
নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ:
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ভুলতা-গাউছিয়া এলাকা। গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কের ফুটপাত থেকে শুরু করে সড়কের বড় একটি অংশ এখন হকারদের দখলে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে বসছে নানা ধরনের দোকান। এতে একদিকে পথচারীরা ফুটপাত ব্যবহার করতে পারছেন না, অন্যদিকে মহাসড়কে সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নেতৃত্বে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও তা স্থায়ী কোনো সমাধান আনতে পারছে না। সকালে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলে বিকেল কিংবা রাতেই আবার আগের মতো দখল হয়ে যাচ্ছে সড়ক ও ফুটপাত। গত ১৭ বছরে ভুলতা-গাউছিয়া এলাকায় ১২৩ বার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও এখনো দখলমুক্ত হয়নি গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—এতবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার পরও যদি দখল ফিরে আসে, তাহলে এর পেছনে কারা রয়েছে?
ভুলতার তাঁতবাজার এলাকার ফুটপাতে প্রায় ১৫ বছর ধরে ব্যবসা করছেন হকার রমজান আলী। তার অভিযোগ, প্রতিদিন দোকান বসানোর জন্য তাকে ৩০০ টাকা করে দিতে হয়। এছাড়া দোকান বসানোর সময় এককালীন আরও ৭ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।
রমজান আলী বলেন, “এইডা তো বাজান, একটা নাটক। পুলিশে আগেই কইয়া দেয়—আমাগো দাবড়ানি দিবো। এইডা নাকি প্রতিদিনের রুটিন। উচ্ছেদ কইরা যাওয়ার পর আবার বইয়া পড়তে কয়। সড়কে তো টাকা উড়ে। অনেকেই ভাগ পায়। এইডা বন্ধ অইবো না। ১৫ বছরে শতবার দেখছি দাবড়ানি দিতে, আবার যেই লাউ সেই কদু।”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভুলতা-গাউছিয়া এলাকায় প্রতিদিন প্রায় এক হাজারের মতো ভাসমান দোকান বসে। হকারদের অভিযোগ, প্রতিটি দোকান থেকে প্রতিদিন ৩০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। সেই হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ টাকা, মাসে ৯০ লাখ টাকা এবং বছরে প্রায় ১০ কোটি ৮০ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া নতুন দোকান বসাতে এককালীন ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয় বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন হকার। এক হাজার দোকান থেকে এককালীন এই অর্থ আদায় করা হলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি টাকা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন হকার জানান, নতুন দোকান বসাতে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সিন্ডিকেটের সঙ্গে এক ধরনের ‘চুক্তি’ করতে হয়। এককালীন অর্থ দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিদিনের ‘মাশোহারা’ও দিতে হয়। তবে চাঁদার টাকা অনেক সময় সড়ক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কথা বলে আদায় করা হয় বলে অভিযোগ তাদের।
হকারদের অভিযোগ, প্রতিদিনের ৩০০ টাকা বিকাশ বা নগদ নম্বরে পাঠাতে হয়। কেউ নির্ধারিত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার দোকান সরিয়ে দেওয়া কিংবা হামলার শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গোলাকান্দাইল মফিজ প্লাজা থেকে ভাই ভাই মার্কেট, নুরম্যানসন, তাঁতবাজার, গাউছিয়া মার্কেট ও রেদোয়ান টাওয়ার পর্যন্ত সড়কের দুই পাশের ফুটপাত এবং সড়কের একটি বড় অংশ দখল করে বসেছে বিভিন্ন ধরনের দোকান।
বাস কাউন্টার, রেন্ট-এ-কার, মাছ-মাংসের দোকান, কাঁচা তরকারি, ফলমূল, জুতা-কাপড়, গয়না, ফাস্টফুডসহ নানা ধরনের ব্যবসা চলছে মহাসড়কের ওপর ও ফুটপাতজুড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই দখলের কারণে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশে নিয়মিত যানজট সৃষ্টি হয়।
পরিবহন চালকদের অভিযোগ, মাত্র এক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতেই অনেক সময় এক ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়। ছুটির দিন ও উৎসবের মৌসুমে এই ভোগান্তি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
পথচারীরা জানান, ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে তাদের মহাসড়কের ওপর দিয়ে হাঁটতে হয়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
রূপগঞ্জ উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ভুলতা ইন্টারসেকশন। পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রবেশদ্বারকে ঘিরে রয়েছে বিপুল বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিপুল অর্থের লেনদেন ও বাজার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে এখানে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ভুলতা ও আশপাশের বাজারের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে অতীতে একাধিক সহিংস ঘটনা ঘটেছে। ২০২২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রাতে রাকিব হাসানকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে শ্রমিক লীগের দেলোয়ার হোসেন ও ছাত্রলীগের হানযালার বিরুদ্ধে। এছাড়া ২০১৫ সালে কাঁচাবাজারের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে জাকির হোসেন হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, পরিবহন চালক ও পথচারীদের অভিযোগ, অধিকাংশ উচ্ছেদ অভিযানই সাময়িক। অভিযানের সময় দোকানপাট সরিয়ে নেওয়া হলেও কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে।
তাদের মতে, শুধু হকার উচ্ছেদ করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, সড়ক ও ফুটপাত ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী পরিকল্পনা, প্রয়োজন হলে বিকল্প পুনর্বাসন এবং চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা।
এদিকে প্রায় ৩৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ফ্লাইওভার ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবকাঠামোর পাশেই ফুটপাত দখলের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, বিপুল অর্থ ব্যয়ে অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও দখল ও চাঁদাবাজির কারণে এর সুফল অনেকটাই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, “অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—সকালে উচ্ছেদ অভিযান, আর রাতে আবার দখলের মহোৎসব; ১৭ বছরে ১২৩ বার অভিযান পরিচালনার পরও যদি ফুটপাত দখলমুক্ত না হয়, তাহলে এর দায় কার?
ভুলতা-গাউছিয়া এলাকার কোটি কোটি টাকার এই অবৈধ অর্থনীতির পেছনে কারা রয়েছে, কারা নিয়ন্ত্রণ করছে চাঁদাবাজির এই সিন্ডিকেট—এখন সেই প্রশ্নের উত্তরই খুঁজছেন সাধারণ মানুষ।