খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০ | ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

দেশীয় জলসীমায় ভারতীয় জেলেদের অবাধ বিচরন

বিপর্যয়ের মুখে দুবলার শুঁটকি পল্লী

মাহমুদ হাসান, মোংলা | প্রকাশিত ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ০০:০০:০০

বিপর্যয়ের মুখে দুবলার শুঁটকি পল্লী

ভারতীয় জেলেরা বাংলাদেশের জলসীমায় অবৈধভাবে প্রবেশ করে অত্যাধুনিক ট্রলিং জাহাজ নিয়ে অবাধে মাছ শিকারের ফলে দেশিয় জেলেরা মাছ পাচ্ছেনা। ফলে, দুবলা জেলেপল্লী টহল ফাঁড়ির আওতাধীন শুঁটকি উৎপাদনকারী পাঁচটি চরে দেখা দিয়েছে ব্যাপক শুটকি সংকট। তাছাড়া, এবছর মৌসুমের শুরুতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্রচন্ড শীতের কারণে আশানুরুপ মাছ ধরা পড়েনী। যে কারনে লাখ লাখ টাকা লোকসানে পড়ে হতাশায় ধুকছেন ব্যবসায়ীরা। বঙ্গোপসাগরের তীরে গড়ে ওঠা পুর্ব সুন্দরবনের ঐতিহ্যবাহী দুবলা শুঁটকিপল্লীতে একারনে এবার প্রাণচাঞ্চল্য তেমন নেই। 
দুবলা মৎস্যপল্লীতে থাকা বনবিভাগ ও বহদ্দারদের (মহাজন) সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবছর সরকার এ শুঁটকিপল্লী থেকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে থাকে বন বিভাগ। এটিই সুন্দরবনের সর্বোচ্চ রাজস্ব আয়ের উৎস্য। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অংশে মাছের আধিক্য ভারতের অংশের চেয়ে বেশি থাকায় ভারতীয় জেলেরা অবৈধভাবে প্রবেশ করে ট্রলিং জাহাজ দিয়ে সমস্ত মাছ ছেঁকে (ছোট-বড় সকল মাছ) ধরে নিয়ে যাওয়ায় দেশীয় জেলেরা মাছ পাচ্ছে না। তাছাড়া, মৌসুমের শুরুতে কয়েক দফা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বৃষ্টি আর প্রচন্ড শীতে শুঁটকিপল্লী মাছশূণ্য হয়ে পড়েছে। খালি পড়ে রয়েছে মাছ শুকানোর কাজে ব্যবহৃত মাচান ও বাঁশের আলনাগুলো। 
দুবলা ফিশারম্যান গ্র“পের সভাপতি কামাল উদ্দিন আহমেদ জানান, প্রায় ৫০ বছর ধরে তিনি দুবলার চরে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তার দেখামতে এবছরই শুঁটকি খাতে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় ঘটেছে। তিনি জানান, গত ডিসেম্বর মাসে ৩-৪ দফা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে প্রায় ৮/১০ কোটি টাকার মাছ পঁচে গেছে। তাছাড়া, বাংলাদেশের জলসীমায় ভারতীয় জেলেরা অত্যাধুনিক ট্রলিং জাহাজ নিয়ে মাছ ধরার কারনে তাদের জেলেরা জাল ফেলতে পারছেনা, যদিও জাল ফেলে তাতে আশানুরুপ মাছ পাচ্ছে না। মাঝেরকিল্লার আজগর বহদ্দার জানান, এ বছর আসা করে ছিলাম পুর্বের বছরের তুলনায় সাগরে মাছ বেশী পাওয়া যাবে। গত বছরগুলোর লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারবে তারা। কিন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়াও ভারতীয় জেলেদের আনাগোনার ও অবাদ বিচারনের কারনে বঙ্গোপসাগরে মাছ মিলছেনা। 
মাঝেরকিল্লা শুঁটকিপল্লীর মোকছেদ আলী বহদ্দার, শাহবুদ্দিন বহদ্দার, শুকুমার বহদ্দার ও আলোরকোল শুঁটকিপল্লীর চিত্তরঞ্জন বিশ্বাসসহ অনেকেই অভিযোগ করে বলেন, ভারতীয় জেলেরা অবৈধভাবে বাংলাদেশের সীমানায় ঢুকে মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ আমাদের ব্যবসায়ীরা শুঁটকি মৌসুমে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ভারতীয় জেলেদের বাংলাদেশের জলসীমায় অবৈধ প্রবেশ বন্ধ করতে না পারলে অদুর ভভিষ্যতে শুঁটকি ব্যবসা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তারা অক্ষেপ করে বলেন, ভারতীয় অত্যাধুনিক ট্রলিং জাহাজে অবাধে মাছ শিকারের ফলে এ বছর কোনো কোনো ব্যবসায়ী ৫ লাখ টাকা থেকে ৩০লাখ টাকা পর্যন্ত লোকসানে রয়েছেন। মৌসুমের বাকি আছে আর মাত্র এই দুই (ফেব্র“য়ারি ও মার্চ) মাস। এ দুই মাসে এ লোকসান কোনোভাবেই পুরণ করা সম্ভব হবে না। তাই ঐতিহ্যবাহী এ শুঁটকিপল্লী ও রাজস্ব আয়ের এ বিশেষ উৎস্যটি টিকিয়ে রাখার জন্য ভারতীয় জেলেদের বাংলাদেশের জলসীমায় অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে সরকারকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহনের দাবি জানিয়েছেন তারা। দুবলা জেলেপল্লী টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ফরেষ্ট রেঞ্জার) অষিত কুমার বলেন, ভারতীয় জেলেদের দেশের সীমানায় এসে মাছ শিকার করার খবর পেয়েছি। তবে, লোকবল ও ভারী জলযান না থাকার জন্য দুর্গম সাগরে গিয়ে বনবিভাগের পক্ষে পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয়। 
পুর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোঃ বেলায়েত হোসেন জানান, গত বছর শুঁটকিপল্লী থেকে রাজস্ব আয় হয়েছিলো ২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। আর এ বছর আমাদের রাজস্বের টার্গেট ছিল ২কোটি ৮৫ লাখ, কিন্ত জেলেরা সাগরে মাছ না পাওয়ায় দুশ্চিন্তায় রয়েছে। তবে সামনের দুই মাস যদি জেলেরা সাগরে ঠিকভাবে মাছ ধরতে পারে, তাহলে তাদের লোকসান কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে, না হয় এ বছর রাজস্ব তিনের দুই অংশে নেমে আসার সম্ভাবনা।  
কোস্টগার্ড মোংলা পশ্চিম জোনের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন এম হাবিব উল আলম বলেন, দেশীয়সিমানায় আসা ভারতীয় জেলেসহ কয়েকটি ট্রলার আটক করা হয়েছে এবং ইতিমধ্যে কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে বেশ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া, বাংলাদেশ নৌ-বাহিনী ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা অভিযান অব্যাহত রেছেছে, যাতে বাংলাদেশের সিমানায় এসে মাছ ধরে নিতে না পারে সে জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। 
উল্লেখ্য, বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তি সুন্দরবনের দুবলা জেলেপল্লী টহল ফাঁড়ির অধীনে মেহেরআলীর চর, মাঝেরকিল্লা, আলোকোল, শ্যালার চর ও নারকেলবাড়িয়াসহ পাঁচটি চরে শুঁকটি উদৎপাদন করা হয়ে থাকে। প্রতিবছর অক্টোবর মাসের শেষের দিকে চট্টগ্রাম, সাতক্ষীরা, মোংলা, রামপাল ও শরণখোলার সহস্রাধিক শুঁটকি ব্যবসায়ী এসব চরে এসে শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের মাচান ও বাসা তৈরীর কাজ শুরু করেন। নভেম্বর মাস থেকেই শুরু হয় শুঁটকি আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ। চলে মার্চ মাস পর্যন্ত। প্রায় ৫০ বছরেরও অধিককাল ধরে দুবলার চরে শুঁটকি উৎপাদন হয়ে আসছে। সামুদ্রিক লইট্যা, ছুরি, রূপচাঁদা, পারসে, চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির শুঁটকি উৎপাদন হয় এসব চরে। বঙ্গোপসাগরের নোনা (লবন) পানির এ শুঁটকি সুস্বাদু এবং দেশে-বিদেশে এর ব্যাপক সুনাম ও চাহিদা রয়েছে। 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ












ক্রিকেটার মিরাজের বাসায় চুরি

ক্রিকেটার মিরাজের বাসায় চুরি

২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ০০:৪৬