খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

ভাষা আন্দোলন এবং তৎকালীন প্রেক্ষাপট

অ্যাডভোকেট এম. মাফতুন আহম্মেদ | প্রকাশিত ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ০১:০৭:০০

“ফেব্র“য়ারির একুশ তারিখ
দুপুর বেলায় অক্ত
বৃষ্টি নামে বৃষ্টি কোথায়?
বরকতের রক্ত
---প্রভাতফেরি, প্রভাতফেরি
আমায় নেবে সঙ্গে,
বাংলা আমার বচন
জন্মেছি এই বঙ্গে।”
সমকালীন বাংলা ভাষার প্রধান কবি আল মাহামুদের কবিতার মতোই আবেগ প্লাবনে বয়ে যাচ্ছে প্রতিটি বাংলাভাষী মানুষের হৃদয়ে অলিন্দে,ধমনীতে,দিনরাতের পালাবদলে, বছর ঘুরে আবার এসেছে অমর,অনিবাশী, অম্লান, অক্ষয় অমর ফেব্র“য়ারি মাস। ফেব্র“য়ারি মাস মানেই ভাষার মাস। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য সংগ্রামের মাস। এই মাসে ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে যেয়ে অনেক রক্ত দিতে হয়েছে। সংগ্রাম করতে হয়েছে। এই আন্দোলন সংগ্রামে এই শ্যামল বাংলায় কেউ গাজী হয়ে ফিরেছেন; কেউ শহীদ হয়েছেন। বীর শহীদ আবুল বরকত, শফিকুর রহমান,আব্দুস সালাম, আব্দুর জব্বার, রফিকুল ইসলাম সহ নাম জানা শত শত বীর শ্রেষ্ঠ শহীদী সন্তানরা লাল সবুজের পতাকায় আচ্ছাদিত শ্যামল বাংলায় শুয়ে আছেন; নীরবে, নিভৃত্বে। ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় যেসব বীর শ্রেষ্ঠ সন্তানরা আজও এই শ্যামল বাংলায় বেঁচে আছেন; তাদের প্রতি জানাই অকুণ্ঠ ভালবাসা। ফেব্র“য়ারি মাস প্রতি বছর আসে। বছর পরিক্রমায় এবারও ফিরে এসেছে। রক্তঝরা এ মাসকে সামনে রেখে আমরা কিছু লিখছি। সেমিনার সভা-সমাবেশে কিছু কথা তুলে ধরছি। দিনটি পালন করছি। তবে গতানুগতিক ধারায়। একটি জাতির গৌরব গাঁথা রক্তাক্ত এই স্মৃতি বিজড়িত দিনটি কী শুধু দিবস ভিত্তিক আলোচনা বা মিষ্ঠি বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধতা থাকবে? জাতি আজ অনেক কিছু জানতে চায়, আগামি প্রজন্ম অনেক কিছু শিখতে চায়। কেন বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে সেদিন ষড়যন্ত্র হয়েছিল? কেন সেদিন প্রতিক্রিয়াশীল শাসক গোষ্ঠি বাঙালির মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিলেন? কারা আমাদের অস্থিত্বকে সমূলে বিনাশ করতে চেয়েছিলেন? কী সূদূর প্রসারি ষড়যন্ত্র ছিল? ভাষা আন্দোলনের এই রক্তাক্ত ময়দানে কারা সেদিন নেতৃত্ব দিয়েছিলেন? সেদিন সংবাদপত্রের ভূমিকা কী ছিল? বাঙালি হয়ে স্ব-জাতির বিরুদ্ধে কারা বিভীষণের ভূমিকা পালন করেছিলেন? কারা ভাষার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছিলেন?
প্রত্যেক জাতির কিছু ইতিহাস থাকে, গৌরব গাঁথা দিবস থাকে। যাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে একটি জাতির সভ্যতা ও সংস্কৃতি। তাই ভাষা আন্দোলন আমাদের ইতিহাসের পাতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কারণ ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। তাই এই দিনের সত্যিকার নির্মোহ ইতিহাস জাতির মাঝে তুলে ধরা উচিত। এই গৌরবান্বিত জাতি আগামী প্রজন্মের জন্য কী ইতিহাস রেখে গেলেন? আর ইতিহাস থেকে তারা কী শিক্ষা নিলেন? এক তো আমরা আত্মভোলা একটি বিস্মৃত জাতি। সকালের খবর বিকেলে মনে রাখতে পারি না। যে জাতি যত ইতিহাস সমৃদ্ধ; সে দেশ ততবেশি উন্নত। ততবেশি সমৃদ্ধশালী। ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস বিকৃত হচ্ছে। প্রকৃত ইতিহাস বিকৃত করে অনেকে ব্যক্তি বন্ধনায় মেতে উঠেছে। সবাই ভাষা সৈনিক সাজার চেষ্টা করছেন। নানাভাবে ফায়দা নেয়ার চেষ্টায় অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন। এসব ইতিহাস বিকৃত ছাড়া কিছুই না। যুগে যুগে ইতিহাস এভাবে বিকৃত হয়ে আসছে। তবে এটাও সত্য যে প্রকৃত ইতিহাস কখনও বিকৃত হয় না। কারণ ইতিহাস একটি শ্রোতস্ব^নী নদীর মত। সত্য একদিন উদঘাটিত হবেই হবে।
বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে দীর্ঘ এক ষড়যন্ত্র
প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামের একটি ধারাবাহিকতা থাকে। এই ধারাবাহিকতাকে কেন্দ্র করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে আন্দোলন আজকের নয়। কোন কোন আন্দোলনে জনগণের সম্পৃক্ততা ঘটেছে। জন বিষ্ফোরণ ঘটেছে। আবার কোনটা ঘটেনি। এতটুকু পার্থক্য মাত্র। নানা জনের নানা মত। অনেকেরই ধারণা, ভাষা আন্দোলন ছিল উনিশশো বায়ান্নর একটি ঘটনা। আবার অনেকের মতে ভাষা আন্দোলন শুরু হয় উনিশশো আটচল্লিশে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম গভর্নর জেনারেল মুহম্মদ আলী জিন্নাহর উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণার প্রতিবাদে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে,আসলে কোনটা সত্য নয়। তাহলে পাঠকের মনে একরাশ প্রশ্ন এসে যায়, কোনটা আবার সত্য? কোন পটভূমিতে ভাষার আন্দোলন শুরু হয়েছিল? ইতিহাস এ বিষয়ে কী বলে? আসুন ইতিহাসের বাঁকে একটু ফিরে যাই।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে পাকিস্তান ও ভারত নামে দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। আজকের বাংলাদেশ তখন তদানীন্তন পূর্ববঙ্গ একটি প্রদেশ হিসেবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত। স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রভাষা যে হিন্দি হবে সে সিদ্ধান্ত ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আগেই ঘোষণা করা হয়। কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়ে যায়। অত:পর গোটা পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয়গত নানা অভিন্নতা বিশেষ করে মোগল, পাঠান, তুর্কীদের দীর্ঘ শাসনের ফলে ফার্সি এবং উর্দু ভাষার প্রাধান্যতা পায়। আজকের ইংরেজি ভাষার ন্যায় উর্দু ভাষাকে অনেকে আভিজাত্যের ভাষা হিসেবে মনে করতেন। বিশেষ করে প্রাচীনপন্থি ও আধুনিকপন্থি উভয় ধরণের শিক্ষা কেন্দ্র যথাক্রমে দেওবন্দ ও আলীগড়ের উর্দু অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় এ ভাষার প্রতি কিছুটা হলেও দূর্বলতা প্রকাশ পায়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বহু পূর্বেই ১৯৪৭ সালের ১৮ মে মজলিসে-ইত্তেহাদুুল মুসলিমিন-এর উদ্যোগে হায়দ্রাবাদে অনুষ্ঠিত উর্দু সম্মেলনে যুক্ত প্রদেশ মুসলিমলীগ নেতারা পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা উর্দু হবে বলে ঘোষণা করেছিলেন। দেশ বিভাগত্তোর লীগ নেতৃবৃন্দের বিশেষ করে পাকিস্তানের প্রশাসনে উর্দুভাষী সরকারি চাকুরেদের মধ্যে এই বাস্তবরূপ পরিলক্ষিত হয়।
এ কারণে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. জিয়াউদ্দিন আহম্মদ এক বিবৃতিতে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দেন। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশ করেন।
এ প্রবন্ধে তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। এই পটভূমিতে যারা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন সূচনা করেন, তাদের অনেক বাঁধা বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়। ভাষা আন্দোলন আনুষ্ঠানিক সূচনা পরে হলেও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে ভাষা আন্দোলন নিয়ে বহু সংগ্রাম করতে হয়েছে। প্রতিবাদ করতে হয়েছে। প্রচুর লেখালেখি করতে হয়েছে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য এই আন্দোলন প্রথম নয়। এই উপমহাদেশে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। এম কে গান্ধি (মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধি) দেশ বিভাগের পূর্বে একবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন গোটা ভারতবর্ষে একটি মাত্র জাতীয় ভাষা হবে। তা হবে হিন্দি। সে কথা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি। আজকের প্রজন্ম ভাষা আন্দোলন বলতে ১৯৫২ সালের পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলন কিংবা ১৯৬১ সালে আসামের শিলচরের ভাষা আন্দোলনকে বুঝে থাকেন। এ দু’টি ভাষা আন্দোলনের পূর্বে বৃটিশ আমলে ১৯২৭ সালে আসাম প্রদেশে সর্ব প্রথম একটি ভাষা আন্দোলন হয়েছিল। সাধারণ জনগণের সম্পৃক্ততা না থাকায় এই আন্দোলন তেমন একটা পরিচিতি লাভ করেননি। সিলেট তখন আসাম প্রদেশের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯২৭ সালে সিলেটের আব্দুল হামিদ চৌধুরি ছিলেন আসাম পরিষদের সদস্য। তিনি প্রাদেশিক স্পীকারের কাছে বাংলায় একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন। স্পীকার প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন “বাংলা ভাষায় প্রশ্ন রাখলে তার উত্তর দেবার বিধান আইনে নেই”।
পরিষদে তুমুল বিতর্ক হয়। সিলেটের সদস্যগণ দাবি করেন যে,প্রত্যেক সদস্যেরই মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার আছে। এভাবে ১৯২৭ সালে আসাম পরিষদে বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এ অধিকার ১৯৪৭ সাল পর্যান্ত অক্ষুন্ন ছিল।
একথা বলতে পারি যে, বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় দ্বিতীয়বার বলির পাঠা হয় পাকিস্তানের নয়া গভর্নর জেনারেল জিন্নাহ সাহেবের হাতে। মি:জিন্নাহ বাঙালি ছিলেন না। ভিন্ন সংস্কৃতির লোক ছিলেন। বাংলা ভাষা নিয়ে তিনি সর্বপ্রথম হাটে হাঁড়ি ভেঙ্গেছেন এ কথা সত্য। আর বাঙালিদের অনেকে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে এই সুযোগ লুফে নিয়েছিলেন। এই ভূ-খন্ডে বাঙালিদের নিয়ে কম খেলা হয়নি। কম নাটক মঞ্চস্থ হয়নি। বাঙালিদের মধ্যে কেউ চেয়েছিলেন উর্দুর পরিবর্তে আরবী হবে বাঙালিদের জাতীয় ভাষা। আবার কেউ বাংলা ভাষাকে প্রথমে জাতীয় ভাষা হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, কেউ প্রজাতন্ত্রের চাকুরি হারানোর ভয়ে শহীদের গায়েবী জানাযায় যেতে শংকাবোধ করেছিলেন। অথচ তারা ছিলেন খাঁটি বাঙালি; গোটা জাতির গর্ব। ছিলেন পাকিস্তান বা অবিভক্ত বাংলার ডাক সাইডের নেতা। বাঙালি হয়ে বাঙালিদের বিরুদ্ধে আতœঘাতি চক্রান্ত আর কী হতে পারে?
ভাষার বিরুদ্ধে জিন্নাহর এক চোখা নীতি
বৃটিশের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম করে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল। এই নতুন দেশ সৃষ্টিতে বাঙালিদের ভূমিকা ছিল সব থেকে বেশি। দেশ বিভাগ পূর্বত্তোর জিন্নাহ সাহেব শুধু মুসলমানদের আবাসভূমির কথা বলেছিলেন। এসব চাতুরিতাপূর্ণ রাজনৈতিক কথা বলে এবং কিছু কেরানি দিয়ে সত্যিই তিনি সৃষ্টি করেছিলেন বিকলঙ্গ এক পাকিস্তান। নতুন দেশ পাকিস্তান। নানা জাতির বাস। প্রশ্ন থেকে যায় মুসলমানদের দেশে এসব সংখ্যালঘুরা কোথায় যাবে? কীভাবে বাস করবে? কোন মনজ্লি মকসুদে আশ্রয় নেবে? না, মি: জিন্নাহ দেশ বিভাগোত্তর এক্ষেত্রে স্টেট্সম্যানের ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্র“য়ারি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে তিনি ঘোষণা করেছিলেন-“মুসলিমলীগ এতকাল ভারতের সমস্ত মুসলমানের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। দেশ বিভাগের পর মুসলিমলীগ এখন হতে একটি দল হিসেবে কাজ করবে; পূর্বের ন্যায় সমগ্র মুসলিম জাতির প্রতিনিধিত্ব করবেন না”। একজন রাষ্ট্র নায়কের কী চমৎকার কথা? তাহলে প্রশ্ন এসে যায় কেন তিনি ভাষার বিরুদ্ধে এই বিমাতাসুলভ আচরণ করেছিলেন?
তিনি বাঙালিদের সাথে এক বৈরি আচরণ করেছেন। এক কথায় বলা যায় নিষ্ঠুর এক বিশ্বাসঘাতকতা। পাকিস্তান গণ পরিষদের প্রথম অধিবেশনে সমগ্র পাকিস্তানীদের তিনি আশার বাণী শুনিয়ে ছিলেন। বাঙালিরাও তার কথায় আশ্বস্ত হয়েছিলেন। হাজার বছরের হারানো অধিকার তারা হয়তবা ফিরে পাবে। সাম্য, গণতন্ত্র মানবাধিকার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি সংখ্যালঘু পিরোজপুরের শ্রদ্র বাঙালি বাবু যোগেন্দ্র নাথ মন্ডলকে জাতীয় পরিষদের স্পীকার মনোনিত করেছিলেন। তিনি মৃত্যুর এক বছর আগে আমেরিকা রাষ্ট্রের জনক আব্রাহাম লিংকনের গ্যাটিসবার্ক অ্যাড্রেসের ন্যায় গণ-পরিষদের প্রথম অভিভাষণে দ্বার্থহীন ভাষায় পাকিস্তানী জাতির গোড়াপত্তনের উদাত্ত আহবান জানান। তিনি বলেছিলেন- You are free, you are free to go to your temples, you are to go to your mosques or to any other place of worship in this. State of Pakistan you may belong to any religion or caste or creed- that has nothing to do with the fundamental principle that we are all citizens and equal citizens of one state..... Now, I think we should keep in mind that in front of us as our ideal and you will find that in course of time Hindus would cease to be Hindus and Muslim would cease to be Muslims, not in the religious sense, be cause that in the personal faith of each individual, but in the political sense as citizens of the state. অর্থাৎ “-আপনারা এখন স্বাধীন; আপনারা এখন স্বাধীনভাবে আপনাদের মন্দিরে,মসজিদে বা পাকিস্তানের যে কোন উপাসনালয়ে যেতে পারেন। আপনারা যে কোন ধর্ম, সম্প্রদায় বা বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন, কিন্তু তাতে আমরা যে সবাই একই রাষ্ট্রের সমান অধিকার সম্পন্ন নাগরিক, এই মৌলিক নীতির সঙ্গে কোন বিরোধ নেই। আমি মনে করি, আমাদের সামনে এখন আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে একটি মাত্র লক্ষ্য থাকবে যে, কালক্রমে হিন্দু আর হিন্দু থাকবে না, মুসলমান আর মুসলমান থাকবে না, কথাটা ধর্ম বিশ্বাসের দিক থেকে নয়, কারণ,ধর্ম বিশ্বাস হল, প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ব্যাপার তাই সেটা হবে রাজনৈতিক অর্থে,একই রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে”।
পাকিস্তান ডোমিনিয়নের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসীদের মাতৃভাষা বিভিন্ন। যেমন-পষতু, বেলুচি, পাঞ্জাবি, সিন্ধী, এবং বাংলা। জিন্নাহ যে উর্দু ভাষাকে জাতীয় ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন সেই উর্দু পাকিস্তানের কোন অঞ্চলেই মাতৃভাষা রূপে চালু ছিল না। ঝানু রাজনীতিক জিন্নাহ ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে অপছন্দ করতেন। এর বিরুদ্ধে তিনি প্রকাশ্য বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি জানতেন ধর্ম ও ভাষাকে কেন্দ্র করে কখনও কোন জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠেনি। তিনি জানতেন তার অবর্তমানে সাধের পাকিস্তান আজ হোক আর কাল হোক ভেঙ্গে-চুরে মিচমার হয়ে যাবে। তিনি আরও জানতেন শুধু ধর্মীয় অভিন্নতা নয়, ভৌগলিক অবকাঠামো সংস্কৃতিক জনিত নানা কারণে পূর্ব পাকিস্তান আজ হোক, কাল হোক মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তারা গড়ে তুলবেন স্বাধীন বাংলাদেশ। হয়তবা ভবিষ্যতের দিক লক্ষ্য করে পাকিস্তানের অখন্ডতার প্রশ্নে মনের বিরুদ্ধে এক কথায় ‘টেস্ট খেলা’ হিসেবে তিনি ভাষা ও ধর্মীয় চেতনায় বিশ্বাসী হয়ে একটি অভিন্ন মুসলিম জাতীয়তাবাদ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাই একটি জাতির ভাষার প্রতি ছিল তার এই নির্মম আঘাত।
২৪ মার্চ সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জিন্নাহর সম্মানে একটি বিশেষ সমাবর্তন উৎসবের আয়োজন করেন। জিন্নাহর বক্তৃতার এক পর্যায়ে Urdu and urdu shall be the state Language-- উপস্থিত ছাত্রদের একাংশ ‘no’ ‘no’ অর্থাৎ ‘না না’ বলে চীৎকার করতে থাকেন।
ঐদিন সন্ধ্যায় জিন্নাহ চীফ সেক্রেটারি আজিজ আহম্মেদের বাসভবনে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একটি প্রতিনিধিদল সাক্ষাত দান করেন। ভাষার প্রশ্নে জিন্নাহর সাথে সংগ্রাম পরিষদের তর্কাতর্কি শুরু হয়। এক পর্যায়ে ঘোরতর পর্যায় পরিণত হয়। কায়েদে আযম ধীর শান্ত কণ্ঠে পাকিস্তান সংগ্রামের ইতিবৃত্ত চুম্বুক ভাষায় বিবৃত করে আবেগের মুহূর্তে ইংরেজিতে বলেন যে, In the interest     of the integrity of Pakistan,if necessary,you will have to change your mother tongue অর্থাৎ পাকিস্তানের সংহতির খাতিরে প্রয়োজনবোধে তোমাদেরকে মাতৃভাষা পরিবর্তন করতে হবে। মোহাম্মদ তোয়াহা সরাসরি তাকে বলেন যে, ‘তারা রাষ্ট্রভাষা চান’। এর উত্তরে জিন্নাহ বলেন যে, “তিনি তাদের কাছে রাজনীতি শিক্ষা করতে আসেননি”।
মি: জিন্নাহ যখন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। জিন্নাহ সাহেব বাঙালিদের বিরুদ্ধে এই হটকারি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য কম অনুতপ্ত হননি। কৃত কর্মের জন্য অনুশোচনাবোধ করেছিলেন। তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এলাহী বখস্কে বলেছিলেন,-“ দেখ ডাক্তার আমি জীবনে দু’টি ভুল করেছি তাও পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে। প্রথম ভুল করেছি লাহোর প্রস্তাবকে বিকৃত করে। যা দেশের একজন নেতা হিসেবে আমার পক্ষে আদৌ উচিত হয়নি।
আমার দ্বিতীয় ভুল, আমি ঢাকায় গিয়ে করেছি। গভর্নর জেনারেল হিসেবে ভাষা নিয়ে কথা বলা আমার উচিত হয়নি। ভাষার প্রশ্নে মিমাংসা পার্লামেন্টে করতে পারত। তিনি আরও বলেন ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবী তাদের অযৌক্তিক নয়। তিনি আরও বলেছিলেন, উর্দু পশ্চিম পাকিস্তানী জনগণের ভাষা নয়, পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত। অথচ পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত। পূর্ব পাকিস্তানের যার জনসংখ্যা পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বেশি সেখানে শতকরা ১০০ জনই বাঙলা ভাষী। আর এ জন্যই আমি ভাষা সম্পর্কে আর কোন কথা কোনদিন উচ্চারণ করেনি ”।
বড় বড় অঙ্গিকার,সহজ কৈফিয়ৎ, মিথ্যার ফুলঝুরি বক্তব্য এসব রাজনীতিকদের আক্রমণ এবং আত্মরক্ষার অস্ত্র। এ যেন ‘জুতা মেরে গরু দান’। জিন্নাহ সাহেবের অবস্থা তদ্রুপ। তিনি যখন বুঝেছিলেন তখন পূর্ব পাকিস্তানের রাজপথে রক্তের হোলি খেলা চলছে। মি. জিন্নাহ একদিন অখন্ড বাংলার পক্ষে ছিলেন। সেই জিন্নাহ স্বার্থের মায়ায় পূর্ব বাংলার মানুষের সাথে মোটেই অভিভাবক সুলভ ভাল ব্যবহার করেননি। তার স্বপ্নের পাকিস্তান ঠেকাতে যেয়ে জিন্নাহ ভাষার প্রশ্নে এবং রাজনৈতিকভাবে আমাদের পঙ্গু করতে চেয়েছিলেন। নানা ক্ষেত্রে বিমাতাসুলভ আচরণ করেছিলেন। লাহোর প্রস্তাব যদি তিনি ছাটকাট না করতেন একাত্তরে মহান মুত্তিযুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ মরত না। এ যুদ্ধে কোটি কোটি মানুষের জীবন বিপন্ন হত না। আর একটি মরণপন যুদ্ধের প্রয়োজন হত না। ঠিকই লাহোর রেজোলুশন্স অনুযায়ি একদিন বাঙালিদের আবাসভূমি ‘বাংলাদেশ’ সৃষ্টি হতো।
যাক জিন্নাহ জীবদ্দশায় ভাষার প্রশ্নে চুপ হয়ে গেলেন। তিনি তার জবানিতে বলেছিলেন, কয়েকজন পূর্ব পাকিস্তানী নেতার দ্বারা বিভ্রান্তি হয়ে ভাষার প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকায় আসলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রি খাজা নাজিমউদ্দিন। তিনি ছিলেন উর্দুভাষী। তিনি এবং জিন্নার ভাষায় কয়েক জনের একজন নুরুল আমিন বাঙালির সবচেয়ে বড় শত্র“, বড় বিশ্বাসঘাতক। জিন্নাহ ঢাকায় আসার কয়েক দিন আগে খাজা নাজিমউদ্দিন ১৯৪৮ সালের ১৫ মার্চ রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদের সব দাবি মেনে নিয়েছিলে। তিনি বিশ্বাসঘাতকতার পরিচয় দিয়ে ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে পূর্ব বাংলার মূখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের সভাপতিত্বে ঢাকার পল্টন ময়দানে আজকের আউটার স্টেডিয়ামে এক বিশাল জনসভায় উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন,“-----আমি আপনাদেরকে পরিস্কারভাবে বলে দেয়া দরকার যে,পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোন ভাষা নয়’’।
এই ঘোষণায় সারা পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ভাষার প্রশ্নে উত্তাল সারা পূর্ব পাকিস্তান। সর্বত্রই চলছে আন্দোলন-সংগ্রাম। চলছে কারফিউ, চলছে ১৪৪ ধারা। ২০ ফেব্র“য়ারি বুধবার ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কোরেশী সমগ্র ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করেন। বিক্ষোভকারিরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেন। মুহূর্তের মধ্যে গোটা দেশ যেন এক রক্তাক্ত জনপদ হয়ে উঠলো।
২১ ফেব্র“য়ারি পুলিশের গুলিতে নিহত ২২ ফেব্র“য়ারি দৈনিক আজাদে গুলী বর্ষণে নিহত এবং আহতদের একটি তালিকা প্রকাশ করে। সেই তালিকা অনুযায়ি নিহত হয়েছিলেন চারজন। ১. রফি উদ্দিন (বাদামতলী কমার্শিযাল প্রেসের মালিকের পুত্র) ২. সালাহউদ্দীন (বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র) ৩. আবুল বরকত (বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র) ৪. আব্দুল জব্বার (বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র)। পরে ৫. আব্দুস সালাম’ ১০ এপ্রিল ১৯৫২ তারিখে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান।
২২ ফেব্র“য়ারি সকালে মেড়িকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গনে হাজার হাজার লোকের উপস্থিতিতে একজন অপরিচিত বৃদ্ধকে দিয়ে একুশের শহীদদের গায়েবী জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। কারো কারো মতে এ গায়েবী জানাজায় এক লক্ষ, দু’লক্ষ লোকের উপস্থিতি উল্লেখ করা হয়। তাদের রক্তদানের মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলন এক চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে।

 

বার পঠিত

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

বদলে যাবে মংলা বন্দর

বদলে যাবে মংলা বন্দর

০৩ জুলাই, ২০১৮ ০২:০১













ব্রেকিং নিউজ

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০১:০০