এ সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে বিএনপি’র তৃণমূলে অনীহা


পর পর দু’টি সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপি’র নিবন্ধন বাতিল হতে পারে। দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রবাসে। সারাদেশের নেতা-কর্মীরাও মামলায় জর্জরিত। এ অবস্থায় আগামী অক্টোবরে ঘোষণা আসতে পারে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী তফসিল। এসব প্রশ্ন নিয়ে জানতে চাইলে-খুলনার তৃণমূল নেতা-কর্মীদের ভাবনা; তারা বললেন, ‘এ সরকারের অধীনে নির্বাচনে আর না’।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, গত ১৫ মে খুলনায় ও সর্বশেষ ২৬ জুন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অনিয়ম, জাল ভোট প্রদান ও কেন্দ্র দখলের অভিযোগ করে বিএনপি। দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে নির্বাচনে অংশ নেয়া নিয়ে সাধারণ নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। এসব নেতা-কর্মীরা সরাসরি নাম প্রকাশ করে বক্তব্য না দিলেও চাপা ক্ষোভে দুষছে শীর্ষ নেতাদের। সবকিছু ঠিক থাকলে, আগামী ৩১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক।
বিএনপি নেতা কাজী মাহমুদ আলী বলেন, “স্থানীয় নেতৃত্ব কাঠামো দীর্ঘদিন পরিবর্তন না হওয়ায় সাংগঠনিক দুর্বলতায় বিএনপি। ‘ডু অর ডাই’ আন্দোলন ব্যতীত ‘গণতন্ত্রের মা’ বেগম খালেদা জিয়াকে সরকারের রোষানল থেকে মুক্ত করা সম্ভব নয়। আগে তো খালেদা জিয়ার মুক্তি, পরে নির্বাচনী ভাবনা। দলের এ অবস্থায় শুধুমাত্র বেঈমানরাই নির্বাচনে যাবার আশা করতে পারেন।” 
নগর বিএনপি’র স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক আজিজুল হাসান দুলু বললেন, “খুলনা সিটির ভোট ডাকাতির নির্বাচন যদি হয় ওদের কাছে মডেল; তাহলে আগামী নির্বাচনগুলো কেমন হবে এটা বুঝতে কষ্ট হবার কথা নয়। তৃণমূল নেতা-কর্মীরা মায়ের মুক্তি চায়; অন্য কিছু আপাতত নয়।”
জেলা বিএনপি’র সহ-দপ্তর সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বাবু বলেন, “প্রতিদিন পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়ানোর চেয়ে জেলখানায় থাকাই নিরাপদ। অবশ্যই সমগ্র দেশটাই তো বিরোধী দল-মতের নেতা-কর্মীদের জন্য জেলখানা। ঠুনকো অজুহাতে নেতা-কর্মীদের মেরে ফেলা হচ্ছে। যত্রতত্র পাওয়া যাচ্ছে তাদের লাশ; তাহলে এখনো কিসের ভয়?”
জেলা বিএনপি’র সভাপতি এড. শফিকুল আলম মনা বলেন, “আমাদের সামনে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য একটাই; তা হলো দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা। সে লক্ষেই কাজ করছি আমরা। দেশের জনগণকে সাথে নিয়ে গণবিপ্লবের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে সেদিন বেশি দূরে নয়।”
বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও নগর সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘নিবন্ধনটাকে বিএনপি সংকট মনে করে না। নিবন্ধন চলে যাবে এই ভয়ে বিএনপি ভীতু নয়। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল বিএনপি। সেই দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে জাতীয় নির্বাচনে যাবার চিন্তাও করে না। প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে অসৎ ব্যবহার করে বিএনপি’র বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে আ’লীগের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে পারেনি। বরং জনগণের কাছে প্রমাণিত হয়েছে এ সরকারের অধীনে কোন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হওয়া অসম্ভব।’
নগর বিএনপি’র সভাপতি মঞ্জু আরও বলেন, “সর্বপ্রথম বিএনপি চেয়ারপারসনের মুক্তি চায় তৃণমূল নেতা-কর্মীরা। একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনীয় তফসীল ঘোষণার আগে সরকারকে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি ভাবতে হবে। ভোটার শূন্য, প্রার্থীবিহীন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্যদিয়ে চলমান রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সংকট চলছে। শুধুমাত্র সকলের অংশগ্রহণে একটি অর্থবহ গ্রহণযোগ্য সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্যদিয়েই এ সংকট নিসরন সম্ভব। সেই লক্ষে বিএনপি কাজ করছে। 
গণতন্ত্রহীনতা, কথা বলতে না দেয়ার সংস্কৃতি, বিরোধী রাজনৈতিক দলের মত প্রকাশে বাধা প্রদান এবং মানবাধিকার পরিপন্থী কর্মকান্ডে দেশকে সংকটের মধ্যদিয়ে পার করছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে নিঃশর্ত মুক্তি দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সংকট নিসরনের উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে। সম্প্রতি খুলনা ও গাজীপুর সিটি নির্বাচনের ভোট ডাকাতিতে নির্বাচন কমিশন নিরব ভূমিকায় সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে। তাই বর্তমান সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি যাবে না।”
প্রসঙ্গত, নির্বাচনী আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) আইনের ৯০ এইচ (১) (ই) ধারা বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হবে। আরপিও ৯০ এইচ (১) ধারায় রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিলের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। পাঁচটি কারণে কমিশন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিল করতে পারবে। এই ধারার (ই) উপধারায় বলা হয়েছে, “কোনো রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিল হবে, যদি কোনো রাজনৈতিক দল পরপর দু’টি সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেয়।” অবশ্য নিবন্ধন বাতিলের ক্ষেত্রে কোনো দল যদি ৯০ এইচ (১) (ই) ধারা লঙ্ঘন করে, সে ক্ষেত্রে দলটির নিবন্ধন সরাসরি বাতিল হবে না। পরপর দু’বার নির্বাচনে অংশ না নেওয়া দলটিকে শুনানিতে অংশ নেয়ার সুযোগ দেবে। কমিশনের কাছে দলটির বক্তব্য গ্রহণযোগ্য না হলেই কেবল তারা নিবন্ধন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেবে।
 


footer logo

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।