খুলনা | সোমবার | ২১ মে ২০১৮ | ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

পাকিস্তানী জেনারেলদের খুলনা সফর ও সর্বশেষ শহিদ

কাজী মোতাহার রহমান | প্রকাশিত ২৬ মার্চ, ২০১৭ ০২:১৭:০০

মুজিবনগর সরকারের যাত্রা শুরু হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধ প্রতিহত করার জন্য মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নিজামী ইসলামী, ও পিডিপি’র সমন্বয়ে গড়ে  ওঠে শান্তি কমিটি। খুলনার ডাকবাংলা ভবনটি ছিল স্থানীয় শান্তি কমিটির সদর দপ্তর। জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরা মুসলিম জাতীয়তাবাদের আদর্শ বিসর্জন দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে মেনে নিতে রাজি হয়নি। পাকিস্তানের অখন্ডতার রক্ষার পক্ষে শান্তি কমিটি অবস্থান নেয়। আর শান্তি কমিটির গর্ভেই খুলনায় রাজাকার বাহিনীর আত্মপ্রকাশ। বাস্তবে একাত্তরে খুলনা রাজাকারের আতুরঘর। ৯৬ জন সদস্য নিয়ে এ বাহিনীর যাত্রা। এজন্য পূর্ব পাকিস্তান সরকার ১৯৫৮ সালের আনসার এ্যাক্ট বাতিল করে অপর এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে রাজাকার বাহিনী গঠন ও বেতন ভাতার ব্যবস্থা করে। একাত্তরের মে মাসের কথা। রাজাকার বাহিনীর শ্লোগান ছিল “বীর মুজাহিদ অস্ত্র ধর, ভারতীয় চরদের খতম কর”। রাজাকার বাহিনী প্রতিষ্ঠা করেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর মাওলানা এ কে এম ইউসুফ। এই বাহিনী গঠনের জন্য পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের রাজস্ব মন্ত্রীর পুরস্কার পান। স্থানীয় সার্কিট হাউসে পাকবাহিনীর সদর দপ্তরে প্রথমদিকে লেঃ কর্নেল এবি ভীন-এর রাজনৈতিক পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। মাওলানা ইউসুফ শরণখোলা থানার রাজর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পাকিস্তান শাসন আমল থেকেই শহরের টুটপাড়া দিলখোলা রোডে বসবাস শুরু করেন। যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ২০১৪ সালে বিচারাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন।
খুলনা শহরের ভূতের বাড়ি আনসার ক্যাম্প ছিল রাজাকার বাহিনীর হেড কোয়াটার ও প্রধান নির্যাতন সেল। এ ছাড়া শিপইয়ার্ড, দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরী ও খালিশপুরে রাজাকারদের ক্যাম্প ছিল।
হিন্দু সম্প্রদায়ের সম্পদ দখল, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্তদের স্বজনদের উপর নির্যাতন, নীরিহ মানুষকে হত্যা করে রাজাকাররা পাকিস্তানীদের প্রিয় ভাজন হয়ে উঠে। রাজাকারদের উৎসাহিত করতে মুসলিম লীগ (কাইয়ুম খান) এর সেক্রেটারী খান-এ-সবুর ও রাজস্ব মন্ত্রী মাওলানা এ কে এম ইউসুফ বিভিন্নস্থানে সমাবেশে বক্তৃতা করেন।
পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণরের উপদেষ্টা মেজর জেঃ রাও ফরমান আলী আকাত্তরের ১৪ নভেম্বর খুলনা সফর করেন। তিনি ওই দিন খালিশপুর হাউজিং এস্টেট এলাকায় পূর্ব পাকিস্তান লেবার ফেডারেশন আয়োজিত শ্রমিক সমাবেশে বক্তৃতা করেন (দৈনিক পাকিস্তান, ১৫ নভেম্বর ১৯৭১)।
তিনি শ্রমিকদের প্রতি উৎপাদন বৃদ্ধির পরামর্শ দেন। কারণ উৎপাদন বাড়লে শুধু দেশ নয় শ্রমিক ও মালিক সবাই উপকৃত হবে। তিনি উদ্বৃতি দিয়ে বলেন ৬৯ সালে সরকার শ্রমিকদের বেতন মাসিক ৮৫ টাকার স্থলে ১২৫ টাকা বৃদ্ধি করেছে। তিনি বাইরের কোন শক্তি পাকিস্তানের কোন সংহতি ও অখন্ডতা বিনষ্ট করতে সক্ষম হবে না বলে দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন। ভারতের তথাকথিত বাংলাদেশ প্ররোচনার সম্পর্কে মেঃ জেঃ ফরমান আলী ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষতি না করে পশ্চিম পাকিস্তানের স্বাধীনতাকে আহ্বান জানান। রাজাকাররা খালিশপুর শিল্পাঞ্চলে অবাঙালিদের সাথে হাত মিলিয়ে বাঙালি হত্যায় নামে। স্বাধীনতার পর খালিশপুরের অনেক স্থানে এবং সেফটি ট্যাংকের মধ্যে থেকে মানুষের হাড় গোড় উদ্ধার হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক লেঃ জেঃ আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী খালিশপুরের একটি রাজাকার ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। তিনি প্রতিপক্ষকে প্রতিহত করতে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাজাকারদের কঠোরভাবে অভিযান চালানোর নির্দেশনা দেন। পকিস্তানীদের আশ্রয় স্থল ছিল খালিশপুরের অবাঙালিরা। সে কারণেই স্বাধীনতার ঊষালগ্নে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী সার্কিট হাউস থেকে সদর দপ্তর গুটিয়ে নিউজপ্রিন্ট মিলে এসে আস্তানা গাড়ে।
সর্বশেষ শহিদ : একাত্তরের ১৭ ডিসেম্বর পূর্ব গগনে সূর্য ওঠার আগেও খুলনায় তুমুল যুদ্ধ চলছে। গল্লামারী ও শিরোমনিতে দুই পক্ষের মরণপণ যুদ্ধ। পূর্ব পাকিস্তান নামক ভূ-খন্ডের মৃত্যু হয়েছে ১৬ ডিসেম্বর। এ খবর জানতে পেরেও খুলনার সামরিক বাহিনী আত্মসমর্পণে রাজি হয়নি। সূর্য ওঠার পরপর গল্লামারী এলাকার গোলাগুলির শব্দ বন্ধ হয়ে যায়। চারিদিক থেকে মুক্তিযোদ্ধারা জয়বাংলা শ্লোগান দিয়ে রাস্তায় নামে। তখনও পর্যন্ত শিরোমনি যুদ্ধ চলছে। টুটপাড়া ও শিপইয়ার্ড সেনা ছাউনীতে পাকিস্তানী সেনারা আত্মসমর্পণ করেছে। এমন আনন্দের খবরে খুলনা শহরবাসী সর্বস্তরের নারী-পুরুষ রাস্তায় নামে। চারিদিকে বিজয় উল্লাস। ভোর হওয়ার সাথে সাথে এটিএম আমিনুল ইসলাম মোটরসাইকেল চেপে সারা শহর ঘুরে বেড়ালেন। তিনি স্টীমার টার্মিনাল আরটিপি এর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দোলখোলা বাজার সংলগ্ন বাসা থেকে একটি পতাকা হাতে নিয়ে বের হলেন স্টীমার ঘাটস্থ কর্মস্থলের দিকে। তিনি দূর থেকে দেখতে পান আইডব্লিটিএ টার্মিনাল ভবনের উপরে পাকিস্তানের পতাকা উড়ছে। বিজয়ের আনন্দ নিয়ে এই পুলিম কর্মকর্তা পতাকা হাতে ছুটে গেলেন টার্মিনাল ভবনের দিকে। তিনি টার্মিনাল ভবনে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দিলেন। একজন সিপাহীর কাছ থেকে রাইফেল কেড়ে নিয়ে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়লেন। তারপর পতাকাকে অভিবাদন জানালেন। টার্মিনালের কাছাকাছি পাকিস্তান বাহিনীর একটি ইউনিটের সদস্যরা পুলিশ কর্মকর্তা আমিনুল ইসলামের গতিবিধি লক্ষ্য করেন। একপর্যায়ে পাকবাহিনী আমিনুল ইসলামকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। তিনি মুখ থুবড়ে পড়ে যান। সার্কিট হাউসে তখনও বাংলাদেশের পতাকা উড়েনি। বিজয়ের পরও সর্বশেষ শহিদ হলেন আমিনুল ইসলাম। মুক্তিযোদ্ধারা এ খবর পেয়ে ১৭ ডিসেম্বর বেলা ১১টা নাগাদ সার্কিট হাউসে তার লাশ নিয়ে আসে। টুটপাড়া কবরখানায় তার দাফন সম্পন্ন হয়। তিনি যশোর জেলার অভয়নগর থানার নাউলী গ্রামের সন্তান। তার ৭ সন্তান। পরিবার পরিজন ২নং ইসলামপুর ক্রস রোডে বসবাস করছেন। তিনি সত্তরের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য এড. মোঃ এনায়েত আলীর নিকট আত্মীয় (অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা সিন্দাইনী রচিত শহিদ এটিএম আমিনুল ইসলাম)।####
 

 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

বাঙলার বৈশাখ : বাঙালির বৈশাখ

বাঙলার বৈশাখ : বাঙালির বৈশাখ

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৪৯

বর্ষবরণ-১৪২৫

বর্ষবরণ-১৪২৫

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৫২

বাংলা পঞ্জিকা ও বাংলার আবহাওয়া

বাংলা পঞ্জিকা ও বাংলার আবহাওয়া

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৫০






বৈশাখে দেশী মজাদার খাবার

বৈশাখে দেশী মজাদার খাবার

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৪৫

নতুনের আহ্বান

নতুনের আহ্বান

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৪৫

বোশেখ 

বোশেখ 

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৪৫

বৈশাখের আমেজ

বৈশাখের আমেজ

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৪৪


ব্রেকিং নিউজ



যে কারণে রোজা নষ্ট হয় 

যে কারণে রোজা নষ্ট হয় 

২১ মে, ২০১৮ ০০:৫৯

যে কারণে রোজা নষ্ট হয় 

যে কারণে রোজা নষ্ট হয় 

২১ মে, ২০১৮ ০০:৫৯