাগ প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ, ১০ ভাগ কিশোর/কিশোরী ও  ১০ ভাগ শিশু। এছাড়া শতকরা মাত্র ৫ ভাগ মামলায় মাঝারী ডিলার প্রকৃতির মাদক বিক্রেতা রয়েছে।

বার পঠিত

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ