খুলনা | রবিবার | ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ | ৬ ফাল্গুন ১৪২৪ |

Shomoyer Khobor

আমাদের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে যা চলছে

অচিন্ত্য কুমার ভৌমিক | প্রকাশিত ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ০১:০১:০০

আমাদের মাতৃভাষা বাঙলাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত নিরন্তর আন্দোলন ও সংগ্রামে গর্জে উঠেছিলো। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বায়ান্নোর একুশে ফেব্র“য়ারি ভাষা শহীদরা বুকের রক্ত দিয়ে চরম আত্মত্যাগ করেছিলেন। যাহোক পাকিস্তান আমলেই বাঙলা রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদায় অভিসিক্ত হয়েছিলো। ভাষা আন্দোলনের সিঁড়িপথ ধরে অগ্রসর হয়েছিলো বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলন, অবশেষে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে আমরা বিজয় কেতন উড়িয়ে শপথ নিয়েছিলাম যে স্বদেশের ভাষা ও সংস্কৃতিকে পূর্ণ পর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে স্বাধীন বাংলাদেশের গৌরব মহিমা সমগ্র বিশ্বে সম্প্রসারিত করবো। সেই সাথে দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে উচ্চরণ করেছিলাম যে আমাদের মহান  মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ সর্বক্ষেত্রে জাগ্রত করে উন্নত দেশ গড়ে তুলবো।
১৯৭৫ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এই স্বাধীন দেশে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও লক্ষ বিনষ্ট করার জন্যে যে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিলো, আজও সেই চক্রান্ত থেমে নেই। নষ্ট রাজনীতির ছত্রছায়ায় এদেশে পুনরায় পাকিস্তানি ভাবধারা প্রবর্তনের পায়তারাও চলেছে দীর্ঘদিন। কিন্তু না! আমাদের সুদৃঢ় সংগ্রামী চেতনায় অগ্রযাত্রায় সে চক্রান্ত আজও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। আজও আমরা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত। কিন্তু কী এক বিভ্রান্তির অপছায়া আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির স্কন্ধে ভর করে আছে। এ নিয়ে, এতসব বলাবলি, লেখালেখি, বিতর্ক করেও তেমন ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে না বলেইতো মনে হচ্ছে। তবুও দৃষ্টিবিভ্রম থেকে সঠিক পথে ফেরানোর জন্যে  প্রতিবাদের বাক্য বলে যেতেই হবে। প্রতিবার ফেব্র“য়ারি মাস এলেই এসব কথা বলাবলি, লেখালেখি হয়ে থাকে। কিন্তু ফেব্র“য়ারি পার হলেই আর এনিয়ে তেমন কোনও নড়াচড়া নেই।
বাঙলা ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে এর ভিতর যেসব গলদ লক্ষ্য করা যাচ্ছে সেটা সরাসরি বলাই উত্তম। শিক্ষার মাধ্যম হবে বাংলা। এইতো  কথা। আজ পর্যন্ত সে কথা বাস্তবে কতটা মূল্যায়ন করতে পেরেছি? কিছুটা অবশ্য পেরেছি, তবে বেশিটাই পেরে উঠিনি। এ ব্যর্থতার দায়তো এদেশের শিক্ষিত সমাজের, পন্ডিতদের। প্রমিত বাংলা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কতো হেরফের। বানান ভুলতো আছেই, সেই সাথে রয়েছে সঠিক বাংলা বাক্য রচনার দুর্বলতা। আর  উচ্চারণ? সে প্রশ্ন তুলে লজ্জা দিতে চাইনা। লজ্জা থাকলেতো-লজ্জা? মাতৃভাষা  উচ্চারণে ভুল ধরলে দেঁতোহাসি হেঁসে বলি- তাই নাকি? স্কুলেতো স্যাররা ঠিকমত বাংলা শব্দ উচ্চারণ শেখাননি। ব্যাস! সাত খুন মাফ! শিক্ষক যদি ক্লাসে সঠিক বাংলা শব্দ উচ্চারণ না করেন তাহলে ছাত্রদের যা হওয়ার সেটাই হচ্ছে। তাছাড়া বাংলা বাক্যের মধ্যেতো অহরহ, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ইচ্ছেমত ‘বাংলিশ ভাষা’ অর্থাৎ ইংলিশ মিশ্রিত বাংলা ব্যবহার অতি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। আবার মোবাইলে ইংরেজি অক্ষরে, বাংলা শব্দ লেখার ভঙ্গিমা রীতিমত প্রচলিত। ঠেকাবেটা কে? ওদিকে ইংরেজির মাধ্যমে শিক্ষাদানের স্কুলগুলোতে নিদারুনভাবে বাংলাভাষাকে উপেক্ষা করার পদ্ধতি প্রচলিত। সেসব স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীর পাঁচজন বাংলা কবি কিংবা কথাসাহিত্যিকদের নাম বলতে পারবে কিনা সন্দেহ। উচ্চ শিক্ষিতরা- যারা উপরের পদে চাকুরি করেন তাদের অধিকাংশই নির্ভুল বাংলা একখানা দরখাস্ত লিখতে পারবেন বলে মনে হয়না, লিখলেও সাধু-চলিতের মিশ্রন একেবারে জগাখিচুড়ি বানিয়ে বাংলাভাষার বারোটা বাজাবেন। অনেক উচ্চপদের কর্মকর্তারাতো বাংলায় কিছু লিখতেও লজ্জাবোধ করেন। না! এসব ন্যাক্কারজনক মানসিকতা থেকে বাঙালিদের সরিয়ে আনতেই হবে। সঠিক বানানে, সঠিক উচ্চারণে প্রমিত বাংলাভাষার ব্যবহার অবশ্যই বাস্তবায়িত করতে হবে! তবেই ওসব অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত হবে।
বাংলাদেশের আবহমান সংস্কৃতি বিনষ্ট করার জন্যেতো নতুন প্রজন্মের বেশ একটা অংশ উঠে পড়ে লেগেছে। তারা ‘ব্যান্ড’ বা ‘কনসার্টের’ নামে বিকৃত, বিরক্তিকর, বেহায়া, অশালীন, উদ্ভট, অশ্রাব্য সুরে লম্ফ-ঝম্প সহকারে বাংলা গান নামক এক ধরণের সঙ্গীত পরিবেশন করছে, সেই সাথে স্বদেশের বাংলা গানের কথা, সুর ও তাল বিকৃত করছে। এদের রুখবে কে? আর এক শ্রেণীর সংস্কৃতিবান আছেন যারা বাইরে-মঞ্চে রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত বা লালনগীতি ইত্যাদি পরিবেশন করে বাহাবা নেন, কিন্তু তাদের বাড়ি বা বাসার ভিতরে তারা একেবারেই অন্য মানুষ, বাঙালি সংস্কৃতির নাম গন্ধও সেখানে খুঁজে পাওয়া যায়না। এই আত্মঘাতকদের প্রতিহত করবে কে?
আমাদের স্বদেশের সংস্কৃতির মধ্যে মাতৃদুগ্ধের আস্বাদ রয়েছে। এই ঐতিহ্যকে লালন ও পরিচর্চা না করলে পোকা ধরবে মূল শিকড়ে। শিকড়ে পোকা বা পচন ধরলে সে বৃক্ষ কতক্ষণ টিকতে পারে? বাঙলা সংস্কৃতি, বাঙালি সমাজ জীবন বিনষ্ট ও বিকৃত করার চক্রান্তে কোনোকোনো বিদেশি টেলিভিশন চ্যানেল আদাজল খেয়ে লেগেছে। তারা আমাদের পরিবারের ভিতর পর্যন্ত ঢুকে পড়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় এদেশের নতুন প্রজন্মকে বিপথে চালিত করে অনাসৃষ্টির সৃষ্টি করেছে। বিদেশের সেসব নাটক, গান, নৃত্য পরিহার না করে আমাদের অনেকেই সেগুলি নকল করে বিকৃত মানসিকতায় আক্রান্ত হচ্ছে।
তবে আশার কথা, এইসব অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সংগ্রাম থেমে নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে এদেশের সার্বিক অগ্রগতির জন্যে আমাদের প্রচেষ্টা ও প্রতিরোধ সুদৃঢ়। সেই প্রত্যয়ে উজ্জীবিত হয়ে আমাদের মাতৃভাষা ও আবহমান সংস্কৃতির ধারাকে কন্টকমুক্ত করার দৃঢ় পদক্ষেপে সচেতন জনতা এগিয়ে এসেছে। যে কোন মূল্যেই হোক প্রমিত ও শুদ্ধভাবে বাংলাভাষা ব্যবহারের জন্যে দেশের সর্বশ্রেণীর জনগণকে সচেতন করতেই হবে, আর সেই সাথে রক্ষা করতে হবে আমাদের আবহমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের শিকড়।

 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

যেখানে ৭১ কথা বলে

যেখানে ৭১ কথা বলে

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:২৬

একাত্তরের খুলনা বিজয়

একাত্তরের খুলনা বিজয়

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:২২



পারুলিয়ায় গণহত্যা- ১৯৭১

পারুলিয়ায় গণহত্যা- ১৯৭১

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:২১



যুদ্ধকালীন স্মৃতি

যুদ্ধকালীন স্মৃতি

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:১৭

ছবি আঁকায় পরাণ জুড়ায়

ছবি আঁকায় পরাণ জুড়ায়

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:১৫

বিজয়ের অর্জন প্রশ্ন পাশাপাশি

বিজয়ের অর্জন প্রশ্ন পাশাপাশি

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:১৪

শহীদ পরিবার থেকে বলছি

শহীদ পরিবার থেকে বলছি

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:১৫



ব্রেকিং নিউজ






ভাষা আন্দোলনের দিনগুলি

ভাষা আন্দোলনের দিনগুলি

১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ০০:৫০