খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১৬ অগাস্ট ২০১৮ | ১ ভাদ্র ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

খুলনায় ভাষা আন্দোলন-১৯৫২

মুহাম্মদ আব্দুল হালিম | প্রকাশিত ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ০১:১৬:০০

১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের পর মনে হয়, সমস্ত কিছু নীরব হয়ে গেছে। “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” এর শ্লোগান স্তিমিত হয়ে পড়লো। কিন্তু সরকারি পর্যায় ভাবনা চিন্তা চললো দ্রুতালয়ে। একবার যখন বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উঠেছে, তখন একে যে করেই হোক চাপা দিতে হবে। আঁতুড়েই ধ্বংস করতে হবে এ দাবি। রাষ্ট্রের শাসন যন্ত্রে অধিষ্ঠিত মুসলীম লীগ নেতৃবৃন্দ রাতের আরামকে হারাম করে উঠে পড়ে লেগে গেল বাঙালিদের পাকিস্তানি বানাতে। পাকিস্তান আর্মিতে চালু করে দেয়া হল রোমান হরফে উর্দূ লেখা, আর উর্দূই হল সেনাবাহিনীর ভাষা, সেখানে বাংলার কোন স্থান নাই। সেনাবাহিনীতে বাঙালির সংখ্যা একেতো কম তার উপর সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট, সদ্য রিক্রুটেড স্বল্প শিক্ষিত বাঙালি যুবকদের উচ্চ পদস্থ পশ্চিম পাকিস্তানিরা যেভাবে তালিম দিচ্ছে তাই সই। সেনাবাহিনীর কাজও তাতে চলছে ভালভাবে বিশেষ করে আর্মি সংক্ষিপ্ত রোমান হরফে লিখিত উর্দূভাষা, বাঙালি সিপাহীরা শিক্ষিত পাঞ্জাবী সিপাহীদের চেয়ে দ্রুত শিখতে পারছে। পাঞ্জাবী অফিসাররা তার জন্য বাঙালিদের বাহ্বা দিতে কার্পণ্য করছে না। অসামরিক শাসন যন্ত্রে অধিষ্ঠিত কর্মকর্তারা সামরিক বাহিনীর দেখাদেখি পূর্ব বাংলার রোমান হরফে বাংলা লেখার প্রচলন করার চিন্তা ভাবনা করতে থাকেন। চিন্তার সংগে কাজও চালু করেন। রোমান হরফে বাংলা লিখে কয়েকখানা পুস্তিকা ছেপে ফেলেন এবং আদালতে কিভাবে চালু করা যায়, তার চিন্তা ভাবনা চলতে থাকে।
বাংলাভাষার দরদী বাঙালি নেতারা ধরে নিয়েছেন রাষ্ট্রভাষা বাংলাতো হচ্ছেনা তার পরিবর্তে যদি বাংলাকে দেশের একটি আঞ্চলিক জাতীয় ভাষা বা ন্যাশনাল ল্যাংগুয়েজ করা যায় সেটিও মন্দের ভাল। ইতিমধ্যে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত কয়েকজন বাঙালি কর্মকর্তারা (যার মধ্যে জাতীয় গণপরিষদের স্পীকার মৌলভী তমিজউদ্দিন খানের নাম শোনা গিয়েছিল) উর্দূকে নেগেটিভ উপায়ে ঠেকাবার জন্য গোপনে গোপনে আরবীকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করেন। তাদের বক্তব্য এক. পাকিস্তান যখন আরবীকে রাষ্ট্রভাষা করা উচিত, দুই. পাঞ্জাবী, সিদ্ধি বেলুচীদের চেয়ে বাঙালিরা দ্রুত সুবিধা অসুবিধা সবার কাছে সমান হবে ইত্যাদি। এ দাবির পিছনে আরও অনেক যুক্তি ছিল কিন্তু বাস্তব ভিত্তি ছিল কিনা সন্দেহ। এ দাবি ছিল ‘নিজের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গ গোছের’। কোত্থেকে এ দাবি উঠেছিল ঐ সময় তা না জানলেও কলেজে কলেজে ছাত্ররা মিটিং করে এই মর্মে রেজ্যুলেশন করে পাঠিয়েছিল। রাজশাহী কলেজ থেকেও অনুরূপ রেজ্যুলেশন করেছিলাম। এসব ১৯৪৮ থেকে ১৯৫১ সালের প্রথমার্ধের ব্যাপার। ১৯৫০ সালে পাক-ভারতের উভয় জায়গায় অনেকগুলি জঘন্যতম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়। হাজার হাজার নিরীহ হিন্দু-মুসলমান নিহত ও গৃহহারা হয়। তার জন্য সমস্ত দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং দেশবাসী সাম্প্রদায়িক চিন্তায় মোহাচ্ছন্ন থাকে। হিন্দুদের দেশত্যাগ মুসলমানদের আগমন। এছাড়া দেশবাসীর আর কোন চিন্তা ছিলনা। সুতরাং ভাষার দাবিও চাপা পড়ে। ১৯৫১ সালের অক্টোবর মাসে পাকিস্তানের প্রতাপশালী প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান রাওলপিন্ডির জনসভায় আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। গভর্নর জেনারেল খাজা নাজিমউদ্দিন সর্বোচ্চ পদ ত্যাগ করে প্রধানমন্ত্রী হলেন। খাজা সাহেবের ক্ষমতায় আসার পূর্ব থেকে বাংলা ভাষার পক্ষে কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে পুনরায় গুঞ্জন শুরু হয় এবং তার ক্ষমতায় আসার পর আন্দোলনের একটি নির্দিষ্ট রূপ নিতে থাকে ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের প্রকাশ অধিবেশনে।
ঢাকার পল্টন ময়দানের জনসভায় পাকিস্তান মুসলীম লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন তার উত্তরসুরী কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সুরে সুর মিলিয়ে ঘোষণা দিলেন উর্দূই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা অন্য কোন ভাষা নয়, খাজা নাজিম উদ্দিনের প্রকাশ্য ঘোষণা ছাইচাপা আগুন উসকে দিল। শুরু হয় সক্রিয় আন্দোলন এবং চরমে পৌঁছে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি।
প্রধানমন্ত্রী নাজিমউদ্দিনের বক্তৃতার পর কয়েকদিন মিছিল মিটিং ধর্মঘটের পর আব্দুল মতিনের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেট ল্যাংগুয়েজ কমিটি ও মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্র“য়ারি সারা দেশে বাংলা ভাষার দাবির পক্ষে হরতাল ও মিটিং করার আহ্বান জানায়। খুলনায় সে আবেদন পৌঁছায় কিন্তু তৎকালীন নেতৃবর্গ কেউ এগিয়ে আসেন না। জনাব এমএ গফুর তখন ছাত্র জীবনের শেষ পর্যায়। থাকেন মিউনিসিপ্যাল পানির ট্যাংকের বিপরীত দিকে যশোর রোড ও সারদা বাবু রোডের (বর্তমান আহসান আহমেদ রোড) সংযোগ স্থলে কাঁচা ড্রেনের উপরে সেনহাটির শচীন সেনের জীর্ণ একতলা বাড়ির একটি কামরায়। বাড়িটি পরিত্যক্ত বললেও চলে। এখন সেখানে সৈয়দ সালাউদ্দিনের সংগঠন ও সমাজসেবা করেন। পাশের কামরায় একে সামসুদ্দিন “আজাদ গ্রন্থালয়” নামক একটি ছোট লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করে চালাচ্ছেন। সেখানে পাড়ার ছেলেরাতো বটে দু’চার জন বয়স্ক ব্যক্তিও বই, খবরের কগজ পড়তে আসেন। কিশোর সুনু মিয়া ইতিমধ্যে পাড়ার মুরব্বীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ২১ ফেব্র“য়ারি কর্মসূচি পেয়ে এমএ গফুর, সুনু মিয়া ও ছাত্রনেতা তোফাজ্জেল হোসেনকে নিয়ে আলোচনায় বসে ভাবছিলেন কি করা যায়। ‘১৮ তারিখে’ তিন জনের আলোচনা। এমন সময় এমএ বারী এসে পৌঁছান, ঐ চারজন মিলে সাব্যস্ত করেন শহরব্যাপী পোস্টারিং ও স্কুল কলেজে ধর্মঘট করার, পোস্টার তৈরীর কাগজ চাই, কলম চাই, লেখার লোক এবং এসব গোপন রাখতে হবে সরকারের নজর থেকে। ক্লাবে ছিল কয়েকখানা খবরের কাগজ। সুনু মিয়া যোগাড় করল আরও কয়েকখানা। দু’আনা দিয়ে আলতা কেনা হলো এক শিশি, বাঁশের চটায় ন্যাকড়া পেচিয়ে তৈরী করল তুলি। তাই দিয়ে ওরা ১০০ খানার মত পোস্টার লিখে ফেলল এবং ২০ তারিখের সন্ধ্যায় রাতের অন্ধকারে যশোর রোড, কেডি ঘোষ রোড ও স্কুলগুলোর দেওয়ালে আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিল। পরদিন ঐ চারজনসহ আরও কয়েকজন স্কুলে স্কুলে গিয়ে ক্লাস বর্জনের আহ্বান জানায়। বিকে মডেল ও সেন্ট যোসেফের ছেলেরা হরতাল করে ও মিছিলে যোগ দেয় কিন্তু জিলা স্কুলে কোন হরতাল হয় না। ঐদিনের প্রোগ্রাম ওখানেই শেষ। স্কুলগুলোর কোন রকম সাড়া পেলেও বৃহৎ শহরবাসীর মনে বিশেষ কোন দাগ কাটেনি। দৌলতপুর কলেজে মিজানুর রহিম, জাহিদুল হক, নুরুল ইসলাম নান্নু, মালিক আতাহার প্রমুখের নেতৃত্বে পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। পরদিন ২২ ফেব্র“য়ারি শোনা গেল ঢাকায় মিছিলের উপর গুলি হয়েছে এবং অনেক ছাত্র মারা গেছে। ঢাকা খুলনার একমাত্র যোগাযোগ পুলিশ লাইনে রক্ষিত ওয়্যারলেসের মাধ্যমে ঢাকার সরকারি কর্তৃপক্ষ ঢাকার গুলি হওয়া ও কিছু ছাত্রের মৃতজনিত উক্ত পরিস্থিতি উল্লেখ করে জেলা কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়। ঐ সংবাদ একজন ওয়্যারলেস অপারেটরের মাধ্যমে খুলনা শহরে দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে। এ সংবাদ পাওয়ার পর যুবনেতা ও কর্মী আবু মুহম্মদ ফেরদৌস, এসএমএ জলিল ও নুরুল ইসলাম, গফুর সাহেবের আস্তানায় হাজির হন এবং আন্দোলনে গফুর সাহেবের প্রচেষ্টাকে সহায়তা করার জন্য এগিয়ে আসেন। ওদের দেখাদেখি দল ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে বিশেষ করে মুসলিম ছাত্রলীগ তথা মুসলিম লীগের একজন নাম করা প্রতিষ্ঠিত যুবনেতা আবু মুহম্মদ ফেরদৌস এসে আন্দোলনের গতি অনেক সজীব করে দেয়। ওখানেই বসে সিন্ধান্ত নেয় আগামীকাল বিকেলে প্রতিবাদ সভা, হরতাল ও মিছিল করতে হবে। এর জন্য যেসব প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন তাও করতে হবে। ঐদিন ২১ ফেব্র“য়ারি সিগারেট ও ঈড়হফবহংব সরষশ এর ১০টা কৌটা যোগাড় করে কাগজ দিয়ে মুখ বন্ধ করে মিটিংয়ের খরচের জন্য রোড কালেকশনে বেরোয়। রাস্তায় দোকানে যেখানেই গেছে সেখানেই কেউ ফিরিয়ে দেয়নি। এক পয়সা, দু’পয়সা থেকে ১ আনা ২ আনাও দিয়েছে। ২ ঘন্টার মধ্যে কৌটা বোঝাই। সেদিন ভাষা আন্দোলনের পক্ষে সমস্ত খুলনাবাসী। ঐ টাকা দিয়ে হেলাতলার মোড়ের ক্ষেত্র ঝালাইকারের কাছ থেকে কেরোসিনের টিনের ৪টা চোঙ্গা কিনে লেগে যায় জনসভার প্রচারে। দিনভর প্রচার চালায় এবং সঙ্গে সঙ্গে আরেকদল পোস্টার লিখতে থাকে এবং দেওয়ালে লাগিয়ে দেয়। পাকিস্তান হওয়ার পর ঐ দিনই প্রথম দিনের বেলা প্রকাশ্যে সরকার বিরোধী পোস্টার লাগানো হয়। এর পূর্বে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কিছু বলা বা করা সম্ভব হয়নি। ঐদিন পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। রিক্সাচালক ও দোকানদারগণ তাদের দোকান পাট বন্ধ রাখে। প্রায় দেড়দিন ধরে প্রচার চলে রাস্তায় ও বাজারে। পাড়ায় পাড়ায় একই আলোচনা-একি কান্ড? দিন দুপুরে গুলি করে হত্যা। এমন কান্ড কেউ শুনেছে? খুলনা শহরে যেন আবেগে উদ্বেলিত হয়ে পড়ে। পরদনি ২৩ তারিখ বিকেলে গান্ধী পার্কে ঐ চোঙ্গা দিয়েই জনসভা করা হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ওটাই ছিল ক্ষমতাশীল মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে প্রথম বৃহত্তম জনসভা ঐ দিনকার মিটিংয়ে সভাপতিত্ব করেন এমএ গফুর। বক্তৃতা করেন, আবু মুহম্মদ ফেরদৌস, আলতাফ খান ও আরও দু’একজন। সভায় সিদ্ধান্ত হয় বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। ছাত্র হত্যার বিচার চাই ও নুরুল আমিনের পদত্যাগ চাই ইত্যাদি। গান্ধী পার্কের সফল জনসভার পর আরও অনেক কর্মী ও ছাত্রনেতা এগিয়ে আসে ও আন্দোলনকারীদের সাথে যোগ দেয়। এদের মধ্যে খন্দকার আব্দুল হাফিজ, মিজানুর রহিম, জাহীদুল হক, মালিক আতাহার, নুরুল ইসলাম নান্নু, প্রভৃতির নাম উল্লেখযোগ্য। খন্দকার আব্দুল হাফিজ প্রগতিশীল চিন্তা ধারার লোক হলেও মুসলিম লীগনেতা এসএমএ মজিদের আত্মীয় এবং তার বাড়িতে থাকায় মজিদ সাহেবের দ্বারা প্রভাবান্বিত হন ও মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত ‘প্রবাহ’ নামক একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। কিন্তু ভাষা আন্দোলন তাকে পূর্ব মতাদর্শে ফিরিয়ে আনে। মিজানুর রহিম ও অহিদুল হক ছিলেন ছাত্র এবং মার্কসীয় লাইনে সবে চিন্তা ভাবনা শুরু করেছেন।
ঐদিন রাত্রেই ঢাকা থেকে খবর আসে জেলায় ও মহাকুমায় সর্বস্থানে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করার ও আন্দোলন চালিয়ে যাবার। সংগ্রাম কমিটির নির্দেশ পাওয়ার পরে উপস্থিত কয়েকজন মিলে ২৫ তারিখ হরতাল ঘোষণা করে। প্রচার লাইব্রেরির মধ্যে বসে সংগ্রাম কমিটি নিম্নলিখিত এগারোজনকে নিয়ে গঠন করা হয়। পরবর্তীতে আরো ৫ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গঠিত সংগ্রাম কমিটিতে এমএ গফুর আহবায়ক এবং সদস্যরা ছিলেন যথাক্রমে- আবু মুহম্মদ ফেরদৌস, এসএমএ জলিল, নুরুল ইসলাম নুরু, এমএ বারী, একে সামসুদ্দিন (সুনু) আলতাফ হোসেন খান, খন্দকার আব্দুল হাফিজ, জাহিদুল হক, মিজানুর রহিম ও খন্দকার এনামুর রহমান।
২৫ ফেব্র“য়ারি সারা পূর্ব বাংলার মত খুলনা শহরে হরতাল পালিত হয় এবং বিকেলে গান্ধী পার্কে আর এক বিরাট জনসভা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন খন্দকার হাফিজ। বক্তৃতা করেন এমএ গফুর, আবু মুহম্মদ ফেরদৌস, আলতাফ খান ও এমএ বারী এবং আরও কয়েকজন। ২৫ তারিখের জনসভার ফলশ্র“তি হিসেবে শহরের পার্শ্ববর্তী এলাকায়ও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে দৌলতপুর কলেজ ছাত্রনেতা মিজানুর রহিমের নেতৃত্বে আন্দোলনের শক্ত ঘাটিতে পরিণত হয়। ছাত্র-কর্মীগণ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে মফঃস্বল অঞ্চলের স্কুলে স্কুলে গিয়ে আন্দোলনের বক্তব্য পেশ করতে আরম্ভ করে। ইতিমধ্যে ২৬ কি ২৭ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি কর্তৃক নিযুক্ত অন্যতম ছাত্রনেতা কাজী নুরুল ইসলাম খুলনায় এসে সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ ও কর্মীদের সাথে ঢাকার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর এক লোমহর্ষক বর্ণনা দেন। উপস্থিত কর্মীবৃন্দ আবেগে মোহিত হয়ে পড়েন এবং আন্দোলনের সফলতার জন্যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। কাজী নুরুল ইসলামের উপস্থিতিতে কর্মীরা দ্বিগুন উৎসাহে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং আন্দোলনের গতিধারা সংগ্রাম পরিষদের নিয়ন্ত্রণে শৃঙ্খলার সাথে পরিচালিত হতে থাকে।
কাজী নুরুল ইসলাম খুলনায় আসার পর সংগ্রাম কমিটিতে আরও ৫ ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় (তাদের নাম সংগ্রহ করা যায়নি) এবং সংগ্রাম কমিটির আহ্বানে ২৮ তারিখে গান্ধী পার্কে আর একটি বৃহৎ জনসভা হয়, সভায় সভাপতিত্ব করেন কেএ হাফিজ। ঐদিনই খুলনার প্রধান সারির নেতাদের মধ্যে কয়েকজন জনসভায় ভাষণ দেন। অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন কাজী নুরুল ইসলাম, এমএ গফুর, আলতাফ খান প্রমুখ। ইতিমধ্যে খুলনার শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ এগিয়ে আসেন এবং কেউ কেউ সংগ্রাম পরিষদের সাথে জনসভায় যোগ দেন ও বক্তব্যও রাখেন। নেতৃবৃন্দের মধ্যে পরিষদকে যারা সমস্ত রকম সহানুভুতি, পরামর্শ ও সাহায্য করেন তাঁরা হলেন এএফএম আব্দুল জলিল, আব্দুল জব্বার, এএইচএম দেলদার আহম্মদ ও গোলাম শহিদ মোক্তার প্রমুখ। এদের মধ্যে দেলদার আহম্মদ ও আব্দুল জব্বার সংগ্রাম পরিষদের বিভিন্ন স্কুল কলেজে জনমত গঠন করার জন্য পাঠিয়ে দেন এবং কাজী নুরুল ইসলাম বাগেরহাটসহ প্রভৃতি স্থানে গিয়ে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন ও জনসভা করে সমস্ত জনতাকে আন্দোলনের সাথী করে তোলেন। খুলনা জেলায় তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। ঐ সময় বহু ছাত্র ও কর্মী সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে যোগ দেয়। তাদের সবার নাম এখন পাওয়া না গেলেও নুরুল ইসলাম নান্নু, মালিক আতাহার, সমীর আহম্মেদ প্রভৃতির নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।
যত সহজে আন্দোলনের গতিধারা বর্ণনা করা হলো তাতে সেদিনকার অবস্থা বোঝা যাবে না এবং আন্দোলনকারীদের সাথে আরও যে সমস্ত ব্যক্তি সহযোগিতা করেছিলেন তাদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় না দিলে প্রবন্ধটি অপূর্ণ থাকবে বলে মনে করি। ঐ সময় মুসলমানী জোশে সৃষ্ট পাকিস্তান ও তার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কথা বলা যে কত কঠিন ছিল আজ আর তা উপলব্ধি করাও যাবে না এবং আন্দোলনকারীদের অভিভাবকেরাও ছিলেন তাদের বিরুদ্ধে। আন্দোলনের প্রথমদিকে যিনি সাহায্য ও সহযোগিতা করেছিলেন তিনি হলেন ‘মডেল’ স্কুলের শিক্ষক কাম কেরানী খন্দকার এনামুর রহমান ওরফে এনাম মাস্টার। আন্দোলনের মূল ঘাটি গফুর সাহেবের আস্ত ডানার পাশের বাড়িতে সপরিবারে বসবাস করতেন। বাড়ি যশোর জেলায়, প্রথম জীবনে কৃষক প্রজা পার্টির অন্যতম সংগঠক নেতা সৈয়দ নওশের আলীর সমর্থক ছিলেন কিন্তু পরে পাকিস্তান আন্দোলনে পাকিস্তানের পক্ষে যশোর জেলার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তার মত একজন অভিজ্ঞ বৈষয়িক কর্মীর সক্রিয় সাহায্য পেয়ে কর্মীদের মনোবল অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে তিনি ছিলেন প্রাথমিক অবস্থায় আন্দোলনের অলিখিত ট্রেজারার। পোস্টার লেখার সাজ-সরঞ্জামসহ আদায়কৃত টাকা পয়সা তাঁর বাড়িতে জমা থাকতো এবং তাঁর বাড়িতেই হতো কর্মীদের গোপন বৈঠক। সে সময় অভিভাবকেরা সবাই পাকিস্তানের নামে মাতোয়ারা। কর্মীরা আন্দোলনে ভীত ও সন্ত্রস্ত। সেখানে তিনি কর্মীদের বুদ্ধি ও পরামর্শ দিয়ে উজ্জীবিত রেখেছিলেন। পরে ২৪ তারিখে গঠিত সংগ্রাম পরিষদের একজন সদস্য নির্বাচিত হন। বাইরে থেকে যিনি পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেন তিনি হলেন মুসলিম লীগের নেতা ও সাহিত্যিক এএফএম আব্দুল জলিল। তিনি সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে না নামলেও সময়মত বুদ্ধি, পরামর্শ ও উৎসাহ যোগাতেন। সংগ্রাম কমিটির অন্যান্য ব্যক্তিদের মধ্যে পরবর্তীতে এমএ বারী, আওয়ামী লীগের অন্যতম নেতা স্বাধীনতা সংগ্রামের যোদ্ধা এবং ১৯৭৩ সালে খুলনার এমপি। নুরুল ইসলাম প্রথম ন্যাপ ও পরে বিএনপি’র নেতা। এসএমএ জলিল ও মিজানুর রহিম ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে চাকুরি নিয়ে ও ভাষানী ন্যাপ ও অন্যান্য প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে জড়িত থাকেন, পরে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে যান। আবু মুহম্মদ ফেরদৌস ও একে সামসুদ্দীন এখনও রাজনীতিতে মোজাফফর ন্যাপের নেতা হিসেবে খুলনার প্রতিটি বামপন্থি আন্দোলনের সাথে জড়িত আছেন। আলতাফ হোসেনের বাড়ি দৌলতপুর এককালে কমিউনিস্ট পার্টি করতেন। বর্তমানে রাজনীতির সাথে তার কোন যোগাযোগ নেই। জাহিদুল হক ছিলেন দৌলতপুর কলেজের ছাত্র এবং জনৈক ইনকাম ট্যাক্স অফিসারের পুত্র। প্রথমে করাচীর ডন পত্রিকায় সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এখন গণচীন সাংবাদিকতা কাজে নিয়োজিত আছেন বলে প্রকাশ, খন্দকার আব্দুল হাফিজ নড়াইলে ওকালতি শুরু করেন। সেখানকার আওয়ামী লীগের কর্মকর্তা ও এমএনএও স্বাধীনতা আন্দোলনের মুক্তিযোদ্ধা। খন্দকার এনামুর রহমান অনেকদিন ‘মডেল’ স্কুলে চাকুরি করেন ও পরে ঠিকাদারী করেন। কাজী নুরুল ইসলাম বর্তমানে একজন সুপ্রতিষ্ঠিত সরকারের উচ্চপদস্ত কর্মচারী। সমীর আহমেদ কলকাতার আদি বাসিন্দা। সপরিবারে খুলনায় আসেন, লেখাপড়া ও ব্যবসা একই সাথে চালাতেন। ভাষা আন্দোলনের কর্মীরা তাঁর ওখানে আড্ডা দিত যার ফলে তিনিও আন্দোলনের সাথে একাত্ম হয়ে যান। যার জন্য এক সময় মুসলিম লীগের বিশেষ মহল তার দোকান পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। সমীর সাহেবের বাড়িতে সবাই উর্দূভাষী হলে তিনিই পাকিস্তানের পর ১৯৫২ সালে খুলনা থেকে ‘সবুজ পত্র’ নামে একখানি মাসিক সাহিত্য পত্রিকা বের করেন। পরপর কয়েক সংখ্যা বের করার পর পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। পাকিস্তানের পর খুলনায় এটা সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে স্মরণযোগ্য। সমীর সাহেব স্কুলে ধর্মঘট করানো থেকে শুরু করে ঢাকা থেকে আগত মর্নিং নিউজ ও আজাদ পত্রিকা পোড়ানো পর্যন্ত সবরকম আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। বর্তমানে তিনি খুলনা শহরের একজন সফল ব্যবসায়ী।
৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন এমএ গফুর পাইকাগাছা থানার হড্ডে (হরিনগর) গ্রামের নিম্ন মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের সন্তান। কিন্তু খুলনায় ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৭১ সালের সশস্ত্র সংগ্রাম পর্যন্ত এমন কোন গতিশীল আন্দোলন ছিলনা যেখানে তিনি কোন না কোনভাবে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন গণতন্ত্রী দলের খুলনা জেলা শাখার প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারী। ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ন্যাপের জেলা সম্পাদক। ১৯৬২ সালে গঠিত পিডিএম (পাকিস্তান ডেমোক্রেটিভ মুভমেন্ট) এবং ১৯৬৪ সালে গঠিত ‘কপ’ এর জেলা কমিটির অন্যতম আহবায়ক। ১৯৬৭ সালে ন্যাপ বিভক্তির পর মোজাফফর ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক। ১৯৬৯ সালের শেষের দিকে আওয়ামী লীগে যোগদেন এবং ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে পাইকগাছা-আশাশুনি কেন্দ্র থেকে রেকর্ড ভোটে খান-এ-সবুর সাহেবকে পরাজিত করে এমএনএ নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৭১ সালে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়েন এবং স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে শত্র“ বিতাড়িত করার সহায়তা করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যখন অন্যান্য নেতারা শহরে বা রাজধানীতে বসে মন্ত্রী হওয়ার জন্য বা নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত, তখন তিনি নিজ এলাকার নোনাপানি ঠেকাতে বাঁধবন্দী করতে ব্যস্ত। এমতাবস্থায় ১৯৭২ সালের ৬ জুন শাহাপাড়া গ্রামের কপোতাক্ষ তীরে বন্দুকধারী নকশালদের গুলিতে নৃশংসভাবে নিহত হন। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর বিচার পর্যন্ত হয়নি। আর তাঁর সংগ্রামের স্বীকৃতি দিবে কি?
১৯৫২ সালের আন্দোলনের আরো কয়েকটি ঘটনা ও সেদিনকার খুলনার পরিবেশ ও পরবর্তী ঘটনার উল্লেখ না করলে প্রবন্ধটি অসম্পূর্ণ থাকবে বলে মনে করি।
‘৫২’ এর ভাষা আন্দোলনের পর জনসাধারণের আবেগ কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়লে সরকার আক্রমণাত্মক ভূমিকা গ্রহণ করে। তার সাথে মুসলিম লীগনেতা যোগ দিয়ে আন্দোলনের কর্মীদের নানাভাবে হয়রানি করতে থাকে। ঐ সময় সুনু মিয়ার লাইব্রেরিতে সরকার বিরোধী অনেকগুলি হাতে লেখা পোস্টার সিজ করে দেশদ্রোহীতার অভিযোগে আবু মুহম্মদ ফেরদৌস, নুরুল ইসলাম, এসএমএ জলিল, এমএ বারী, একে সামসুদ্দিন সুনু ও তোফাজ্জেল হোসেনের বিরুদ্ধে এক ফোজদারী মোকদ্দমা দায়ের করে এবং উক্ত মামলায় কয়েজকনকে গ্রেপ্তার করে আটক রাখে। আবু মুহম্মদ ফেরদৌস ও নুরুল ইসলাম ঐ ঘটনার পূর্বে যুগলীগের সভায় ওরিয়েন্ট এয়ার ওয়েজ যোগে ঢাকা যাওয়ায় এবং সে টিকেট তাদের থাকায় ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট থেকে জামিন পান কিন্তু এমএ বারী ও তোফাজ্জেল দিগের জামিন না মঞ্জুর হয়, পরে জজ কোর্ট থেকে তারা জামিন পান।
ঐসব মামলায় জামিন মুভ করার সময় খুলনা বারের অনেক উকিল আঃ হাকিম, আব্দুল জব্বার, এএফ আব্দুল জলিল, সৈয়দ মোস্তাগাউসুল হক প্রমুখ এবং মোক্তারদের মধ্যে জনাব আব্দুল ওহাব, গোলাম সাইদ, প্রমুখ ব্যক্তিগণ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে আসামিদের পক্ষে ওকালতি করতেন। পরবর্তীতে ঐ মামলা ডিসমিস হয়ে যায়। ঐ সময়ে খুলনার কংগ্রেসদলীয় এমপিএও বিরোধী কংগ্রেস দলের ডেপুটি চিফ হুইপ গোবিন্দ বাডুজ্যেকে ২৩ ফেব্র“য়ারি ঢাকায় গ্রেফতার করে বহুদিন পর্যন্ত হাজতে আটক রাখে। দেলদার সাহেব তখন সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর। জনসভায় বক্তৃতা দেওয়ার জন্য ডিএম কামরুল ইসলাম কৈফিয়ত তলব করার ভাষায় বলেন- আপনি সরকারি এপিপি, কিভাবে জনসভায় সরকারের বিরুদ্ধে বক্তৃতা করেন। দেলদার সাহেব সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেন ‘ইটস মাই প্রাইভেট অ্যাফিয়ার্স। আই এ্যাম নট এ্যানসারেবল টু মাই ক্লায়েন্ট’ কামরুল ইসলাম পুনরায় বলেন- ইউ শুড হ্যাভ রিজাইন বিফোর স্পিকিং। দেলদার সাহেবও কম যান না- ‘আই এ্যাম নট এ্যাপলাইড ফর দি পোস্ট, সো কোশ্চেন অব রেজিগনেশন ডাজ নট এ্যারাইজ; এই রকম ছিল সেদিনকার কর্মী ও নেতাদের মনোবল ও স্যাক্রিফাইসিং এ্যাটিচিউড।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও প্রাদেশিক মুসলিম লীগ দলের মধ্যে রেশারেশী পূর্বাপর চলতে থাকে এবং নুরুল আমিনের মূখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর দলাদলি চরমে পৌঁছায়। খান-এ-সবুর সাহেবও তাঁদের দলের এসএমএ মজিদ, হাজী মোজাহার উদ্দীন, মোক্তার নজীর আহমেদ, মোক্তার নুরুল হক, এডভোকেট আমীর আলী খান, খান সাহেব সুলতান আহমেদ প্রভৃতি একদিকে। অন্যদলে এএফএম আব্দুল জলিল, আব্দুল হাকিম, দেলদার আহমেদ, মোস্তাগাউসুল হক, আবু মুহম্মদ ফেরদৌস প্রধান ভূমিকায় ছিলেন। দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছে ১৯৫০-৫১ সালের দিকে। সহজে কাজ না হলে সবুর সাহেবের দলীয় লোকেরা ডান্ডা দিয়ে ঠান্ডা করত বিরুদ্ধবাদীদের। ইতিপূর্বে জলিল সাহেবের উপর কয়েকবার হামলা হয়েছে। ‘৫১ সালের প্রথম দিক স্টেশন রোড ও ক্লে রোডের মোড়ে আবু মুহম্মদ ফেরদৌসকে হকিস্টিক দিয়ে মেরে রাস্তায় ফেলে রাখে। তিনি একমাস হসপিটালে থাকার পর রোগমুক্ত হন। ‘৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে খুলনার মুসলিম লীগ বিভক্তি পুরোপুরি সম্পন্ন হল। জলিল সাহেব, দেলদার সাহেব ভাষা আন্দোলন সমর্থন করায়, খান-এ-সবুর সাহেব দিগর নুরুল আমীনের আশীর্বাদ লাভ করেন এবং দেলদার সাহেব, জলিল সাহেবরা আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দেন।
খান-এ-সবুর সাহেব খুলনা মুসলিম লীগের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে সরকারের সাথে খুলনার ভাষা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে চরম ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আরম্ভ করেন। অবস্থা এমন এক পর্যায় পৌঁছে যে আন্দোলনকারীদের খুলনায় বসবাসই দায় হয়ে পড়ে। জুলাই মাসের মাঝামাঝি কাঠালতলার নিকটে (যশোর রোডে পানির ট্যাংকের দক্ষিণ পার্শ্বে) এমএ গফুরকে মুসলিম লীগের গুন্ডাবাহিনী মারাত্মকভাবে জখম করে ফেলে রাখে। ১৮ দিন হসপিটালে থাকার পর সুস্থ হন। ২৭ সেপ্টেম্বর ধর্মসভার কাছ থেকে একে সামসুদ্দিনকে গুন্ডারা ধরে নিয়ে সবুর সাহেবের ‘বিশ্রাম নিকেতনে’ আটকিয়ে রাখে, অপর একদিন এমএ বারী ও সুনু মিয়াকে ভৈরব স্ট্যান্ড রোডে গুন্ডারা হামলা করে, সুনু মিয়া পাড়ার অলিগলি দিয়ে বাড়িতে ফিরে আসে আর বারী নৌকা করে ওপার হয়ে সন্ধ্যাবেলা নতুন বাজার ঘাট হয়ে শহরে ফিরে আসে। ইতিমধ্যে আরও অনেকের উপর হামলা হয়, আবু মুহম্মদ ফেরদৌস কোন দিন সন্ধ্যার পর সোজা পথে বাড়ি ফিরতে পারতেন না। এরকম শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা চলে ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত। ৫৩ সালের ২১ ফেব্র“য়ারির মিছিলের উপর মুসলিম লীগের গুন্ডাবাহিনী আক্রমণ চালালে জনতা মারমুখী হয়ে কয়লাঘাটের সাউথ সেন্ট্রাল রোডে উল্টো আক্রমণে ওদের পর্যুদস্ত করে। সেদিন থেকে খুলনায় মুসলিম লীগের গুন্ডামী কমে যায়।
ঐ সময় ভাষা আন্দোলনে বা অন্য বামপন্থী আন্দোলনে যারা সরকারের কোপানলে পড়ে আসামি হয়ে জেল হাজতে আসতেন, তাদের পক্ষে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে ওকালতি করার জন্য যারা এগিয়ে আসতেন, তাদের মধ্যে জনাব আব্দুল জব্বারের নাম সর্বাগ্রে। তারপর এএফএম আব্দুল জলিল, আব্দুল হাকিম, এএইচ দেলদার আহমেদ, আব্দুল ওহাব ও গোলাম ছাইদ মোক্তার প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।
তখন ঢাকায় পত্রিকা বলতে ‘আজাদ’ ও ‘মর্নিং নিউজ’ এবং দু’টি পত্রিকা সরকারের একনিষ্ঠ সমর্থক। ভাষা আন্দোলনের খবরা খবর তারা খুব কমই ছাপাতো এবং খুলনার খবরতো মোটেই না। তখন কলকাতার প্রগতিশীল পত্রিকা সত্যযুগে খুলনার অনেক খবর প্রকাশিত হতো। তার কিছু নিম্নে দেয়া গেল।
‘সত্যযুগ’ কলকাতা ৮ মার্চ
ঢাকায় অন্ততঃ ৩০ জন নিহত
খুলনা ২ মার্চ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম ছাত্রনেতা মিঃ কাজী নুরুল ইসলাম খুলনায় এক জনসভায় বলিয়াছেন যে, ঢাকা মেডিকেল কলেজের রেজিস্ট্রার অনুসারে দুই দিনের পুলিশ জুলুমে অন্ততঃ ৩০ জন নিহত হইয়াছেন। তিনি বলেন, ঢাকায় যে বিয়োগান্ত নাটক হইয়া গিয়াছে, সংবাদপত্রে তাহার একাংশ মাত্র প্রকাশিত হইয়াছে। দুপুর রাত্রে সৈন্যরা হাসপাতালের মর্গ হইতে মৃতদেহগুলি চুপি চুপি সরাইয়া দিয়েছে।
অবিলম্বে নুরুল আমীন মন্ত্রী সভার পদত্যাগ ও পুলিশি অত্যাচার সম্পর্কে নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করিয়া সভায় প্রস্তাব গৃহীত হয়। ৫ মার্চ ‘শহীদ দিবস’ ঘোষণা করিয়া পূর্ণ হরতাল পালনের সিন্ধান্ত হইয়াছে। পূর্ববঙ্গে শহীদ দিবস খুলনায় শহীদ দিবস।
খুলনা, ৬ মার্চ- গতকল্য কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদের নির্দেশানুযায়ী ও স্থানীয় পরিষদের নির্দেশানুযায়ী স্থানীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ কর্তৃক শহীদ দিবস পালন করা হয়। ঐদিন জেলার সমস্ত স্কুল কলেজ, দোকান পাট এবং সর্বপ্রকার যানবাহন সম্পূর্ণ হরতাল পালন করে, বেলা তিন ঘটিকায় পার্ক হইতে বিরাট শোভা যাত্রা বাহির হইয়া সমস্ত শহর প্রদক্ষিণ করিয়া স্থানীয় পার্কের জনসভায় যোগদান করে। উক্ত সভায় সভাপতিত্ব করেন হাফিজ সাহেব, দেলদার আহমেদ, বিএল এড. আব্দুল জব্বার, ছাত্রনেতা কাজী নুরুল ইসলাম, প্রভৃতি বক্তৃতা প্রসঙ্গে সরকারের দমন নীতির তীব্র সমালোচনা করেন। বক্তৃতা প্রসঙ্গে নুরুল ইসলাম সাহেব সরকারের ভাওতা যে অযৌক্তিক তাহা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন যে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পিছনে কোন কমিউনিস্ট অথবা রাষ্ট্রবিরোধী হস্তক্ষেপ করিতেছে কিনা, তাহা জনসাধারণের ন্যায্য দাবি মানিয়া লইলেই বুঝা যাইত এবং তিনি আরও বলেন, বিশেষ করিয়া ছাত্র সমাজ রাষ্ট্র বিরোধীকার্যে লিপ্ত যে কোন ব্যক্তিকেই কঠোর হস্তে দমন করিতে প্রস্তুত আছে। সভায় কয়েকটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। ‘সত্যযুগ’ ৬ মার্চ ১৯৫১
খুলনা সংবাদ

 

বার পঠিত

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

বদলে যাবে মংলা বন্দর

বদলে যাবে মংলা বন্দর

০৩ জুলাই, ২০১৮ ০২:০১













ব্রেকিং নিউজ












হারে শেষ প্রোটিয়াদের লঙ্কা সফর

হারে শেষ প্রোটিয়াদের লঙ্কা সফর

১৬ অগাস্ট, ২০১৮ ০০:৫৭