খুলনা | মঙ্গলবার | ২২ জানুয়ারী ২০১৯ | ৯ মাঘ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

কোরবানীর প্রয়োজনীয় মাসয়ালা

মাওলানা মোঃ রায়হানুর রহমান | প্রকাশিত ০১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:৩৩:০০

সাধারণতঃ জিলহজ্ব মাসের দশ তারিখে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কোন গৃহপালিত হালাল পশু জবাই করাকে কুরবানী বলা হয়। প্রায় সকল নবী-রাসূলের শরিয়তেই কুরবানীর প্রচলন ছিল। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আর প্রত্যেক উম্মতের জন্যই আমি কুরবানী বিধিবদ্ধ করেছিলাম যেন তারা চতুস্পদ জন্তুসমূহের মধ্যে আল্লাহ পাক তাদের যা দান করেছেন তাতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে। (সূরা হাজ্ব ঃ ৩৪)। আবু হুরায়রা (রাঃ)  সূত্রে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তির কুরবানী করার সামর্থ আছে অথচ সে কুরবানী করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে। (ইবনে মাজাহ্ ঃ ৩১২৩)। নিচে কুরবানীর প্রয়োজনীয় মাসয়ালা-মাসায়েল বর্ণনা করা হলো :
১) যার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব : প্রত্যেক আযাদ, মুসলিম, মুক্বীম ও বিত্তশালী (সাহিবে নিসাব-সাড়ে সাত তোলা বা ৮৫ গ্রাম স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য কিংবা সমপরিমাণ সম্পদের মালিক হলে তাকে সাহিবে নিসাব বলা হয়) লোকদের উপর নিজ ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানী দেয়া ওয়াজিব। (হেদায়া ৪/১৩৯ পৃষ্ঠা)। কোন মহিলা সাহিবে নিসাব হলে তার উপরও কুরবানী দেয়া ওয়াজিব। (হেদায়া ৪/১৪১, ১৪৩ পৃষ্ঠা এবং দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম ঃ ২৬২ পৃষ্ঠা)। আহনাফ ইবনে সুলায়িম (রাঃ) সূত্রে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, হে লোকসকল! নিশ্চয়ই প্রত্যেক গৃহবাসীর উপর প্রত্যেক বছর কুরবানী করা ওয়াজিব। (আবু দাউদ ঃ ২৭৮৮)
২) কুরবানীর পশুর বয়স : জাবির (রাঃ) সুত্রে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, লা- তায্ বাহূ ইল্লা মুসিন্নাহ্ অর্থাৎ তোমরা উপযুক্ত বয়সের পশু ব্যতীত কুরবানী কর না। (সহিহ মুসলিম ঃ ৪৯২২, আবু দাউদ ঃ ২৭৯৭, নাসাঈ ঃ ৪৩৯০)। আর উপযুক্ত বয়স হচ্ছে, কুরবানীর জন্য উট পাঁচ বছর, গরু-মহিষ দু’বছর এবং ছাগল-ভেড়া ও দুম্বা কমúক্ষে এক বছর বয়সের হতে হবে। অবশ্য ছয় মাসের ভেড়া যদি এক বছরের ভেড়ার ন্যায় মোটা তাজা হয় তবে তা দ্বারা কুরবানী দেয়া বৈধ হবে। (সূত্র: মিশকাত, আরবি : ১২৭ পৃষ্ঠা, ৯নং টিকা )।
৩) কুরবানীর শরিকদার : কুরবানীর শরিক হওয়ার ক্ষেত্রে উট, গরু কিংবা মহিষ হলে একটিতে সাতজন পর্যন্ত শরিক হতে পারবে। জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ্ (রাঃ)  বলেন, আমরা হুদায়বিয়ার বছরে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সাথে একটি গরুতে সাতজন এবং একটি উটে সাতজন এভাবে কুরবানী দিয়েছি। (সহিহ মুসলিম ঃ ৩০৫৫, তিরমিযি ঃ ৯০৪, আবু দাউদ ঃ ২৮০৯) । আর ছাগল-ভেড়া ও দুম্বা একাকী কুরবানী দিতে হবে। উল্লেখ্য, কুরবানীর পশু কেনার আগেই শরিকদার ঠিক করে নেয়া উচিত, পরে অন্যকে শামীল করা মাকরূহ হবে। (হেদায়া ৪/১৪৩ পৃষ্ঠা)।
৪) যে সকল পশু কুরবানী করা উচিত নয় : অন্ধ, কানা, লেংড়া ও ক্ষীণকায় পশু অথবা কান ও লেজের এক-তৃতীয়াংশের বেশি কাটা কিংবা শিং মূল থেকে ভেঙ্গে গেছে এমন পশু দ্বারা কুরবানী করা মাকরূহ্। (হেদায়া ৪/১৪৬-১৪৭ পৃষ্ঠা )।  বারাআ ইবনে আযেব (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) চার ধরনের পশু কুরবানীর পশু থেকে পৃথক করে রাখতে বলেছেন। খোঁড়া জন্তু-যার খোঁড়ামী স্পষ্ট, অন্ধ পশু যার অন্ধত্ব স্পষ্ট, রোগা যার রোগ স্পষ্ট, ক্ষীণকায়/দুর্বল-যার হাড়ে মজ্জা নেই। (তিরমিযি ঃ ১৪৯৭, আবু দাউদ ঃ ২৮০৩, ইবনে মাজাহ্ ঃ ৩১৪৪, মিশকাত ঃ ১৪৬৫)। আলী (রাঃ)  বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাদেরকে শিং ভাঙ্গা ও কান কাটা জন্তু দ্বারা কুরবানী করতে নিষেধ করেছেন। (তিরমিযি ঃ ১৫০৬, ইবনে মাজাহ্, মিশকাত ঃ ১৪৬৪)।
৫) কেনার পর কুরবানীর পশু ত্রুটিযুুক্ত হলে কিংবা হারিয়ে গেলে করণীয় : কুরবানীর পশু কেনার পর যদি ত্রুটিযুক্ত হয়ে যায়, তাহলে সম্ভব হলে অন্য একটি পশু কুরবানী করবে। অন্যথায় সেটিই কুরবানী করবে। আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, একবার আমরা কুরবানীর উদ্দেশ্যে একটি মেষ খরিদ করলাম। অতঃপর নেকড়ে বাঘ তার নিতম্ব অথবা কান কেটে নিয়ে গেল । আমরা নাবী (সাঃ) কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে, তিনি আমাদেরকে সেটাই কুরবানী করার নির্দেশ প্রদান করেন। (ইবনে মাযাহ্ ঃ ৩১৪৬)। আর কুরবানীর পশু কেনার পর যদি হারিয়ে যায় এবং অন্য একটি পশু ক্রয় করা হয়, তবে কুরবানীর আগে হারানো পশুটি পাওয়া গেলে ধনী ব্যক্তি যে কোন একটি কুরবানী করবে। আর গরীব লোক উভয়টি কুরবানী করবে। (হেদায়া ৪/১৫০ পৃষ্ঠা, বেহেশতি জেওর, ২/৫৬ পৃষ্ঠা)।
৬) কুরবানীর দিনসমূহ : জিলহজ্ব মাসের দশ, এগার এবং বার এই তিনদিন পর্যন্ত কুরবানী করা বৈধ। তবে প্রথম দিন উত্তম। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘ওয়া কুল্লু আইয়ামিত তাশরীকি যাব্হুন’ অর্থাৎ আর প্রত্যেক তাকবীরে তাশরিকের দিনই কুরবানীর দিন। (আহ্মাদ, সূত্র ঃ হেদায়া ৪/১৪৫ পৃষ্ঠা)। নাফে (রঃ) সূত্রে। ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, কুরবানী ঈদুল আযহার পর আরো দুইদিন। (মুয়াত্তা ইমাম মালেক, মিশকাত ঃ ১৪৭৩ )
৭) কুরবানীর পশুর চামড়ার বিধান : কুরবানীর পশুর চামড়া নিজের গৃহস্থালীর কাজে লাগানো যাবে, তবে বিক্রি করলে তার মূল্য গরীব লোকদের সাদকা করে দিতে হবে। আর কুরবানীর পশুর গোশত দ্বারা কসাইয়ের পারিশ্রমিক দেওয়া যাবে না। আলী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে তার কুরবানীর উটগুলোর কাছে দাঁড়াতে নির্দেশ দিলেন। আর এগুলোর গোশত, চামড়া ও বস্ত্র/ঝাড়ল্ ইত্যাদি সাদকা করে দিতে বললেন এবং তা থেকে কসাইয়ের মজুরি দিতে নিষেধ করলেন। তিনি বললেন, আমাদের নিজেদের পক্ষ থেকে তার মজুরি পরিশোধ করে দেব। (সহিহ মুসলিম ঃ ৩০৫০, ইবনে মাজাহ্ ঃ ৩১৫৭)।
৮) কুরবানীর গোশতের বিধান : কুরবানীর পশুর গোশত তিনভাগ করা উত্তম। একভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনের জন্য, আরেক ভাগ গরীব মিসকিনদের দান করা উত্তম। (হেদায়া ৪/১৫২ পৃষ্ঠা)। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, ‘ফা কুলূ মিন্হা ওয়া আতয়ি’মুল ক্বা-নিআ’ ওয়াল মু’তার’ অর্থাৎ তোমরা তা থেকে নিজেরা খাও এবং অভাবী ও ক্ষুধার্ত লোকদেরকে খাওয়াও। (সূরা হাজ্ব ঃ ৩৬)। সালমা ইবনে আকওয়া (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রথমদিকে কুরবানীর গোশত তিনদিনের বেশি ঘরে রাখতে নিষেধ করেছিলেন । পরের বছর লোকজন এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস  করলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন : ‘কুলূ ওয়া আত্ য়িমূ ওয়া আদ্দাখিরূ অর্থাৎ তোমরা খাও, অন্যকে খাওয়াও এবং কিছু জমা করে রাখ ।  (সহিহ বুখারি ঃ ৫৩৫৪, সহিহ মুসলিম ঃ ৪৯৪৭) ।
৯) মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী করার বিধান : যদি মৃত ব্যক্তি ওসিয়ত না করে থাকে, তবে সেটি নফল কুরবানী হিসেবে গণ্য হবে। কুরবানীর স্বাভাবিক গোশতের মতো তা নিজেরাও খেতে পারবে এবং আত্মীয়-স্বজনকেও দিতে পারবে। আর যদি মৃত ব্যক্তি অসীয়ত করে গিয়ে থাকে তবে এর গোশত কুরবানীদাতা (নিজেরা) খেতে পারবে না। গরীব মিসকীনদের মাঝে সাদকা করে দিতে হবে। (মুসনাদে আহমাদ : ৮৪৫, রাদ্দুল মুহতার ৬/৩২৬, বেহেশতী জেওর, ২/৫৯ পৃষ্ঠা)।
১০) যে ব্যক্তি কুরবানী করতে অপারগ তার করণীয় : কোন ব্যক্তি যদি সামর্থ থাকা সত্বেও কুরবানী করতে না পারে (যেমন, কেউ চেষ্টা করে যদি উক্ত তিনদিনের মধ্যে পশু সংগ্রহ করতে না পারে) তবে তার জন্য একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বার সমপরিমাণ মূল্য সাদকা করে দেয়া উচিত। (বেহেশতী জেওর, ২/৫৪ পৃষ্ঠা)। আর যার কুরবানী করার সামর্থ নাই বা যার উপর কুরবানী ওয়াজিব হয়নি সে তার মাথার চুল, নখ ও গোঁফ ইত্যাদি কেটে ফেলবে। আব্দুল্লাহ্ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ) সুত্রে। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কাছে কুরবানী করতে অক্ষমতার কথা বলল। তিনি (সাঃ) লোকটিকে বললেন : তুমি তোমার মাথার চুল, নখ ও গোঁফ কেটে ফেল এবং নাভীর নীচের লোম পরিস্কার কর। এটাই আল্লাহর কাছে তোমার কুরবানী। (আবু দাউদ ঃ ২৭৮৯, নাসাঈ ঃ ৪৩৭৭)।
আসুন আমরা যথানিয়মে কুরবানী করি, আল্লাহর প্রিয়পাত্র হই। আমিন ।

লেখক :  ধর্মীয় শিক্ষক।


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ



১৯৭১ সালের এক ভয়াল রাত

১৯৭১ সালের এক ভয়াল রাত

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:১০

বাংলাদেশ

বাংলাদেশ

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:১০



এক বীরের বুকভরা বেদনা

এক বীরের বুকভরা বেদনা

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:১০

খুলনা বিজয়ের রথে

খুলনা বিজয়ের রথে

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:১০

গুরুদাসী : এক বীরাঙ্গণা নারী

গুরুদাসী : এক বীরাঙ্গণা নারী

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:১০

শপথ

শপথ

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:১০

এইতো মোদের স্বাধীনতা

এইতো মোদের স্বাধীনতা

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:১০

অভূতপূর্ব ইতিহাস

অভূতপূর্ব ইতিহাস

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:১০


ব্রেকিং নিউজ