
নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ:
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবো পৌরসভার খাদুন এলাকার রনি নিট অ্যান্ড কম্পোজিট ডায়িং কারখানার নির্গত বর্জ্যে পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিপন্ন হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য নিঃসরণের কারণে আশপাশের জলাশয়ের মাছ মারা যাচ্ছে, ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ ঘটনায় খাদুন গ্রামের বাসিন্দা আমজাদ আলী ভূঁইয়া বাদী হয়ে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও তারাবো পৌরসভার প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলামের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, খাদুন এলাকার রনি নিট অ্যান্ড কম্পোজিট ডায়িং কারখানার বর্জ্য ও দূষিত পানি আশপাশের কৃষিজমি, মাছের খামার ও জলাশয়ে গিয়ে পড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, কারখানা কর্তৃপক্ষ রাতের অন্ধকারে অপরিশোধিত বর্জ্য একটি পাইপের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী মাছের খামার, কৃষিজমি ও জলাশয়ে ফেলে। কোথাও পানির রং কুচকুচে কালো, আবার কোথাও বিভিন্ন রঙের দূষিত পানি দেখা যায়। পানির ওপর ভাসছে ফেনা এবং চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে অসহনীয় দুর্গন্ধ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এ কারণে কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে, জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে এবং দুর্গন্ধে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা নাক-মুখ ঢেকে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছে। অনেকেই চর্মরোগ, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কারখানায় ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) থাকলেও বিদ্যুৎ খরচ কমানোর জন্য তা নিয়মিত চালানো হয় না। পরিবর্তে বিষাক্ত বর্জ্য একটি পাইপের মাধ্যমে স্থানীয় কৃষিজমি ও সেচখালে ফেলা হয়। সেখান থেকে দূষিত পানি পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা একপর্যায়ে কারখানার বর্জ্য নির্গমনের পাইপ বন্ধ করে দিলেও দূষণ বন্ধ হয়নি।
খাদুন এলাকার স্কুলশিক্ষিকা রাহিমা বেগম রেনু বলেন, "ডায়িং কারখানার বিষাক্ত পানির কারণে আমাদের এলাকার রাস্তাঘাট ও বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে যায়। প্রতিবাদ করলেই হুমকি দেওয়া হয়।"
মৈকুলী এলাকার কৃষক রিপন মিয়া বলেন, "কারখানা থেকে নির্গত অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য আশপাশের খাল ও জলাশয়ে মিশে পানি দূষিত করছে। এতে মাছ মারা যাচ্ছে এবং কৃষিজমিতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও দুর্গন্ধে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। অনেকেই চর্মরোগ, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছেন।"
নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এএইচএম রাশেদ বলেন, "রনি ডায়িংয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে প্রতিবেদন সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।"
পরিবেশ উন্নয়ন সোসাইটির চেয়ারম্যান মুহাম্মদ হোসেন বলেন, "শিল্পকারখানার বর্জ্য যথাযথভাবে পরিশোধন না করে পরিবেশে ফেললে শুধু জলজ প্রাণী নয়, কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। তাই জরিমানার পাশাপাশি পরিবেশ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।"
এ বিষয়ে রনি নিট অ্যান্ড কম্পোজিট ডায়িং কারখানার জেনারেল ম্যানেজার নুরুল ইসলাম বলেন, "কারখানার ইটিপি নিয়মিত চালু রয়েছে। কারখানার বর্জ্য পৌরসভার ড্রেনে ফেলা হয়। অতিবৃষ্টির কারণে ড্রেনের পানি বেড়ে গিয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।"
এর আগে রূপগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ মারজানুর রহমান পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত গত মাসে পরিবেশ দূষণের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটিকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করেন।
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও তারাবো পৌর প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, "রনি নিট অ্যান্ড কম্পোজিট ডায়িং কারখানার বর্জ্যে পরিবেশ দূষণের ঘটনায় এলাকাবাসীর লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া টানা বৃষ্টির কারণে অনেক এলাকাতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করছে। কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য কৃষিজমি, জলাশয় ও খোলা স্থানে ফেলার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানা করা হয়েছে।"