খুলনা | শুক্রবার | ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২০ | ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছ : বাড়ছে হাইব্রিড ও নোনা পানির মাছের উপর নির্ভরতা

আশরাফুল ইসলাম নূর | প্রকাশিত ২৮ জানুয়ারী, ২০২০ ০১:০০:০০


‘মাছে-ভাতে বাঙালী’-ঐতিহ্যের এ প্রবাদ বাক্যটিতে রীতি মতো ভাঙন ধরেছে। শীত মৌসুমে নানা প্রজাতির দেশীয় মাছের সমাহার এখন কল্পনাতীত। খুলনার হাট-বাজার এখন হাইব্রিড মাছের দখলে। তবে উপকূলীয় এ এলাকায় উচ্চমূল্যে নোনা পানির ও সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যায়। ফলে আমিষের যোগান মেটাতে হাইব্রিড ও নোনা পানির মাছের উপরে নির্ভরশীলতা বাড়ছে। হারিয়ে যাচ্ছে স্বাদুপানির দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ। মৎস্য বিচরণস্থল ভরাট করে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণসহ দেশী মাছ বিলুপ্তির বেশকিছু কারণ চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এক সময় গ্রাম বাংলায় পৌষ-মাঘ মাসে পুকুর, খাল, ডোবা, ঘেরের পানি কমতে থাকলে দেশী মাছ ধরার ধুম পড়ে যেত। তবে এখন সেসবের দেখা মেলে না। নিকট অতীতেও দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছে গ্রাম-গঞ্জের হাট-বাজারগুলো সয়লাব হয়ে যেতো। এখন আর সেসব মাছ দেখা যায় না। সরেজমিনে নগরীর ময়লাপোতা ও রূপসা সন্ধ্যা বাজারে গিয়ে দেখা মিলেছে, হাইব্রিড জাতের কৈ, মাগুর, শিং, পাবদা, পুুঁটি, মায়া, টেংরা, ফলি (ফলুই) মাছ। এসব মাছের দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে মাত্রাতিরিক্ত কৃত্রিম খাদ্য ও কীটনাশক প্রয়োগ করে থাকেন বলে স্বীকার করেছেন মৎস্য খামারিরা। আবার প্রাণীর বিষ্ঠা ও কেমিক্যালে প্রস্তুত কৃত্রিম খাদ্য এবং কীটনাশক প্রয়োগে উৎপাদিত মৎস্য মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর বলছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয় মাছ ক্রমশ হারিয়ে যাওয়ার জন্য মূলতঃ দায়ী জলবায়ুর প্রভাব, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, কারেন্ট (নেট) জালের অবৈধ ব্যবহার, ফসলি জমিতে অপরিকল্পিত কীটনাশক ব্যবহার, জলাশয় দূষণ, নদ-নদীর নব্যতা হ্রাস, উজানে বাঁধ নির্মাণ, নদী সম্পৃক্ত খাল-বিলের গভীরতা কমে যাওয়া, ডোবা ও জলাশয় ভরাট করা, মা মাছের আবাসস্থলের অভাব, ডিম ছাড়ার আগেই মা মাছ শিকার, ডোবা-নালা-পুকুর জলাশয় ছেঁকে মাছ ধরা, বিদেশী রাক্ষুসে মাছের চাষ ও মাছের প্রজননে ব্যাঘাত ঘটানো। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এইসব কারণেই দেশীয় প্রজাতির স্বাদু পানির মাছ হারিয়ে যেতে বসেছে।
রূপসা পাইকারী মৎস্য আড়তের ব্যবসায়ী মোঃ সাইমুন ইসলাম রাজ্জাক বলেন, আগে প্রচুর পরিমাণে দেশী মাছ কেনাবেচা হতো। এখন দেশী মাছ নেই বললেই চলে। বাজারে যা দেখা যায় তার ৯৫ শতাংশই হাইব্রিড, চাষের মাছ।
খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ খুলনার সাধারণ সম্পাদক কাজী জাবেদ খালিদ জয় বলেন, ‘দ্রুত শিল্পায়ন ও শহরায়নে শুধু মাছের আবাসস্থল কমছে না, মানুষের সামগ্রিক খাদ্য সংস্থানও কমে যাচ্ছে। মাছের পুকুর, খাল-বিল-জলাশয় ভরাট করে সবুজ শ্যামল কৃষি জমিতে শিল্প-কলকারখানার সাইনবোর্ড টানানো হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশী মাছ বিলুপ্ত হলে আমরা শুধু পুষ্টিহীনতায় ভুগবো না, ঐতিহ্যও হারিয়ে ফেলবো।’
খুলনা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন বলেন, যেকোন পুকুর, জলাশয়, খাল ভরাটের পূর্বে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট একাধিক দপ্তরের অনুমতি নিতে হবে। সর্বশেষ জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভাতেও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে নতুন করে কোন কৃষি জমিতে অবকাঠামো নির্মাণ বা আবাসন বাণিজ্য নয়। তিনি বলেন, মৎস্য বিচরণস্থল সংরক্ষণ করতে পারলেই কেবল প্রাকৃতিকভাবে এখনি দেশী প্রজাতির মাছ পাওয়া যেতে পারে।
মৎস্য অধিদফতরের সূত্র বলছে, হারিয়ে যাওয়া দেশি প্রজাতির মাছের সংখ্যা আড়াইশ’র বেশি। হাটবাজার, পুকুর, খাল, বিল কোথায়ও এখন আর মিঠাপানির সুস্বাদু সেসব মাছ মিলছে না। দেশি মাছের বদলে এখন বাজারে জায়গা দখল করে নিয়েছে চাষের পাঙ্গাস, তেলাপিয়া, ক্রস ও কার্প জাতীয় মাছ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন কারণেই দেশি প্রজাতির মাছ হারিয়ে গেছে এবং যাচ্ছে। এরমধ্যে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সাথে মানুষের সচেতনতার অভাবও রয়েছে। হারিয়ে যাওয়া দেশি মাছ রক্ষায় ব্যাপক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। এখন পাবদা, টেংরা, বোয়াল, আইড়, পাঙ্গাস, শিং, মাগুর, পুঁটি ও কৈ মাছের চাষ হচ্ছে। এসব মৎস্য খামারে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর মাছের খাদ্য ও কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। এখনি হয়তো এসব ক্ষতির প্রভাব আমরা বুঝতে পারছি না, তবে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হবে।’


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ






সবজি চাষে কৃষকের ভাগ্য বদল

সবজি চাষে কৃষকের ভাগ্য বদল

০৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ০১:১০








ব্রেকিং নিউজ



মেয়েদের গ্র“পের ফাইনালে উন্নীত খুলনা

মেয়েদের গ্র“পের ফাইনালে উন্নীত খুলনা

২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ০০:০৫