খুলনা | শনিবার | ১৮ জানুয়ারী ২০২০ | ৫ মাঘ ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

আল-কুরআনে মৌমাছি ও মধু বিজ্ঞান 

মুহাম্মদ মাহফুজুর রহমান আশরাফী | প্রকাশিত ২০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:৩৯:০০

মহাগ্রন্থ আল-কুরআন মহান আল্লাহ্র বানী যা মানব জাতির কল্যাণের জন্য নযিল করা হয়েছে। পৃথিবীর সকল মাখলুকাত মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। অনুরুপ মহান আল্লাহ সবকিছু পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন।
আবার পানির রয়েছে অনেক প্রকার রাসায়নিক ধাতব পদার্থের সংমিশ্রণ। আর এরই মধ্যে রয়েছে মানুষের রোগ নিরাময়তা ও শরীর গঠন, ক্ষয় পূরণ ইত্যাদি ব্যবস্থা।
পানির দ্বারা মানুষ সৃষ্টি, গাছের সৃষ্টি, প্রতিটি গাছ হচ্ছে আল্লাহর তৈরী এক একটা কারখানা, এই গাছের রয়েছে বিভিন্ন প্রকার ঔষধ সেই ঔষধ গুলোই মৌমাছির দ্বারা আল্লাহ সংগ্রহ করান।
আর ঔষধ নামক ফুলের রসকে মৌমাছি নামক জীবের পেটে তৈরী আল্লাহর কারখানায় নিয়ে তাকে করা হয় সর্ব প্রকার রোগের ঔষধের উপযোগী করে, এর পর নাম দেয়া হয়েছে মধু বা সর্বরোগের ঔষধ। এই মধু ইউনানী, আয়ুবেধীয় এবং এলোপ্যাথী চিকিৎসার ক্ষেত্রে ও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। 
নিম্নে আল-কুরআনের আলোকে মৌমাছি ও মধু সম্পর্কে আলোচনা পেশ করা হলো :
মৌমাছি একটি উপকারী পতঙ্গ। পৃথিবীতে প্রায় ২০ হাজার প্রজাতির মৌমাছি আছে। বেশির ভাগ প্রজাতি মধু ও মোম উৎপাদনে অক্ষ্যম। আমাদের দেশে মধু উৎপাদনকারী তিনটি প্রজাতি রয়েছে। এরা ফুল থেকে মধু সংগ্রহের সময় ফুলের পরাগায়নেরও সাহায্য করে। 
মৌমাছির দৈহিক গঠন ঃ মৌমাছির দেহ মাথা বক্ষ ও উদরে বিভক্ত। এদের পা তিন জোড়া ও পাখা দু’জোড়া। লম্বায় ১.৩-১.৯ সেন্টিমিটার। মধু উৎপাদনকারী প্রজাতিগুলো সামাজিক। এরা মৌচাক তৈরী করে বাস করে। মৌচাকে একটি রাণী, ২০০ থেকে ৩০০ পুরুষ এবং ৫০ থেকে ৮০ হাজার পর্যন্ত কর্মী থাকতে পারে। কর্মীদের তুলনায় রাণী প্রায় ২.৫ লম্বা ও ২.৮ গুন ভারি। রাণী প্রতিদিন ১,০০০-৩৫০০ নিষিক্ত ও অনিযিক্ত ডিম পাড়ে। অনিষিক্ত ডিম থেকে পুরুষ এবং নিষিক্ত ডিম থেকে রাণী বা কর্মী মৌমাছি জন্মায়। পুরুষ গুলো আলসে প্রকৃতির, কর্মীরা চাকবানানো, মোম তৈরী, মধু সংগ্রহ, বাচ্ছা পালন ইত্যাদি কাজ করে। প্রাপ্ত বয়স্ক হলে রাণী মৌমাছি পুরুষের সঙ্গে বাইরে বেরোয়, উড়ন্ত অবস্থায় প্রজনন করে। এরপর পুরুষগুলো মারা যায়। রাণী ৫-৮ এবং কর্মীরা ১-৩ বছর জীবিত থাকে। মৌমাছির মুখে ফিট করে দিয়েছেন আল্লাহ ইনজেকশনের মতো সিরিঞ্জ যা ফুটিয়ে বের করে আনে ফুলের রস। 
মৌমাছির বৈশিষ্ট্য :  মৌমাছির জ্ঞান, তীক্ষ্ম বুদ্ধি ও সুকৌশলের দিক দিয়ে মৌমাছি সমস্ত জন্তুর মধ্যে বিশেষ শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আপনার রব মৌমাছিকে তার অন্তরে ইংগিত করেছেন যে, গৃহ নির্মাণ কর পাহাড়ে, বৃক্ষে ও মানুষ যে গৃহ নির্মাণ করে তাতে, (সূরা নাহল : ৬৮)”। 
নিচে এই মৌমাছির কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো :
(১) মৌমাছির মহান আল্লাহর নির্দেশ ক্রমে উচু জায়গায় মৌচাক তৈরী করে যেন মধুতে নিচের ধুলাবালি গিয়ে না পড়তে পারে। (২) মৌমাছি কখনো ধুলা ময়লা, ডাসবিন, পচা, আবর্জনার উপর বসেনা। সব সময় ফুলের উপর বসে। (৩) মৌমাছি ফুলের রস খেয়ে ফেলে, পরে তাদের পেটের মধ্যে রক্ষিত রাসায়নিক পদার্থের সংমিশ্রণে তা হয়ে পড়ে নির্ভেজাল মধু। (৪) মৌমাছি দুই মাইল দূর থেকেও যদি মধু সংগ্রহ করে আনে তবে ঠিক যে পথ দিয়ে উড়ে তা আঁকা বাঁকা পথে হলেও পুরনায় ঠিক সেই একই পথে নিজেদের চাকে ফিরে আসে। (৫) মৌমাছির সুন্দর কারুকার্য ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় জীবন যাপন করে। (৬) পবিত্র কুরআনুল কারীম ১৬তম সূরায় উল্লেখ করেছে “স্ত্রী মৌমাছিরা খাবার সংগ্রহের জন্য তার বাসা ত্যাগ করে (সূরা নাহল : ৬৮-৬৯)”।
মধুর রাসায়নিক উপাদান : আহরিত রসকে প্রতিপালকের নির্দেশে উদরে প্রবিষ্ট করে, ঐ রস তাঁর কুদরতে মধুতে পরিণত হয়। মধু বিষয়ক গবেষকদের মতে, মধুর ভিতর ১৮১ প্রকার রাসায়নিক পদার্থ আছে। ২০০ গ্রাম মধু থেকে ১.১৩ কেজি খাটি দুধ বা ৩৪০ গ্রাম পোস্ত অথবা ৮টি কমলালেবু অথবা ১০টি ডিমের সমান পুষ্টি মান পাওয়া যায়। মধু রক্তের হিমোগ্লোবিন তৈরীতে যাহায্য করে। 
খাঁটি মধু চিনবার পদ্ধতি গুলো নিম্নে :
(ক) এক ফোটা খাটি মধু পানির গ্লাসে দিলে দেখা যাবে মধু গ্লাসের নিচে জমে আছে, কিন্তু ভেজাল মধু পানির সাথে মিশে যাচ্ছে। কেননা পানির থেকে মধুর ঘনত্ব বেশী। (খ) ভেজাল মধু রুটির সঙ্গে মিশিয়ে কুকুরকে খেতে দিলে কুকুর তা খেয়ে ফেলবে। পক্ষান্তরে, খাটি মধু রুটির সঙ্গে মিশিয়ে দিলে কুকুর তা খাবে না। (গ) খাটি মধু ফ্রিজে বোতলের ভিতর রাখলে তা কখনো জমাট বাধবে না।
মধু রোগ নিরাময়ের ব্যবস্থাপত্র : মধু যেমন বল কারক খাদ্য এবং রসনার জন্যে আনন্দ ও তৃপ্তিদায়ক। তেমনি রোগ ব্যাধির জন্যে ও ফলদায়ক ব্যবস্থাপত্র। পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে- “এরপর প্রত্যেক ফল হতে কিছু কিছু আহার কর, আর তোমার রবের সহজ পথে অনুসরণ কর। তার উপর হতে নির্গত হয় বিভিন্ন বর্ণের পানীয়; যাতে মানুষের জন্য রয়েছে আরোগ্য। অবশ্যই এতে রয়েছে নিদর্শন চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য (নাহল : ৬৯)”।
নবী করিম (সাঃ) বলেন “তোমরা দু’টি উপশম গ্রহণ কর : একটি মধু অন্যটি আল-কুরআন। (মধু বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই রোগ মোচন করে)”
বুখারী ও মুসলিম শরীপে বর্ণিত হয়েছে যে, আবু সাইদ খুদরী (রাঃ) বলেন, “একদা জনৈক ব্যক্তি এসে বললো : হে আল্লাহর রাসূল! আমার ভাই উদরা ময়ে ভুগছে। তিনি বললেন : মধু খাইয়ে দাও। সে গিয়ে তাকে মধু খাওয়ালো। কিন্তু তার রোগ আরও বেড়ে গেল। এপর এসে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) কে একথা জানালো।” রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন, “আল্লাহ সত্য বলেছেন। কিন্তু তোমার ভাইয়ের পেট ভুল করছে। সে গিয়ে তাকে আবার মধু পান করালো। এবার আরোগ্য লাভ করলো”। 
মধুর অত্যাশ্চার্য ক্ষমতা ও গুনাগুন : মানুষের ভাবতেও কষ্টবোধ হবে যে, মধু এমন খাদ্য যা শীতাতাপ নিয়ন্ত্রণ। অতি শীতে খেলে দেহের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে, আবার অতি গরমে খেলে দেহের তাপ মাত্রা ঠান্ডা করে দেয়। খাবার পরিমান এক গ্লাস পানির সঙ্গে ৩০ গ্রাম মধু। মধু সেবনে মানুষ যে সমস্ত রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করে সেগুলো নিম্নে তুলে ধরা হলো ঃ 
(ক) মধু বিবেচক এবং পেট থেকে দূষিত পদার্থ অপসারক। হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তাঁর শরীরে ফোঁড়া বের হলেও তিনি তাতে মধুর প্রলেপ দিয়ে চিকিৎসা করতেন। এর কারণ জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেন, আল্লাহ-তাআলা কুরআনে কি মধু সম্পর্কে বলেন নিযে, “ফিহিশিফাউলিন নাসি” (কুরতুবী)
(খ) জিহ্বার আল সার, টাইফয়েড এবং আমাশয়ের জীবাণু ও মধুতে ধ্বংস করতে পারে। (গ) ডায়বেটিস রুগীও নিয়মিত অল্প অর্থাৎ আধা চামচ হতে এক চামচ মধু এক গ্রাম পানির সঙ্গে মিশিয়ে পান করতে পারে। মধুতে যদিও সুগার আছে তবে তাতে ডায়বেটিস রোগীর ক্ষতি করেনা যদি অল্প পরিমানে তা খায়। (ঘ) মধু সেবনের কারণে ফুসফুস ভাল থাকে। (ঙ) শ্লেশ্মা জাতীয় রোগ যেমন, অল্প ঠান্ডায় সর্দি-কাশি, তুলসি পাতার রসসহ মধু পান করলে এই রোগ ভাল হয়। (চ) নিয়মিত মধু পান করলে, হার্ট, লান্স, লিভার, মুদ্রাশয় ভাল থাকে। 
পরিশেষে বলতে চাই, একটি ছোট্ট বিষাক্ত প্রাণীটির পেট থেকে কেমন উপাদেয় ও সুস্বাদু পানীয় বের হয়। বিষের মধ্যে এই বিষ প্রতিষেধক বাস্তবিকই আল্লাহ তা’আলার শক্তির অভাবনীয় নিদর্শন। তাই মানুষের এই উপকারী পতঙ্গ মৌমাছিকে মারতে আল্লাহর রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) নিষেধ করেছেন। 
(লেখক : মুফাস্সিরে কোরআন ও প্রভাষক, মাতৃভাষা ডিগ্রী করেজ। শরণখোলা, বাগেরহাট)  মোবা : ০১৭১৮৯৩০০০৮


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

শরীয়ত ও প্রচলিত সামাজিক কুসংস্কার

শরীয়ত ও প্রচলিত সামাজিক কুসংস্কার

১৭ জানুয়ারী, ২০২০ ০০:৩০





ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম  ৯ ডিসেম্বর

ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম  ৯ ডিসেম্বর

২৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:১৫



বিশ্ব ইজতেমার তারিখ ঘোষণা

বিশ্ব ইজতেমার তারিখ ঘোষণা

২৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:২৮





ব্রেকিং নিউজ