খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১৮ অক্টোবর ২০১৮ | ২ কার্তিক ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

বিশ্বকাপ ফুটবল বনাম ভিনদেশী পতাকা  প্রীতি আর আমাদের অসুস্থ মানষিকতা 

আব্দুস সালাম তরফদার | প্রকাশিত ২১ জুন, ২০১৮ ০১:১৫:০০


গত ২০১৪ বিশ্বকাপে আমি কিছুটা লিখেছিলাম। ভেবেছিলাম বিশ্বকাপ উন্মাদনার নামে অসংযত ক্রীড়ামোদিদের কোনরূপ কাঁটা হবো না আর। কিন্তু  পত্র-পত্রিকা আর  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে অবর্ণীয় দেশি-বিদেশী জাতীয় পতাকার সীমাহীন অবমাননা আমাকে লিখতে বাধ্য করেছে। আমাদের দেশ ৩০ লক্ষ শহিদের রক্তের বিনিময়ে যেমন পতাকা পেয়েছে তেমনি বিশ্বের অন্যান্য স্বাধীন দেশগুলোও কিছু না কিছু মহান ত্যাগের বিনিময়ে তাদের পতাকা পেয়েছে। আজ বিশ্বকাপ খেলার উন্মাদনায় আমাদের দেশের মত ত্যাগী জাতি সমৃদ্ধ দেশে ভিন্ন কোন দেশের জাতীয় পতাকার অবমাননা কাম্য নয়। কোন একজন ব্রাজিল সমর্থক যদি আর্জেন্টিনার পতাকা দিয়ে শৌচাগারের পর্দার ডামি তৈরি করে, আবার আর্জেন্টিনার সমর্থক যদি কেউ ব্রাজিলের পতাকা চিহ্ন ব্যবহার করে শৌচাগারের বদনার ডামি তৈরি করে ফেসবুকে পোস্ট করেন সেটা বাঙালি জাতি হিসেবে কতটা সম্মানের আমার বোধগম্য নয়। বিভিন্ন সমর্থক গোষ্ঠীর এমন ন্যাক্কারজনক আচরণ আমাদের ভেবে দেখা দরকার। আমরা যদি দেখতাম আমাদের দেশের কষ্টার্জিত, বৃহৎ ত্যাগের পতাকাটি কোন দেশের শৌচাগারের পর্দার ডামি হিসেবে অবমাননা করা হচ্ছে তা হলে একটা স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের কতটা খারাপ লাগতো সেটাও একবার ভাবা দরকার।
খেলা একটা পরিমার্জিত বিনোদন। এ বিনোদন আমরা সবাই মিলে যার যার সহাবস্থানে থেকে উপভোগ করতে পারি। তবে সমর্থকদের সীমাহীন উন্মাদনা, অবিবেচনা প্রসূত আচরণ পারস্পরিক শান্তি বিনষ্টের কারণ। একটা পত্রিকা খবরে দেখলাম, ‘খুলনার দৌলতপুরে বিশ্বকাপ ফুটবলের ভিন্ন সমর্থকদের হামলায় দু’জনকে কুপিয়ে জখম।’ হাসতেও হয়, আমরা কারা? ফুটবল বিশ্বকাপ খেলা হচ্ছে রাশিয়ার মাটিতে, আমরা যেখানে অংশ গ্রহণকারী কোন দলও নই, বিশ্বকাপ ফুটবল আসরের আয়ের ভাগ আমার জানামতে আমাদের দেশেরও নেই। সেখানে দেশের শহর-পল্লীতে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা নিয়ে খুন-খুনি, রক্তা-রক্তি কারবার! আমরা জাতি হিসেবে বড়ই আবেগ প্রবণ বটে, তাই বলে এতদূর যেতে হবে? আরে বাবা জার্মানী জিতলে তোমার বা তোমার বাবার কী উপকার হবে? আর ব্রাজিল জিতলেও বা তোমার বা তোমার বাবার কী উপকার হবে? পারিবারিক দ্বন্দ্ব, দাম্পত্য কলহ, ভাইয়ে-ভাইয়ে লড়াই, বন্ধু-বন্ধু লড়াই, পিতা-পুত্রের লড়াই ভিন দেশের খেলা নিয়ে কেন চলবে এ দেশের জনপদে? আমাদের বোধ শক্তি কী খেলার উন্মাদনায় এত ভোতা হয়ে যাচ্ছে? গত বিশ্বকাপে আমার স্পেন-এর খেলাটা খুব ভালো লেগেছে। স্পেন আমার জ্ঞাতি ভাই নয় যে, সারা জীবন স্পেন-এর পতাকা নিয়ে বিলাপ করতে হবে। খেলা চলছে, জার্জি থাকলে গায়ে দিন, পতাকা থাকলে আগে আপনার জাতীয় পতাকা তুলুন তারপর আপনার সমর্থক পতাকা। এভাবে জানান যে আমি প্রথমতঃ বাংলাদেশি, দ্বিতীয়তঃ আমি স্পেনের খেলা ভালোবাসি তাই আসুন  আমরা কিছু সময়ের জন্য পতাকা বন্ধু হই। ইতালী জিতে গেল, ভালো কথা, স্পেন হারল। আসুন আমরা সবাই মিলে মিষ্টিমুখ করি এটাই তো উপভোগ্য বিষয়, এটাই তো বিনোদন হওয়া উচিত। খেলার মাঝে তা না করে বাজে মন্তব্য ছুঁড়ে প্রতিপক্ষকে উত্তেজিত করে খেলা শেষে রক্তা-রক্তি এটা কী কারো কাম্য হতে পারে? নাকী বিশ্বকাপের উন্মাদনায় আমরা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি?
নিজের দেশের পতাকাটাকে কতটুকু জানি আমরা? একটা পরিসংখ্যানে দেখা গেছে আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের প্রায় শতকরা ৬০-৬৫ ভাগ লোক জাতীয় পতাকার পরিমাপ, জাতীয় পতাকা উড্ডয়নের নিয়ম কানুন, সংরক্ষণ এসব বিষয়ে পুরোপুরি জানি না। যাঁরা আমরা নিজের দেশের পতাকা উড়াতে জানিনা তাদের বিদেশী পতাকার দরদ এতো উথলে ওঠে কেন? আবার প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে কেনইবা ভিন দেশের পতাকা দিয়ে শৌচাগারের পর্দা বানিয়ে অবমাননা করতে হবে? যারা অন্য দেশের পতাকার মর্যাদা দিতে জানে না, তাদের হাতে কী দেশের পতাকা নিরাপদ? আমাদের লজ্জাবোধ থাকা উচিত যে জাতীয় দিবস গুলোতে এসব ভিনদেশী পতাকা প্রেমীদের একটা বড় অংশই সঠিক ভাবে দেশের পতাকা উড়াতে পারবেন না।
২০১৪ সালে যশোর জেলা প্রশাসক মোস্তাফিজুর রহমান স্যারের একটা প্রসংশনীয় উদ্যোগ ছিল দেশের মাটিতে বিদেশী পতাকা উত্তোলন বন্ধ করা। মোস্তাফিজ স্যার এখন যুগ্ম-সচিব পদমর্যাদার একজন সিনিয়র কর্মকর্তা। স্যারের সঙ্গে আমার প্রায় চাকুরি জীবনের প্রথম হতে (তিনি যখন কেশবপুর উপজেলায় সহকারী কমিশনার ভূমি হিসেবে কর্মরত ছিলেন) ব্যক্তিগত ভাবে জানা শোনা আছে। তাঁর দেশপ্রেম সংক্রান্ত নির্দেশনা কোন ক্রমেই ভুল ছিল না। তিনি তৎকালীন দেশের শ্রেষ্ঠ জেলা প্রশাসক পদকসহ একাধিক পদকে ভূষিত হন। স্বাধীনতা পরবর্তীতে যাঁরা যশোর জেলা প্রশাসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতম আসনে অবস্থান করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিশ্বকাপ-২০১৪-এর বিদেশী পতাকা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে আমার জানামতে তৎকালীন অনেক জেলা প্রশাসকসহ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও সুশীল সমাজ ভূয়সী প্রশংসা করেন। তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ও বিদেশী পতাকা নামানোর সিদ্ধান্তের বিষয়সহ স্বাগত জানিয়ে আমার নিজের একটি লেখা যশোর জেলা প্রশাসক মহোদয়ের অনুমতিক্রমে ফেসবুকে পোস্ট করি, যা কোন একটা অনলাইন পত্রিকাতেও সম্ভবতঃ প্রকাশিত হয়। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উদার, জনপ্রিয় একজন বিশ্বনেতা। তিনি যদি বিদেশী পতাকা উড্ডয়নের অনুমতি বা শিথিলতা করেও থাকেন তা তাঁর অত্যন্ত জনবান্ধব মহানুভবতা। তাই বলে স্বাধীন দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রীয় শিষ্ঠাচার বহির্ভূত কোন আচরণ করে বা আমাদের দেশের জাতীয় পতাকার অবমাননা হয় এমন কোন আচরণের মাধ্যমে সমর্থকের দোহাই দিয়ে ঘরে ঘরে দীর্ঘদিনের জন্য পতাকা তুলে রাখা আদৌ উচিত নয় ।
এবার আসি ফেসবুকের পাতায়। মেসি, নেইমার, রোনাল্ডোরা জানেই না হয়তোবা বাংলাদেশে তাদের সমর্থক কিছু উন্মাদ তাদের দরদে ভাই ভাইকে রক্তাক্ত করে ফেলছে। কেউবা কাউকে রিকশাওয়ালা, কাউকে বা ভিখারীর পোশাক পরিয়ে ডামি বানিয়ে নোংরা সব পোস্ট দিচ্ছে। খেলা নিয়ে মজা করা, সেটা এতো নিকৃষ্ট আর নোংরা ভাবে? খেলা চলছে রাশিয়ার মাটিতে, ভিনদেশী  পতাকা  উড়ছে বাংলাদেশে। খেলা  রাশিয়ার মাটিতে, রক্ত ঝরছে বাংলার মাটিতে। খেলা রাশিয়ার মাটিতে ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব বিনষ্ট হচ্ছে বাংলার মাটিতে। খেলা রাশিয়ার মাটিতে হুঙ্কার, দাম্ভিকতা, সামর্থতার বিলাপ বাংলার মাটিতে। আরে বাবা মেসি, নেইমার রোনাল্ডোরা তোদের প্রতিবেশির চেয়েও আপন হলে, মামা-চাচা, ভাগ্নে-বন্ধুরা বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার আয়োজক হলে চলে যাও না রাশিয়ায়। এটা নিয়ে  বাহাদুরী বড়াইয়ের কী আছে?   খুলনার এড. বাচ্চু ভাইয়ের একটা গল্প মনে পড়ে গেল।  ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ চলছে। তো তেরখাদা বাজারে এক কাঁচা কলার ব্যাপারী কাঁচা কলার দাম হালি ৫ পয়সা হতে ১০ পয়সা করে চাওয়া শুরু করল। যাই হোক, তাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হলো কেন ৫ পয়সার কাঁচা কলার দাম ১০ পয়সা দিতে হবে? তখন চাটুকার ব্যাপারী উত্তর দিলো.. ‘শুনিছি যে পাক-ভারত যুদ্ধ বাধিছে, তাই জিনিস পত্রের দাম বাড়তি পারে, তাই কলার দামও বাড়ায়ে দিলাম।’  বিশ্বকাপ ফুটবল জোয়ার অনেকটা এমনই যে যুদ্ধ পাক-ভারত সীমান্তে আর কলার দাম বাড়ছে তেরখাদা বাজারে। খেলা রাশিয়াতে আর বাস্তভিটা বিক্রি করে ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ জার্মানীর পতাকা তৈরি করেছে বাংলার খেটে খাওয়া অশিক্ষিত দিন মজুর? খেলা রাশিয়াতে কিশোরের কচি হাতের চামড়া কেটে লেখা হচ্ছে ব্রাজিলের নাম বাংলাদেশে?  এমন খেলা প্রীতি কী অসুস্থ মানষিকতার পরিচয় বহন করে না?  মাতলামীর একটা সীমা থাকা দরকার। এমন  অসুস্থ খেলা প্রীতি, ভিনদেশী পতাকা প্রীতি বাংলার সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না। আসুন আমরা খেলার  মাঝে প্রকৃত বিনোদন খুঁজি, দম্ভ অহমিকা, কুৎসা, সমালোচনা আর বিকৃত মানষিকতার পরিচয় নয়, একটা স্বাধীন দেশের একজন সুখী মানুষের আচরণ করতে শিখি।
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ


বঙ্গবন্ধুই আমার প্রেরণা 

বঙ্গবন্ধুই আমার প্রেরণা 

১৫ অগাস্ট, ২০১৮ ০০:৫০






সমাজ ও গ্রন্থাগার

সমাজ ও গ্রন্থাগার

০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ০০:০০


জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ

জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ

১০ জানুয়ারী, ২০১৮ ০০:২৩

এই ছবিটি যেন ‘বিরল’ হয়ে না থাকে

এই ছবিটি যেন ‘বিরল’ হয়ে না থাকে

২১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ব্রেকিং নিউজ











শারদীয় দুর্গোৎসবের  আজ মহানবমী

শারদীয় দুর্গোৎসবের  আজ মহানবমী

১৮ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:৪৯