খুলনা | সোমবার | ২১ মে ২০১৮ | ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

খুলনার মাটিতে বিজয়ের পতাকা

মেজর জয়নুল আবেদীন | প্রকাশিত ২৬ মার্চ, ২০১৭ ০২:২১:০০

একাত্তরের ডিসেম্বর। পূর্ব পাকিস্তান নামক ভূ-খন্ডের বড় একটি এলাকা প্রেসিডেন্ট জেঃ ইয়াহিয়া খানের সামরিক প্রশাসনের হাতছাড়া হয়েছে। ডিসেম্বরের প্রথম দিকে যশোর ও সাতক্ষীরায় বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। সামনে খুলনা বিজয়ের পালা। খুলনার অন্যান্য থানাগুলো তখন প্রায় মুক্ত হয়েছে। ব্রিগেডিয়ার সালেক ও ৮নং সেক্টর কমান্ডার মেঃ মঞ্জুর আমাকে খুলনা বিজয়ের নির্দেশ দিলেন। ১১ ডিসেম্বর সাব-সেক্টর কামান্ডার মুজাহিদ ক্যাপ্টেন শাহাজাহান মাস্টার ও খুলনা শহর আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান মির্জা খয়বর হোসেনের অধিনস্থ দুইশ’ যোদ্ধা নিয়ে খুলনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। তখনও চারিদিকে লাশ আর লাশ। ব্রিগেডিয়ার সালেকের নির্দেশনা পাওয়ার পর সুন্দরবন এলাকার সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়া, সাব-সেক্টর কমান্ডার এ এস এম সামসুল আরেফিন, ক্যাপ্টেন ফ হ ম উদ্দীন, নূরুল ইসলাম, কুতুবউদ্দীন ও স ম বাবর আলীসহ অন্যান্য কমান্ডারদের আমার নির্দেশনায় কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। মেজর জিয়া ও তাজুল ইসলাম ছাড়া আর সবাই যথারীতি নির্দেশনা পালন করে। এমনকি মেজর জিয়ার হাতে থাকা বেতার যন্ত্রটি আমাকে ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তখনও গল্লামারী রেডিও পাকিস্তান খুলনা কেন্দ্র, লায়ন্স স্কুল, পিএমজি কলোনী, শিপইয়ার্ড, ৭নং জেটি, টটুপাড়া, নিউ ফায়ার ব্রিগেড, নূর নগর ওয়াপদা ভবন, গোয়ালপাড়া, গোয়ালখালী ও দৌলতপুরে সেনা ছাউনী। সুরখালী থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের দলকে নিয়ে বটিয়াঘাটার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছি। সেখানে আমাদের সাথে সম্পৃক্ত হলেন লেঃ গাজী রহমতউল্লাহ বীর প্রতীক, জেলা মুজিব বাহিনী প্রধান শেখ কামরুজ্জামান টুকুর নেতৃত্বাধীন চারশ’ মুক্তিযোদ্ধা। ক্যাপ্টেন ফ হ ম উদ্দীন ও লেঃ নোমান উল্লাহকে জেলখানা ঘাটের বিপরীতে সেনের বাজার ও রাজাপুরে অবস্থান নিতে বলা হয়। যাতে পাকিস্তানী সেনারা ভৈরব নদের উত্তর পাড়ে যেতে না পারে। সাব-সেক্টর কমান্ডার শাহাজাহান মাস্টারকে কৈয়া বাজার এর কাছে কুলুটিয়ায় অবস্থান নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তার নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধারা রেডিও সেন্টার আক্রমণ করবে। কামান্ডার আফজাল হোসেন ও কুতুব উদ্দীনের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধারা বটিয়াঘাটার ঝড়ভাঙ্গা ও সাচিবুনিয়া থেকে লায়ন্স স্কুলে সেনা ছাউনীর উপর আঘাত হানবে। ছাত্রনেতা মোশাররফ হোসেন বাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হল শত্র“ সেনারা যেন ভৈরব নদী পার হয়ে পালানোর চেষ্টা না করতে পারে। ১৪ ডিসেম্বর শেষ রাতে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা গল্লামারী অভিমুখে রওনা হলাম। সাথে ছিলেন গাজী রহমত উল্লাহ দাদু ও স ম বাবর আলী। বেতার কেন্দ্রের দিকে এগোতে থাকলাম। পাঁচশ’ গজ দূরে পৌঁছালে বেতার কেন্দ্রের সেনা ছাউনী থেকে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। সাব-সেক্টর কমান্ডার এ এস এম সামসুল আরেফিন তার বাহিনীকে উৎসাহ দিচ্ছে। দুই ইঞ্চি মর্টার দিয়ে আক্রমণও করল। প্রচন্ড গুলিবর্ষণের মধ্যদিয়ে আমরা চক্রাখালী হাইস্কুল ক্যাম্পে ফিরে আসলাম। কমান্ডার খিজির তার নৌবাহিনীসহ ১৫ ডিসেম্বর সকাল ১০টা নাগাদ আমাদের সাথে যোগ দিলেন। তার সাথে ছিল অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। ১৬ ডিসেম্বর রাতে চক্রাখালী হাইস্কুল থেকে আবার আমরা রওনা করলাম। ছয় পাউন্ডার গান দিয়ে লায়ন্স স্কুল সেনা ছাউনীতে আক্রমণ করা শুরু হল। লায়ন্স স্কুলের সেনা ছাউনীর সদস্যরা তখনও মুহুর্মুহু গুলি চালাচ্ছে। সকাল ৬টা নাগাদ পাকিস্তানী সেনারা ভারী অস্ত্রদিয়ে আক্রমণ শুরু করলেন। মুক্তিযোদ্ধারা পার্শ্ববর্তী একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে অবস্থান নেয়। আমাদের গুলি প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। গাজী রহমত উল্লাহ দাদু ও স ম বাবর আলী তখনও আক্রমণ করছে। আমাদের আক্রমণে সেখানে দু’জন সদস্য আহত হয়। আমাদের নৌ-বহর শিপইয়ার্ডের সন্নিকটে এলে শত্র“সেনারা ভারী অস্ত্র দ্বার আক্রমণ শুরু করে। এ আক্রমণে একজন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হয়। গল্লামারী রেডিও সেন্টার ও লায়ন্স স্কুলের সেনা ছাউনীতে অবস্থানরত পাকিস্তানী সেনারা আত্মসমর্পণ করে। আমরা বীর দর্পে শেরে বাংলা রোড দিয়ে সার্কিট হাউস অভিমুখে রওয়ানা হলাম। আমাদের সাথে বিজয় উল্লাস করতে করতে ছাত্র-যুবকরা সামনে এগোতে থাকে। আমার সাথে গাজী রহমত উল্লাহ দাদু, স ম বাবর আলী, গাজী রফিকুল ইসলাম, রেজাউল করিম ও আবুল কালাম আজাদ প্রমুখরা ছিলেন। সকাল ৯টা নাগাদ সার্কিট হাউস পৌঁছে আমি ও গাজী রহমত উল্লাহ দাদু যৌথভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করি। তখনও শিরোমনিতে মিত্র-মুক্তি বাহিনী ও প্রতিপক্ষ পাকিস্তানীদের সাথে যুদ্ধ চলছে। পরবর্তীতে তারা আত্মসমর্পন করে। সারা বিশ্বে ইথারে ইথারে পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পনের খবর প্রচারিত হলেও একদিন পরে খুলনায় অবস্থানরত জেঃ ইয়াহিয়া খানের সামরিক বাহিনী আত্মসমর্পন করে (লেখক : কমান্ডার, ৯নং সেক্টর যুদ্ধপরবর্তী দায়িত্ব)। দি পেট্রোয়েট থেকে অনুমোদিত ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর সংখ্যা।

 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

বাঙলার বৈশাখ : বাঙালির বৈশাখ

বাঙলার বৈশাখ : বাঙালির বৈশাখ

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৪৯

বর্ষবরণ-১৪২৫

বর্ষবরণ-১৪২৫

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৫২

বাংলা পঞ্জিকা ও বাংলার আবহাওয়া

বাংলা পঞ্জিকা ও বাংলার আবহাওয়া

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৫০






বৈশাখে দেশী মজাদার খাবার

বৈশাখে দেশী মজাদার খাবার

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৪৫

নতুনের আহ্বান

নতুনের আহ্বান

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৪৫

বোশেখ 

বোশেখ 

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৪৫

বৈশাখের আমেজ

বৈশাখের আমেজ

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৪৪


ব্রেকিং নিউজ



যে কারণে রোজা নষ্ট হয় 

যে কারণে রোজা নষ্ট হয় 

২১ মে, ২০১৮ ০০:৫৯

যে কারণে রোজা নষ্ট হয় 

যে কারণে রোজা নষ্ট হয় 

২১ মে, ২০১৮ ০০:৫৯