খুলনা | বুধবার | ১৮ জুলাই ২০১৮ | ৩ শ্রাবণ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

চলতি বছরেই জলদস্যু-বনদস্যু মুক্ত হতে যাচ্ছে সুন্দরবন : আশায় বুক বাঁধছেন বনজীবীরা

সোহাগ দেওয়ান   | প্রকাশিত ০৩ জুলাই, ২০১৮ ০১:৫৮:০০

দক্ষিণ অঞ্চলের খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় অবস্থিত পৃথিবীর একক বৃহত্তম প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থিত এ বন দেশের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। সুন্দরবনকে ঘিরে এসকল জেলার উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ যুগ যুগ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বর্তমান সরকারের ঘোষণা মোতাবেক র‌্যাপিড এ্যাকশান বাটালিয়ন (র‌্যাব)’র উদ্যোগের কারনে বনজীবীদের কাছে ভয়ঙ্কর বন এখন ধীরে ধীরে অভয়ারণ্যে পরিণত হতে চলেছে। ২০১৬ সাল থেকে সুন্দরবনের জলদস্যু-বনদস্যুদের আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে পাল্টে যাচ্ছে সুন্দরবনের চিত্র। তাছাড়া সরকারের নানা পরিকল্পনায় সুন্দরবন বিশ্বের পর্যটন বাজারে আরও মনমুগ্ধকর রুপে হাজির হতে যাচ্ছে। আত্মসমর্পণকৃত জলদস্যু-বনদস্যুদের পুনর্বাসনে ‘সুন্দরবনের হাসি’ প্রকল্প চলতি বছরের গত ১২ জুন আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা  হয়। এতে করে সুন্দরবনের বনদস্যুরা সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দ্রুততার সাথে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছে। চলতি বছরের মধ্যেই আত্মসমর্পণের ঘোষণা শেষ হতে যাচ্ছে বলে স্বারষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ গণমাধ্যমকে ইতোমধ্যে জানিয়েছেন।   
এদিকে সুন্দরবনে জলদস্যু-বনদস্যু মুক্ত হওয়ার খবরে স্বস্তি ফিরে এসেছে বনে উপরে জীবিকা নির্বাহকারী উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ। দস্যুদের নির্যাতন নিপীরণ ও মুক্তিপণের টাকা দেয়ার হাত থেকে অন্তত্য রক্ষা পেতে যাচ্ছেন দারিদ্র সীমার নিচে থাকা এসকল জনগোষ্ঠী। 
সুন্দরবনে জীবিকা নির্বাহকারী বেশ কিছু জেলে, বাওয়ালী, মৌয়ালের সাথে আলোচনা করে জানা গেছে, সুন্দরবনে গিয়ে ২ হাজার টাকা আয় করলে তার ১৫শ’ টাকাই দস্যুদের দিয়ে আসতে হয়। এছাড়া জেলেদের অপহরণ করে জনপ্রতি নেয়া হয় ২০-৫০ হাজার টাকা। মুক্তিপণের টাকা দাদন নিয়ে বনদস্যুদের দিয়ে সারা বছর ধরে ঘানি টানতে হয় অসহায় এ মানুষগুলোকে। 
র‌্যাব, কোস্ট গার্ড ও বন বিভাগের সূত্রমতে, বিশাল সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল হাজার হাজার উপকূলবর্তী মানুষ প্রতিনিয়তই বনদস্যু/জলদস্যুদের আক্রমনের শিকার হয়ে থাকে। সুন্দরবনসহ বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকায় বনদস্যু, জলদস্যুদের দমনের লক্ষে র‌্যাব, পুলিশ, কোস্ট গার্ড, বিজিবি ও বন বিভাগের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স কাজ করছে, যার প্রধান সমন্বয়কারী র‌্যাবের মহাপরিচালক। 
র‌্যাব সূত্র আরও জানায়, এ পর্যন্ত সর্বমোট ২৬টি বাহিনীর ২৪৩ জন জলদস্যু সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। জব্দ হয়েছে ৩৭৯টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ১৮ হাজার ৮শ’ ৪ রাউন্ড গোলাবারুদ। আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুগণ অপরাধের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসায় তারা সমাজের অন্যান্য অপরাধী ও বিপদজনক জনগোষ্ঠীর সামনে একটি উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি আত্মসমর্পণকৃত সাবেক এসকল জলদস্যু পরিবারের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষে র‌্যাব কর্তৃক ‘সুন্দরবনের হাসি’ (প্রস্তাবিত) প্রকল্প গ্রহণ করেছে। প্রকল্পটি চালু হলে আত্মসমর্পণকৃত জলদস্যুদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
বন অধিদপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ৬,০১,৭০০ হেক্টর যা দেশের আয়তনের ৪.১৩%। সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া, পশুর, বাইন, কাঁকড়া ইত্যাদি এ বনের প্রধান প্রধান বৃক্ষ প্রজাতি। বন্যপ্রাণির মধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, বানর, শুকর, কুমির, ডলফিন, গুইসাপ, অজগর, হরিয়াল, বালিহাঁস, গাংচিল, বক, মদনটাক, মরালিহাঁস, চখা, ঈগল, চিল মাছরাঙা ইত্যাদি। পশুর, শিবসা, বলেশ্বর, রায়মংগল, আড়পাংগাসিয়াসহ বেশ কিছু নদী বেষ্টিত এ বনের মধ্যে শত শত খাল জালের মতো ছড়িয়ে আছে। সুন্দরবন সংলগ্ন নদী ও খালে ইলিশ, লইট্টা, ছুরি, পোয়া,  রূপচাঁদা, ভেটকি, পারসে, গলদা, বাগদা, চিতরা ইত্যাদি মাছ পাওয়া যায়। এছাড়া সুন্দরবনের ৩টি বন্যপ্রাণি অভয়ারণ্য নিয়ে গঠিত ১,৩৯,৭০০ হেক্টর বনাঞ্চলকে ইউনেস্কো ১৯৯৭ সালে বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় সুন্দরবন সংরক্ষণের জন্য দক্ষ ব্যবস্থাপনা বাড়ানোসহ বাঘ, হরিণ সহ বন্যপ্রাণি নিধন ঠেকাতে সরকার বিশেষ পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা নিয়েছে। বিশেষ করে সাতক্ষীরা, খুলনা এবং বাগেরহাট জেলার সুন্দরবন সংরক্ষিত বনাঞ্চলের শরণখোলা রেঞ্জ, চাঁদপাই রেঞ্জ, খুলনা এবং সাতক্ষীরা রেঞ্জ পর্যবেক্ষণ জোরদার করা হয়েছে বলে বনবিভাগসহ ট্রাস্কফোর্স কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। 
সুন্দরবনসহ বনের উদ্ভিদ ও প্রাণিকূল নিরাপদ করতে পারলে অপার সম্ভাবনাময় এ সুন্দরবনকে ঘিরে দেশী বিদেশী পর্যটকদের ভিড় বাড়তে থাকেবে বলে সংশ্লিষ্টরা মতামত দিয়েছেন। 
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এটি দেশের বনজ সম্পদের একক বৃহত্তম উৎস। এই বন কাঠের উপর নির্ভরশীল শিল্পে কাঁচামাল জোগান দেয়। এছাড়াও কাঠ, জ্বালানী ও মন্ডের মত প্রথাগত বনজ সম্পদের পাশাপাশি এ বন থেকে নিয়মিত ব্যাপকভাবে আহরণ করা হয় ঘর ছাওয়ার জন্য গোলপাতা, মধু, মৌচাকের মোম, মাছ, কাঁকড়া এবং শামুক-ঝিনুক। সুন্দরবনের এই ভূমি একই সাথে প্রয়োজনীয় আবাসস্থল, পুষ্টি উৎপাদক, পানি বিশুদ্ধকারক, পলি সঞ্চয়কারী, ঝড় প্রতিরোধক, উপকূল স্থিতিকারী, শক্তি সম্পদের আধার এবং পর্যটন কেন্দ্র। তাছাড়া বিশ্ব খাদ্য সংস্থার এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ৫১ শতাংশ জুড়ে সুন্দরবন। বন থেকে আসা মোট আয়ে অবদান প্রায় ৪১ শতাংশ এবং কাঠ ও জ্বালানী উৎপাদনে অবদান প্রায় ৪৫ শতাংশ। ওই পরিসংখ্যানে আরো বলা হয়, 
সুন্দরবনের বিভিন্ন কাঠজাত সম্পদ এবং বনায়ন কমপক্ষে আধা মিলিয়ন উপকূলবর্তী জনসংখ্যার জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কর্মসংস্থান ও আযয়ে সুযোগ সৃষ্টি করেছে। উৎপাদনমূখী ভূমিকার পাশাপাশি সুন্দরবন, ঘূর্ণিঝড় প্রবণ বাংলাদেশের উপকূলবর্তী জনসংখ্যা ও তাদের সম্পদের প্রাকৃতিক নিরাপত্তাবলয় হিসেবে ভূমিকা রাখে।
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

বদলে যাবে মংলা বন্দর

বদলে যাবে মংলা বন্দর

০৩ জুলাই, ২০১৮ ০২:০১













ব্রেকিং নিউজ











জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ  আজ শুরু

জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ  আজ শুরু

১৮ জুলাই, ২০১৮ ০০:৫৬