
নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ প্রতিনিধি:
জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা। বয়স পেরিয়েছে চার দশক। একজনের উচ্চতা মাত্র তিন ফুট, অন্যজনের আড়াই ফুট। স্বাভাবিক জীবনযাপন তো দূরের কথা, প্রতিটি দিনই তাদের কাছে এক কঠিন সংগ্রাম।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কাঞ্চন পৌরসভার কেন্দুয়া পাড়ার দুই বোন আছিয়া ও মরিয়ম দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য, শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন। তাদের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন—একটি নিরাপদ মাথা গোঁজার ঠাঁই।
দুই বোন বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘরে বসবাস করেন। সামান্য বৃষ্টি হলেই টিনের চাল চুঁইয়ে ঘরের ভেতরে পানি পড়ে, ভিজে যায় বিছানাপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। রাতভর নির্ঘুম কাটাতে হয় পুরো পরিবারকে। ব্যবহারযোগ্য স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট না থাকায় নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটাতেও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে আছিয়া ও মরিয়ম স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারেন না। কর্মক্ষম না হওয়ায় নিজেদের জীবিকা নির্বাহেরও সুযোগ নেই। পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত। বিয়েও হয়নি দুই বোনের। ফলে এখনও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওপর নির্ভর করেই চলছে তাদের জীবন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ছোটবেলা থেকেই তারা দুই বোনকে চরম কষ্টের মধ্যে বড় হতে দেখছেন। বিষয়টি একাধিকবার বিভিন্ন মহলে জানানো হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। মানবিক বিবেচনায় দ্রুত তাদের জন্য একটি নিরাপদ ঘর নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সামান্য বৃষ্টি হলেই ঘরে পানি পড়ে, বসবাসের পরিবেশ থাকে না। প্রতিবন্ধী হওয়ায় দুই বোন নিজেরা কিছুই করতে পারেন না। সরকারের পক্ষ থেকে একটি ঘর ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে জীবনের বাকি সময়টুকু অন্তত স্বস্তিতে কাটাতে পারবেন।
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে আছিয়া ও মরিয়ম বলেন, “জন্ম থেকেই অনেক কষ্ট করে জীবন কাটাচ্ছি। আমাদের কোনো বড় চাওয়া নেই। শুধু বৃষ্টির সময় যেন ভিজতে না হয়, এমন একটি নিরাপদ ঘর চাই। বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে খুব কষ্টে দিন পার করছি। সরকারের কাছে আমাদের একটাই আবেদন—একটি থাকার ঘর করে দেওয়া হোক।”
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, “দুই বোনের প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বৃষ্টিপাত কিছুটা কমলেই তাদের জন্য একটি সরকারি ঘর নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।”
চার দশকের অপেক্ষা, সীমাহীন কষ্ট আর অগণিত নির্ঘুম রাত পেরিয়েও আজও একটি নিরাপদ আশ্রয়ের অপেক্ষায় আছেন আছিয়া ও মরিয়ম। একটি নিরাপদ ঘর, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সামাজিক সহায়তা পেলে বদলে যেতে পারে তাদের জীবনের গল্প। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসনের দেওয়া আশ্বাস কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়।