খুলনা | মঙ্গলবার | ২৩ অক্টোবর ২০১৮ | ৮ কার্তিক ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ : বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা

এড. খন্দকার মজিবর রহমান | প্রকাশিত ২৬ মার্চ, ২০১৭ ০২:২০:০০

প্রতিবারের মত প্রথাসিদ্ধ নিয়মে মার্চ মাস আমাদের মধ্যে আবার ফিরে এসেছে। একদা ছিল অগ্নি ঝলসানো গণজোয়ারের উত্তাল তরঙ্গ বিক্ষুব্ধ বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের মহান উত্থান পর্ব। ৭ই মার্চ স্বাধীনতার একটি মাইল ফলক চিহ্নিত দিবস। যে দিনটি আমাদের স্মরণ থেকে, মনন থেকে ও হৃদয় থেকে মুছে যাওয়ার কথা নয়, মুছে যেতে পারেনা। কথায় বলে বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাতি, অনেকে বলেন বাঙালি ঐতিহ্য এবং ইতিহাস মনস্ক নয়, মোদ্দাকথা ভুলে যাওয়াই নাকি বাঙালির চিরন্তন বৈশিষ্ট। তাই কি হয়, হতে পারে? তিল তিল সাধনা সংগ্রাম, এক সাগর তাজা রক্ত, আর মা বোনের পবিত্র সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া যে স্বাধীনতার ইতিহাস, সেই স্বাধীনতার ইতিহাস আমরা ভুলি কিভাবে এবং কেন?
তাই ৭ই মার্চ কেবলমাত্র একটি দিনই নয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম সংগ্রামী ভিত্তির জাতীয় দিবস এটি। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ দিবসটি ছিলো রবিবার, ঢাকার রেসকোর্স ময়দান বর্তমানে সোহরাওয়ার্দ্দী উদ্যান ছয়লাব হয়ে গেল মানুষের জোয়ারে। স্মরণকালের ইতিহাসের বৃহত্তর গণ সমাবেশে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ঘোষিত হয়েছিলো এক ঐতিহাসিক ঘোষণা। বঙ্গবন্ধুর বজ্রকন্ঠের সেই ঘোষণার সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যায় আমেরিকার গ্যাটিস বার্গের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের সাথে। মিল খুঁজে পাওয়া যায় বৃটিশ জননেতা ডিজ রেইলী অথবা চার্চিল এমন কি কলকাতার ছেলে নেতাজী সুভাষ বসুর বজ্রকন্ঠের সাথে, কি এক তেজদিপ্ত নিস্কম্প সে কন্ঠ।
আজ এতোগুলো বছর পর ক্যাসেটের ফিতার মাইক্রোনের তারে যারা সে বাণী শুনছেন, তারা যদি পরবর্তী প্রজন্মের হন তবে নিশ্চয়ই উপলব্ধি করতে পারবেন না, কি অমোঘ শানিত, ক্ষুরধার তেজ নি:সৃত মোহময়ী, সে বাণী তাই স্বাভাবিক কারণে ৭ই মার্চের আবেদন ও মূল্যায়ন আমাদের জাতীয় জীবনে অতীব প্রয়োজন। অন্তত আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে সত্য ইতিহাস বয়ান এবং ইতহিাস বিকৃতির হাত থেকে রক্ষার স্বার্থে।
৬৯-এর ছাত্র জনতার মহান গণঅভ্যূত্থানের মাধ্যমে পতন ঘটে স্বঘোষিত ফিল্ড মার্শাল আইয়ুবের সামরিক স্বৈরাচারী শাসনের। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় তৎকালীন পাকিস্তানের ইতিহাসের প্রথম সাধারণ নির্বাচন ১৯৭০ সালে ৭ ডিসেম্বর। এই নির্বাচন দেশে বিদেশে “ব্যালট বক্স বিপ্লব” হিসেবে বিপুল খ্যাতি অর্জন করে।
জাতীয় পরিষদে পূর্ববাংলার ১৬৯ আসনের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৬৭ আসন বিজয় লাভ করে গণতান্ত্রিক বিশ্বে এক বিষ্ময় সৃষ্টি করে। ৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮২ আসন লাভ করে। ১৯৭০ এর এই নির্বাচনে বিজয়ই ছিলো মুক্তি সংগ্রামের প্রেরণার উৎস। আওয়ামী লীগের এই ঐতিহাসিক বিজয়ে পশ্চিমা কায়েমী স্বার্থ ও সামরিক-বেসামরিক আমলা চক্র এক মারাত্মক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। বঙ্গবন্ধু তথা বাঙালি জাতির হাতে ক্ষমতা প্রদানে টালবাহানা শুরু করে। নির্বাচিত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠানে গাফিলতি শুরু হয়।
অত:পর বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে শুরু হয় অভূতপূর্ব অসহযোগ আন্দোলন। ২ ও ৩ মার্চ সারা পূর্ব বাংলা হরতালের মাধ্যমে একেবারে অচল হয়ে পড়ে। সেনাবাহিনী কারফিউ জারী করে। বাঙালি জনতা কারফিউ নামক আইন অমান্য করে রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সেনাবাহিনীর গুলিতে প্রাণ দান করেন অনেক ছাত্র জনতা।
৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু আন্দোলনের ডাক দেন। মূলত এই অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে সারা পূর্ব বাংলায় একচ্ছত্র এবং মুকুটহীন শাসক হিসেবে অভিষিক্ত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পরিচালিত হতে শুরু করে দেশ। বলা যায় অসহযোগ আন্দোলন এক নিরব স্বাধীনতা বিপ্লবে পর্যবসিত হয়। এরই প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সনের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে প্রায় দশ লক্ষ লোকের স্মরণকালের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ গণসমাবেশে বঙ্গবন্ধু পশ্চিমা শাসকদের কাছে চার দফা দাবি উত্থাপন করেন (ক) অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্যাহার (খ) অবিলম্বে সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া (গ) নিরস্ত্র জনতার গণহত্যার সঠিক তদন্ত করা (ঘ) নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর।
৭ই মার্চের জনসভায় বঙ্গবন্ধু দেশবাসীর প্রতি কতকগুলি নির্দেশ জারী করেন। এই নির্দেশগুলো অনেকটা রাষ্ট্রপ্রধানের আদেশরূপে অপরবর্তীতে অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালিত হয়েছিলো। সরকার নামক যন্ত্র অচল, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জনতার সরকার প্রতিষ্ঠিত। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে মহাত্মা গান্ধীর ডাকা অসহযোগ আন্দোলনকে ম্লান করে দিয়ে পূর্ব বাংলার প্রায় সকল জনগণ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে স্বতঃস্ফূর্ত অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন। প্রকৃতপক্ষে এই আন্দোলনের মাধ্যমেই বাঙালি প্রথম স্বাধীনতার স্বাদ পায়। জনতার প্রতি বঙ্গবন্ধুর নিদের্শগুলো ছিলো নিম্নরূপ ঃ
(১)    বাংলার মুক্তি না আসা পর্যন্ত খাজনা ট্যাক্স বন্ধ রাখতে হবে।
(২)    সেক্রেটারিয়েট সরকারি ও আধা সরকারি অফিস, সুপ্রিম কোর্ট, হাই কোর্ট ও অন্যান্য আদালত বন্ধ থাকবে।
(৩)    সেনাবাহিনীর সাথে কোনরূপ সহযোগিতা বন্ধ
(৪)    বেতার টেলিভিশন এবং সংবাদপত্রে আওয়ামী লীগের কোন খবর না দিলে বা সংবাদ প্রকাশে বাধা দিলে সকল বাঙালি কর্মচারীরা কাজে যোগদানে বিরত থাকবে
(৫)    বিদেশের সাথে সকল টেলিযোগাযোগ বন্ধ থাকবে
(৬)    স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় অবিরাম ধর্মঘট
(৭)    দেশের সকল গৃহে কালো পতাকা টানাতে হবে
(৮)    ব্যাংক মাত্র দুই ঘন্টা খোলা থাকবে কিন্তু কোন অর্থ পশ্চিম পাকিস্তানে চালান হতে পারবেনা
(৯)    আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে অবিলম্বে সর্বত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে হবে।
উল্লেখিত নির্দেশ ঘোষণার দ্বারা সারা পূর্ববাংলা বঙ্গবন্ধুর একক কর্তৃত্বের মধ্যে এসে পড়ে। উল্লেখিত ঘোষণাসমুহ শুধু আইন অমান্যই নয়, বরং বাঙালির স্বাধীন শাসনই সেদিন প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাই যতই তাত্ত্বিক আলোচনা করি ৭ই মার্চ ঘোষণা বস্তুতপক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণারই নামান্তর।
৯ মার্চ দি টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বঙ্গবন্ধু মুজিবকে পূর্ব বাংলার একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী বলে উল্লেখ করা হয়। মূলতঃ ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক ঘোষণার পর বাঙালি জাতির আর পেছনে ফিরে তাকানোর পথ ছিলনা। বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ ২৪ বছর যাবৎ তিল তিল সংগ্রাম, সাধনার দ্বারা ১২ বছর কারাবাসের মধ্যদিয়ে সারা বাংলার গ্রামে গ্রামে উল্কার মত ছুটে বেড়িয়ে বাঙালি জাতিকে সফলভাবে হাজার বছরের ইতিহাসে একবারই সুকঠোর ঐক্যের বন্ধনে একতাবদ্ধ করতে পেরেছিলেন। সাড়ে সাত কোটি ঐক্যবদ্ধ কন্ঠে ধ্বনিত হয়েছিলো সেদিন বঙ্গবন্ধুর কন্ঠ।
১৯৭১ সনের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর অধিনায়ক একটি বেতার ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই বেতার ভাষণের মূল কথা ছিল “শেখ মুজিব জাতির বিশ্বাস ঘাতক। তাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।” সারা বাঙালি জাতির মধ্যে ঐ একজন বাঙালিই ছিল পাকিস্তানী হায়না চক্রের লক্ষ্য। সমসাময়িক বহু বিখ্যাত ব্যক্তিত্বশালী নেতা নয়। স্রেফ শেখ মুজিবই ছিল হানাদারদের মূল লক্ষ্য।
তাই অনাকাঙ্খিত বিতর্ক নয়। বঙ্গবন্ধু সেদিন কোন একটি নাম ছিল না, ছিল বাঙালি জাতির ঐক্যের প্রতীক, তাই যে যে অবদানই রাখুন না কেন বঙ্গন্ধুর নাম যুক্ত না থাকলে ৭১-এর মার্চে দেশের মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্য ছিলো না।
উনবিংশ শতাব্দির বিখ্যাত ঐতিহাসিক টমাস কারলাইল ইতিহাস সম্পর্কে বলতে যেয়ে বলেন, “কোন মহৎ ব্যক্তির জীবনই বৃথা যায় না। ইতিহাসের মূলে আছে মহৎ ব্যক্তিদের জীবনী, পৃথিবীর ইতিহাস হচ্ছে মহৎ ব্যক্তিদের জীবনেরই ইতিহাস।” তাই স্বাভাবিকভাবেই টমাস কারলাইলের বাণীর সূত্র ধরে বলা যায়, বঙ্গবন্ধুর জীবনী বাদ রেখে বাংলাদেশের ইতিহাস হয়না, হতে পারে না, হওয়া উচিতও নয়; যুক্তিযুক্ত নয়।
পরিশেষে একটি কথা বলে আমার এই লেখার ইতি টানবো “যাকে যাহা মানায়, তাকে তাহাই দাও।” এটাই সত্য, এটাই ন্যায়। কবি নির্মলেন্দু গুণের ভাষায় বলতে হয়, “গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তার অমর কবিতা খানি-এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, সেই থেকে স্বাধীনতার শব্দটি আমাদেরই।”
লেখক : আইনজীবী, সরকারি পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি), লেখক ও রাজনীতিক।

 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

বদলে যাবে মংলা বন্দর

বদলে যাবে মংলা বন্দর

০৩ জুলাই, ২০১৮ ০২:০১













ব্রেকিং নিউজ





যশোরে সাংবাদিক নোভার  আত্মহত্যা

যশোরে সাংবাদিক নোভার  আত্মহত্যা

২৩ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:৫৬