খুলনা | শনিবার | ১৮ জানুয়ারী ২০২০ | ৫ মাঘ ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

খুলনাসহ সারাদেশে কিছু পুলিশের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মাদক ও চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগ

সোহাগ দেওয়ান  | প্রকাশিত ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০১:১৫:০০

দেখতে দেখতে চলে যাচ্ছে আরও একটি বছর। শত সফলতার মাঝেও অনেক বিষয়ে কিছু ব্যর্থতাও থেকে যায়। আর এসকল ব্যর্থতা এবং অপ্রীতিকর ঘটনাকে শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করেই সুন্দর ও ভুলহীন করা সম্ভব আগামী দিনগুলোকে। রাজধানী ঢাকাসহ কেএমপি, জেলা ও জিআরপি, কারাগারসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শত সফলতার মাঝেও কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে দু’একটি ঘটনা খুলনাসহ সারাদেশে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। যা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ফলাও করে প্রকাশ করতেও দেখা গেছে। 
উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যেও কেউ কেউ এ বছর ব্যাপক আলোচনায় এসেছেন। এদের মধ্যে পুলিশের ডিআইজি মিজানুর রহমান, ডিআইজি প্রিজন পার্থ শংকর বণিক ও বজলুর রশীদ। এছাড়া খুলনায় সব থেকে আলোচনায় ছিলো গণধর্ষনে অভিযুক্ত জিআরপি থানার ওসি ওসমান গণি পাঠানসহ ৫ পুলিশ সদস্য। খুলনার বাহিরে রয়েছেন সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন, গোয়ালন্দ থানার ওসি সাইফুল ইসলাম, পুলিশ পরিদর্শক মাহমুদ সাইফুল করিম ও ওসি ওয়াজেদ আলী। এদের বিরুদ্ধে অপকর্মের গুরুতর অভিযোগের তদন্ত চলমান রয়েছে। সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন, গোয়ালন্দ থানার ওসি সাইফুল ইসলাম, পুলিশ পরিদর্শক মাহমুদ সাইফুল করিম বর্তমানে কারাগারে আটক রয়েছেন।  
চলতি বছরে খুলনায় পুলিশের অপরাধের মধ্যে সব থেকে আলোচিত খুলনা জিআরপি থানায় এক নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগটি। ওই ঘটনাটি পুলিশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন করেছে। দেশ বিদেশের সকল সংবাদ মাধ্যমে এ খবরটি গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ হয়েছে। এঘটনায় তৎকালীন জিআরপি থানার ওসি উছমান গনি পাঠানসহ ৫ পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা হয়। চলতি বছরের ২ আগস্ট যশোর থেকে ট্রেনে খুলনায় আসার পথে রেলস্টেশনে কর্তব্যরত জিআরপি পুলিশ সদস্যরা এক নারীকে আটক করে, পরে গভীর রাতে থানা হাজতে রেখে ওসি উছমান গনি পাঠানসহ ৫ পুলিশ সদস্য ধর্ষণ করে বলে আদালতে অভিযোগ করেন তিনি (নারী)। 
খুলনা সদর থানার সাবেক ওসি মোঃ হুমায়ুন কবির তুহিন (৪২)’র বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও পর্নগ্রাফি আইনে মামলা দায়ের হয় এ বছরই। যশোরের মণিরামপুর উপজেলার মোঃ আব্দুল সাত্তারের মেয়ে তাহেরা শবনম (২৫) মামলাটি দায়ের করেন। চলতি বছরের ৭ নভেম্বর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের হাজারীবাগ থানায় ২০০০সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধনী ২০০৩’র ৯(১), দণ্ডবিধির ৩১৩, ৫০৬ ও পর্নগ্রাফি আইনের ৮(১) ধারায় মামলাটি রেকর্ড করা হয়েছে (নং-১২)। 
আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জমিজমা সংক্রান্ত সালিশ করার অভিযোগে খুলনার বটিয়াঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল ইসলামসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে ক্লোজড করে গত ৮ ডিসেম্বর পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। ক্লোজড হওয়া অন্য দুজন হলেন এএসআই মিকাইল হোসেন ও কামরুল ইসলাম। 
গত ২৪মার্চ নগরীর খালিশপুর থানাধিন গোয়ালখালী এলাকা থেকে ইয়াবা ও গাঁজাসহ বঙ্কিম চক্রবর্তী (৩৭) নামের একজন পুলিশ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)’র সদস্যরা তাকে গ্রেফতার করেন। ৩০ পিস ইয়াবা ও ৫ গ্রাম গাঁজাসহ বঙ্কিম চক্রবর্তী (৩৭) নামের ওই পুলিশ কনস্টেবল গ্রেফতার হয়েছেন। তিনি খানাজাহান আলী থানাধীন পথের বাজার ক্যাম্পে কর্তব্যরত ছিলেন। এ ঘটনায় খালিশপুর থানায় তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের হয়েছে।  
গত ১ অক্টোবর ডুমুরিয়া থানা এলাকায় এক ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)’র ৭ জন সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এদের মধ্যে একজন এসআই, তিনজন এএসআই ও ৩ জন কনস্টেবল।  অভিযোগ পাওয়ায় জেলা পুলিশ সুপার এস এম শফিউল্লাহর নির্দেশে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা হলেন জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ডিবি’র এস আই লুৎফর রহমান, এএসআই কে  এম হাসানুজ্জামান, এএসআই শেখ সাইদুর রহমান, এএসআই গাজী সাজ্জাদুল ইসলাম, ৩ জন কনস্টেবল হলেন, মোঃ কামরুজ্জামান বিশ্বাস, জামিউল হাসান ইমন, মোঃ রুবেল। গত ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে বরখাস্ত আদেশ কার্যকর হয়েছে বলে জেলা পুলিশ সুপার দপ্তর সূত্রে জানা গেছে। 
গত ২৩ এপ্রিল নগরীতে চাঁদাবাজির মামলায় কেএমপি খুলনা থানার এএসআই সিপাতউল্লাহ (৩০) ও এএসআই মিরান উদ্দিন (৩২) কে গ্রেফতার করা হয়। নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার একটি বাড়িতে নারী দিয়ে ফাঁসিয়ে এক ব্যবসায়ীকে আটকে রেখে চাঁদাবাজির অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। এএসআই সিপাতল্লাহ খুলনার তেরখাদা থানার পশ্চিম কাটেংগা গ্রামের মোঃ গাউসুল আযমের ছেলে এবং এএসআই মিরান উদ্দিন বাগেরহাটের মোল্লাহাট থানার গাংনী গ্রামের মোঃ আব্দুর রকিব মোল্লার ছেলে। 
গত ৯ অক্টোবর সকাল ৬টার দিকে খুলনা রেল স্টেশন থেকে সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনে অভিযান চালিয়ে কেএমপির গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ১১০ বোতল ফেন্সিডিলসহ খুলনা জিআরপি এএসআই সেলিমকে গ্রেফতার করে। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করা হয়।  
নগরীর খালিশপুর থানাধীন মুজগুন্নী পার্কের সামনে থেকে এক গৃহবধূকে অপহরণের পর আবাসিক হোটেলের কক্ষে আটকে রাখার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় পুলিশ সদস্য মোঃ মিরাজ উদ্দিন (৩৩) কে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ দেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোঃ মহিদুজ্জামান। মিরাজ খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কনস্টেবল পদে চাকুরি করতেন। সে ঝিনাইদহের কালিগঞ্জ উপজেলার আড়পাড়ার আব্দুল জলিলের ছেলে। 
রাষ্ট্রের স্পর্শকাতর ও গোপনীয় তথ্য ভারতে পাচারের অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় বেনাপোল পোর্ট থানায় গ্রেফতার আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সদস্য দেবপ্রসাদ সাহার গ্রামের বাড়ি খুলনার তেরখাদা সদরের সাহাপাড়ায়। 
গত ১৬ এপ্রিল খুলনা জেলা কারাগারে দুদকের ঝটিকা অভিযানে অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ৩ জন কারারক্ষীকে প্রত্যাহার করা হয়। অভিযুক্ত কারারক্ষীরা হলেন, মোঃ শামীম হাসান, হুমায়ুন কবির ও মাহাবুবুর রহমান। দর্শনার্থীদের নিকট থেকে ১০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিশেষভাবে কয়েদীদের সাথে সাক্ষাতের অভিযোগ ছিলো তাদের বিরুদ্ধে।   
গত ১৮ জুন ডুমুরিয়া উপজেলার নির্বাচনের ডিউটিতে এসে দিঘলিয়া থানার এএসআই নাজমুল হকের পিস্তল ও ১২ রাউন্ড গুলি খোয়া যাওয়ার ঘটনায় তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। একদিন পরেই পার্শ্ববর্তী একটি ঘের থেকে ওই অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়। 
জোর করে এক নারীকে বিয়ে করে তা গোপন রাখতে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং এক সংবাদ পাঠিকাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়ার মতো ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচিত হন পুলিশের ডিআইজি মিজানুর রহমান। 
ডিআইজি প্রিজন পার্থ গোপাল বণিক সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে দায়িত্ব পালনের আগে ছিলেন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে। সেখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ২৮ জুলাই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। পরে ঘুষ ও দুর্নীতির কয়েক লাখ নগদ টাকা বাসায় রয়েছে, এমন তথ্যের ভিত্তিতে তাকে নিয়ে দুদকের একটি দল রাজধানীতে তার ধানমণ্ডির ভূতেরগলি বাসায় অভিযান চালায়। পার্থ গোপাল বণিকের ফ্ল্যাট থেকে ৮০ লাখ টাকা উদ্ধার করে দুদক। এর পরেই তাকে আটক করা হয়। 
কারা অধিদফতরের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজনস) বজলুর রশীদের বিরুদ্ধে অবৈধ উপায়ে উপার্জিত টাকা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে স্ত্রীকে পাঠানোর বিষয়ে অনুসন্ধানে নামে দুদক। এরই অংশ হিসেবে বজলুর রশীদ ও তার স্ত্রীকে গত ২০ অক্টোবর জিজ্ঞাসাবাদে ডাকে দুদক। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে গ্রেফতার করে দুদক টিম। গ্রেফতারের আগে তার বিরুদ্ধে দুদক কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ মামলা দায়ের করা হয়। পরে তাকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন।
মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন হয়রানির বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগ ওঠে ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে। এ অভিযোগে ১৬ জুন মোয়াজ্জেম হোসেনকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গত ২৮ নভেম্বর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৬ ধারায় ৫ বছর কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা এবং ২৯ ধারায় তিন বছর কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে।
অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের দুটি মামলায় রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলামকে গত ২১ আগস্ট ৭ বছর করে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। অবৈধ সম্পদ অর্জনে স্বামীকে সহায়তার অভিযোগে অন্য এক মামলায় সাইফুল ইসলামের সঙ্গে তার স্ত্রী জাকিয়া ইসলাম অনুকে দুই বছর কারাদণ্ডাদেশ দেয়া হয়। 
দুই মেয়ের পাসপোর্ট ভেরিফিকেশনের জন্য উচ্চ আদালতের এক বিচারপতির স্ত্রীর কাছে ২০১৬ সালের ৩০ আগস্ট ২ হাজার টাকা ঘুষ দাবির মামলায় পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) এএসআই সাদেকুল ইসলামকে দুই বছর কারাদণ্ড দেন আদালত। ২১ মার্চ এই রায় ঘোষণার পর সাদেকুলকে কারাগারে পাঠানো হয়।
ডিএমপির যাত্রাবাড়ী থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী মিয়াসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে অপহরণ ও গণধর্ষণের অভিযোগে গত ৪ এপ্রিল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন এক নারী। আসামিদের মধ্যে আরও রয়েছেন যাত্রাবাড়ী থানার এসআই আ স ম মাহমুদুল হাসান ও মোছাঃ লাইজু।
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ