
নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ প্রতিনিধি:
জামদানি শাড়ি বাঙালির ঐতিহ্য, শৈল্পিক সৌন্দর্য ও নান্দনিকতার অনন্য প্রতীক। সূক্ষ্ম নকশা, মসৃণ বুনন এবং নিখুঁত কারুকাজের জন্য দেশ-বিদেশে এর ব্যাপক কদর রয়েছে। সূতার মান ও নকশার সূক্ষ্মতার ওপর নির্ভর করে একটি জামদানি শাড়ির দাম আড়াই হাজার টাকা থেকে দেড় লাখ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে। অথচ যে নারীরা দিনের পর দিন পরিশ্রম করে এসব শাড়ি বুনে চলেছেন, তাদের অনেকের ভাগ্যেই জোটে না নিজের হাতে বোনা একটি জামদানি শাড়ি।
ইতিহাস বলছে, মোগল আমলে জন্ম নেওয়া জামদানি শাড়ি খাঁটি হ্যান্ডলুমে তৈরি হয়। তাঁতে বসেই হাতে হাতে নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়, যেখানে আগে থেকে কোনো নকশা আঁকা থাকে না। ফুল, লতা-পাতা ও জ্যামিতিক নকশার সমন্বয়ে তৈরি এই শিল্পকর্মে প্রয়োজন অসাধারণ দক্ষতা ও ধৈর্য। ইউনেস্কো জামদানি বুননকে ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। পাশাপাশি এটি বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবেও স্বীকৃত।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের জামদানি পল্লীর হাজারো নারী প্রতিদিন অভাবের সঙ্গে লড়াই করে এই ঐতিহ্য ধরে রাখছেন। কিন্তু নিজেদের বোনা শাড়ি নিজেরাই পরতে পারেন না।
জামদানি কারিগর আলেয়া বেগম বলেন, “জামদানি শুধু শাড়ি না গো বাজান, এতে আমাগো জীবনের গল্প মিশে আছে। লাখ টাকার শাড়ি বুনি, কিন্তু অভাবের কারণে নিজেরা পরতে পারি না। যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। মাস শেষে আবার ঋণ করতে হয়।”
একই আক্ষেপ আছিয়া নামের আরেক কারিগরের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, “জামদানি বুনে যে নারী, পড়তে পারে না সে শাড়ি। এই শাড়ির প্রতিটি ভাঁজে আমাগো দুঃখের গল্প লুকানো আছে।”
রূপসী গ্রামের মাসুদা বেগমের জীবনও যেন একটি জামদানির মতোই সূক্ষ্ম বুননে গাঁথা। প্রায় ১১ বছর স্বামী-সন্তানদের সঙ্গে তাঁতে বসে অসংখ্য জামদানি শাড়ি বুনেছেন। কিন্তু জীবনের প্রায় ৬০ বছর পার হলেও নিজের হাতে বোনা একটি শাড়ি পরার সুযোগ হয়নি। সংসারের অভাবের কারণে প্রতিটি শাড়িই বিক্রি করে দিতে হয়েছে।
সম্প্রতি ছেলের উপহার দেওয়া একটি জামদানি শাড়ি হাতে পেয়ে আবেগাপ্লুত মাসুদা বেগম বলেন, “অনেক খুশি হইছি। এই শাড়ি খুব যত্ন করে রাখমু। বড় কোনো অনুষ্ঠান হইলেই পরমু।”
তিনি জানান, মাত্র ২৩ বছর বয়সে স্বামীর কাছ থেকে তাঁত বোনা শেখেন। অভাবের সংসারে সন্তানদের কোলে নিয়েই বছরের পর বছর তাঁতে বসে শাড়ি বুনেছেন। তিনি বলেন, “পোলাপানরে ঠিকমতো লেখাপড়া শেখাইতে পারিনি, শুধু শাড়িই বুনছি।”
স্থানীয় প্রবীণ রফিকুল ইসলাম বলেন, আধুনিকতার চাপে ঐতিহ্যবাহী জামদানি শিল্প নানা সংকটে পড়েছে। এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে কারিগরদের আর্থিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
এ বিষয়ে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, “জামদানি শুধু একটি শাড়ির নাম নয়, এটি বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। এই শিল্পকে সংরক্ষণ ও বিকাশে সরকার বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।”