সুন্দরবনে দস্যুদের অস্ত্র-গোলাবারুদ সরবরাহকারীদের তালিকা হচ্ছে শিগগিরই অভিযান শুরু


দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় অবস্থিত পৃথিবীর একক বৃহত্তম প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন। একে ঘিরে কয়েক যুগ ধরে চলছে দস্যুতা। এ জলদস্যু-বনদস্যুদের কাছে অস্ত্র- গোলাবারুদ ও রসদ পৌঁছে দেয়া ব্যক্তিদের তৎপরতা সম্প্রতি প্রশাসনের নজরে এসেছে। বছরের পর বছর ধরে অন্তরালে থাকা এ সকল অপরাধীরা সমাজের বিভিন্ন স্তরে তাদের শেকড় ছড়িয়ে রেখে অপরাধ সংগঠিত করতে সহায়তা করছে। এমনকি শহর ও শহরতলীতে বসবাস করেও সুন্দরবনের দস্যুদের বিনিময়ে তারা মাসে লাখ লাখ টাকা উপার্জন করে আরাম আয়েশের জীবনযাপন করছেন। তবে র‌্যাব, পুলিশ, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনীসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত টাস্কফোর্স এ সকল অপরাধীদের সণাক্ত ও গ্রেফতারে শিগগিরই অভিযান শুরু করবে বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার উপকুলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষকে জীবিকা নির্বাহ করতে সুন্দরবনে ছুটতে হয়। এদের মধ্যে জেলে, মৌয়াল ও বাওয়ালীসহ নানা শ্রেণী পেশার মানুষ রয়েছে। এ সকল মানুষের স্বাভাবিক আয়ের উৎস্যকে অস্বাভাবিক করে দেয় সুন্দরবনে থাকা দস্যু বাহিনী। মুক্তিপণের জালে সারা বছর ধরেই আবদ্ধ থাকে এসকল অসহায় বনজীবী পরিবারগুলো। 
২০১৬ সাল থেকে সুন্দরবনের জলদস্যু-বনদস্যুদের আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে মূলতঃ অনেক গোপন তথ্য ধীরে ধীরে সামনে আসতে শুরু করে। এ সকল বনদস্যুদের অস্ত্র-গোলাবারুদ ও রসদ সরবরাহ কারা করছেন? বা কোন উপায়ে সেগুলো গহীন বনে দস্যু বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। এ সকল প্রশ্নের জট অনেকটা খুলে গেছে। বেশ কিছু সরবরাহকারী ও সহায়তাকারীর নামও উঠে এসেছে। প্রশাসনের কঠোর নজরদারিতে রয়েছে ওই চক্রটি। এদের মধ্যে খুলনা জেলায় ৭/৮ জন, সাতক্ষীরা জেলায় ১০/১২ জন ও বাগেরহাট জেলায় রয়েছে কমপক্ষে ৬ জন। এদের মধ্যে অনেকে ব্যবসায়ী, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধি রয়েছেন। 
ইতোমধ্যে আত্মসমর্পণকৃত বেশ কয়েকজন সাবেক বনদস্যু-জলদস্যু বাহিনীর সদস্য এ প্রতিবেদককে জানান, দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ এনে দেন এ সকল ব্যক্তিরা। বিনিময়ে তারা প্রতিটি অস্ত্রের জন্য ২/৩ লাখ টাকা নিয়ে থাকেন।  এছাড়া বন্দুকের গুলির জন্যও নেয়া হয় তিন চার গুণ বেশি মূল্য। এছাড়া বাহিনীর খাদ্য, পোশাকসহ অন্যান্য রসদ সরবরাহের ক্ষেত্রেও এ চক্রগুলো বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকেন। 
সাবেক এ দস্যুবাহিনীর সদস্যরা জানান, ১ লাখ টাকা প্রদান করা হলে শহর থেকে ৪০ হাজার টাকা বাজার পাঠানো হয়। ৬০ হাজার টাকা কমিশন নেন ওই সকল সহায়তাকারীরা। সুন্দরবনে দস্যুতার মাধ্যমে যে টাকা আয় করা হয়, শহর ও শহরতলীতে বসে তার থেকে বেশি আয় করেন এ চক্রগুলো। তবে এ চক্রের বেশ কয়েকজনের নাম উঠে  এলেও বিশেষ কারনে তা প্রকাশ করা হলো না।  
এদিকে চলতি বছরের অক্টোবরের মধ্যে সুন্দরবনকে দস্যু মুক্ত করতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা শেষ হতে যাচ্ছে বলে স্বারষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ গণমাধ্যমকে ইতোমধ্যে জানিয়েছেন। তবে বনের গহীনে থাকা দস্যুবাহিনী গুলোকে অস্ত্র-গুলি ও রসদ সরবাহকারীদের আইনের আওতায় আনতে না পারলে সরকারের এ মহতী উদ্যোগ সফলে বাধা হতে পারে বলে বনজীবীসহ অনেকের অভিমত। 
২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত সর্বমোট ২৬টি বাহিনীর ২৪৩ জন জলদস্যু, ৩৭৯টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ১৮ হাজার ৮শ’ ৪ রাউন্ড গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করেছেন। আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুগণ অপরাধের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসায় তারা সমাজের অন্যান্য অপরাধী ও বিপদজনক জনগোষ্ঠীর সামনে একটি উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। তবে এখনো সুন্দরবনে সক্রিয় রয়েছে বেশ কয়েকটি দস্যু বাহিনী। পর্যায়ক্রমে তাারও হয়তো সরকারের নির্ধারিত সময়ে আত্মসমর্পণ করবে। তবে নতুন করে দস্যুবাহিনী যাতে তৈরি না হয় এবং তাদেরকে অস্ত্র ও গুলি সরবরাহকারীরা যাতে আইনের আওতায় আসে এ দাবি জানিয়েছেন নাম প্রকাশ না করা সাবেক বনদস্যু বাহিনীর অনেক সদস্যরা। 
এ বিষয় র‌্যাব ৬’র স্পেশাল কোম্পানি কমান্ডার এনায়েত হোসেন মান্নান জানান, আমরা এ সকল বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি রেখেছি, সময় হলেই আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে। সরকারে উদ্যোগকে সফল করতে সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হতে যা যা করণীয় সব করা হবে বলেও জানান তিনি।
 


footer logo

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।