খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০ | ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

অতিথি পাখি ও আমাদের পরিবেশ

গাজী মুজাহিদুল ইসলাম | প্রকাশিত ৩১ জানুয়ারী, ২০২০ ০০:০০:০০

শীতের শুরুতেই হিমালয়ের উত্তরে সুদূর সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া আর তিব্বতের হিমশীতল এলাকা থেকে দলে দলে পাখি আসা শুরু হয় বাংলাদেশে। তুলনামূলক উষ্ণ আবহাওয়ায় বেঁচে থাকা আর পরবর্তী প্রজন্মকে আলোর মুখ দেখাবার আকুতি নিয়ে ভবঘুরে পাখিরা পাড়ি দেয় নাতিশীতোষ্ণ মন্ডলে। পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ বাংলাদেশও ভবঘুরে পাখিদের এমনই একটি গন্তব্য। শীতের মৌসুমে প্রকৃতির অপরূপ অলঙ্কার হয়ে ওঠা এ অতিথি পাখির ঝাঁক বেঁধে উড়ে চলার দৃশ্য দেখে মনে হয় যেন জলরঙে আঁকা ছবি। প্রতি শীতে দূর-দূরান্ত থেকে শীতের পাখিরা আসে আমাদের দেশে। ভ্রমণপিপাসু মানুষ পাখি দেখতে ভিড় করে বিভিন্ন জলাশয়ে। পাখিদের কলকাকলি যেন প্রকৃতির শোভা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে। গাছের সবুজ, জলের নীল আর পাখিদের নানা রং মনে যে বর্ণিল আবেশ তৈরি করে তার রেশ রয়ে যায় অনেক দিন।
আবাসিক ও পরিযায়ী মিলে বাংলাদেশে পাখির সংখ্যা প্রায় ৬৫০ প্রজাতির। এর মধ্যে ৩৬০ প্রজাতি আবাসিক। বাকি ৩০০ প্রজাতি পরিযায়ী। সব পরিযায়ী শীতের সময় আসে না। ৩০০ প্রজাতির পাখির মধ্যে ২৯০টি প্রজাতি শীত মৌসুমে আসে ও ১০টি প্রজাতি থেকে যায়। বাংলাদেশের দক্ষিণা লের সুন্দরবন, উপকূলীয় বিভিন্ন জেলা আর চরগুলো অতিথি পাখির কোলাহলে মুখরিত থাকে পাঁচ থেকে ছয় মাস। আন্তর্জাাতিকভাবে জলচর পাখির জন্য স্বীকৃত ২৮টি জায়গা বাংলাদেশের সীমানায় রয়েছে। এগুলো হলো- বরিশাল বিভাগের চর বারি, চর বাঙ্গের, কালকিনির চর, চর শাহজালাল, টাগরার চর, ডবা চর, গাগোরিয়া চর, চর গাজীপুর, কালুপুর চর, চর মনপুরা, পাতার চর ও উড়ির চর। চট্টগগ্রাম বিভাগের চর বারী, বাটা চর, গাউসিয়ার চর, মৌলভীর চর, মুহুরী ড্যাম, ঢাল চর, নিঝুম দ্বীপ, পতেঙ্গা সৈকত, সোনাদিয়া ও মহেশখালী দ্বীপ। সিলেট বিভাগের আইলার বিল, ছাতিধরা বিল, হাইল হাওর বাইক্কা, হাকালুকি হাওর, পানা বিল, রোয়া বিল, শনির বিল ও টাংগুয়ার হাওর। শীত এলেই এসব জলাশয়সহ বিভিন্ন হাওর, বাঁওড়, বিল ও পুকুরের পাড়ে চোখে পড়ে নানান রং-বেরঙের নাম জানা/অজানা পাখির। এদের আমরা অতিখি পাখি বলে থাকি। আট থেকে নয় বছর আগেও বাংলাদেশে চার থেকে পাঁচ লক্ষ অতিথি পাখি আসতো। কিন্তু সেই সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। ২০১৬-১৭ সালের এক হিসেব অনুযায়ী, হাওর সহ বিভিন্ন উপকূলীয় জলাশয় এলাকায় সেই সংখ্যা মাত্র ১ লাখে নেমে এসেছে। তবে বাংলাদেশে অতিথি হয়ে আসা ৩০০ প্রজাতির মধ্যে মাত্র ৮০ প্রজাতি জলাভূমি দাপিয়ে বেড়ায়। বাকি ২২০ প্রজাতির বিচরণ বনাঞ্চলে। তাই অতিথি পাখি মাত্রই হাওর কিংবা জলাশয়ে থাকবে এমন ধারণাটিও সঠিক নয়।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই মূলত পাখি পরিযানের জন্যে একটি উল্লেখযোগ্য স্থান। তবে বিশ্বজুড়ে উষ্ণায়নের ফলে অতিথি পাখির সংখ্যা কমছে। তাপমাত্রার দ্রুত পরিবর্তনের ফলে কানাডা, সাইবেরিয়া সহ বিভিন্ন অঞ্চলে নিজ দেশেই পরবাসী হয়ে যাচ্ছে পাখিরা। আর অতিথি পাখিদের দুরবস্থার তো আর সীমা নেই, পথে পথে লম্বা সব মোবাইল আর ইলেকট্রিক টাওয়ার, পাখিদের পরিযানের চিহ্নগুলো ধ্বংস হয়ে যাবার ফলে পাখিদের পরিযানে সৃষ্টি হচ্ছে বাধা। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জলাশয়গুলো ভরাট হচ্ছে, গড়ে উঠছে মানুষের বাসস্থান আর কৃষিজমি।
আইনের তোয়াক্কা না করেই অনেকেই অতিথি পাখি শিকার করে চলেছে। সংরক্ষিত এলাকাগুলোতে পুলিশের নজরদারি থাকলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে আসা অতিথি পাখিদের পড়তে হয় শিকারীদের কবলে। বিশেষ করে ভোলা সহ মাঝির চর, নেয়ামতপুর চর, চর ফ্যাশন, চর কুকড়ি-মুকড়ির মতো অর্ধশতাধিক চরে দেখা যেত বালি হাঁস, লেঞ্চা বালি হাঁস, রাঙা ময়ুরি, পান্তামুখী, খঞ্জনার মতো পরিযায়ীদের। আইন অনুযায়ী অতিথি পাখি ধরা আর শিকার নিষিদ্ধ হলেও ভোলার বিভিন্ন এলাকায় শিকার করা হচ্ছে পাখি। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, শিকারীরা ধান ক্ষেতগুলোতে নানা ধরনের রাসায়নিক বিষ প্রয়োগ করেই পাখিদের কাবু করে। পাশাপাশি আছে জালের মাধ্যমে পাতা ফাঁদ, যেগুলোতে খুব সহজেই পাখি ধরা পড়ে। শিকারকৃত পাখির একটি বড় অংশ বিক্রি হচ্ছে বাজারে। পাখিটিকে বিষ দিয়ে মারা হয়েছে কিনা এ কথা চিন্তা না করেই ২০০-৩০০ টাকায় আবার কোন কোন জায়গায় ৫০০-৬০০ টাকা দরে বিভিন্ন বাজারে থেকে  এ সব অতিথি পাখি কিনে নিচ্ছেন স্থানীয়রা। ডাক্তার আর বিষেশজ্ঞদের মতে, পাখি ধরার জন্যে যে বিষ ব্যবহৃত হচ্ছে তা মানবদেহেও বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে।
সারা বিশ্ব জুড়ে পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে পাখির সংখ্যা কমছে। অতিথি পাখির বাসস্থান, শিকার আর প্রজননের অনুকূল পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে। এক শ্রেণীর লোভী শিকারীর নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য দুর্লভ প্রজাতির অতিথি পাখি। জালের ফাঁদ পেতে, বিষটোপ এবং ছররা গুলি দিয়ে নির্বিচারে অতিথি পাখি শিকার চলছে প্রতিনিয়ত। কেউ শখের বশে আবার কেউ বাজারে বিক্রির জন্য অতিথি পাখিদের ধরে চলেছে। অতিথি পাখিদের বিচরণভূমি ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। বন-জঙ্গল কেটে উজাড় করে ফেলায় পাখিরা হারাচ্ছে তাদের নিরাপদ আশ্রয়। আবার ফসলি জমিতে কৃত্রিম সার এবং মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে বিষে আক্রান্ত কীটপতঙ্গ খেয়ে তারা মারা যাচ্ছে। এর মধ্যে আইনের ফোঁকর দিয়ে কিংবা প্রশাসনের চোখে ধুলো দিয়ে যারা অতিথি পাখি শিকার করছে, তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। 
বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী পরিযায়ী (অতিথি পাখি) পাখি হত্যার দায়ে একজন অপরাধীকে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। একইভাবে কোনো ব্যক্তি যদি পরিযায়ী পাখির মাংস, দেহের অংশ সংগ্রহ করেন, দখলে রাখেন কিংবা ক্রয়-বিক্রয় করেন বা পরিবহন করেন, সে ক্ষেত্রে তার সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার আইন প্রচলিত রয়েছে। অতিথি পাখি নিধন এবং বাজারে বিক্রি নিষিদ্ধ জেনেও আইনের ফাঁক গলে এক শ্রেণীর পেশাদার এবং শৌখিন শিকারি কাজগুলো করে চলেছে।
আমরা পাখির উড়াউড়ি উপভোগ করব তবে সীমার মধ্যে, সতর্ক থেকে। আইন প্রয়োগে কঠোর হতে হবে। আমরা সচেতন না হলে আইন প্রয়োগে খুব একটা সফলতা পাওয়া যাবে না। প্রশাসনের সঙ্গে আমাদেরও সহযোগিতা করতে হবে। পাশাপাশি আমাদের দেশে প্রতি বছর ঠিক কী সংখ্যক পাখি আসছে, তাদের কেউ কি বার্ড ফ্লু কিংবা অন্যান্য রোগের জীবাণু বহন করছে কিনা এই বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা আর রেকর্ড থাকাও জরুরি।
লেখক : শিক্ষক ও সংবাদদাতা মাসিক অগ্রদূত (বাংলাদেশ স্কাউটস্ থেকে প্রকাশিত)।


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ









প্রখ্যাত সুফিসাধক খানজাহান (রহঃ)

প্রখ্যাত সুফিসাধক খানজাহান (রহঃ)

২৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:৪১


এখন বর্ষাকাল : আরও গাছ লাগান

এখন বর্ষাকাল : আরও গাছ লাগান

০৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০

ঘর হোক নারীর নিরাপদ স্থান

ঘর হোক নারীর নিরাপদ স্থান

০৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০


ব্রেকিং নিউজ












ক্রিকেটার মিরাজের বাসায় চুরি

ক্রিকেটার মিরাজের বাসায় চুরি

২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ০০:৪৬