খুলনা | মঙ্গলবার | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ১০ আশ্বিন ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

খুলনায় হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি কমেছে দেড়শ’ কোটি টাকারও বেশি

আল মাহমুদ প্রিন্স   | প্রকাশিত ০৩ জুলাই, ২০১৮ ০১:৪৬:০০

খুলনায় হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি কমছে। গেল অর্থ বছরে রপ্তানি হয়েছে ৫৪৪ কোটি ৮৭ লাখ ৩২০ টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে রপ্তানি হয়েছিল ৬৯৫ কোটি ২৩ লাখ ৯০ হাজার ৪০০ টাকা। যার কারণে ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে কমেছে ১৫০ কোটি ৩৬ লাখ ৯০ হাজার ৮০ টাকা। হোয়াইট গোল্ড নামে খ্যাত এ চিংড়ি শিল্পকে টিকিয়ে রাখলে বাড়বে রপ্তানি। ঘুরে দাঁড়াবে জাতীয় অর্থ নীতির চাকা। 
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো খুলনা দপ্তরের দেয়া তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের জানুয়ারিতে ১ কোটি ৬১ লাখ ৭৬ হাজার ৪১০ ডলার, ফেব্র“য়ারিতে ১ কোটি ৬১ লাখ ১০ হাজার ৫৭৭, মার্চে ১ কোটি ২৫ লাখ ৬২ হাজার ৯১৩ ডলার, এপ্রিলে ১ কোটি ৫২ লাখ ৬০ হাজার ২৬৯ ডলার, মে মাসে ২ কোটি ৬৭ লাখ ৯৪ হাজার ৭১১ ডলার হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি করা হয়েছে।  
এছাড়া ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরের জানুয়ারিতে  ১ কোটি ৭০ লাখ ৮৪ হাজার ৭১৩ ডলার, ফেব্র“য়ারিতে ১ কোটি ১৫ লাখ ৬২ হাজার ৭২৬ ডলার, মার্চে ১ কোটি ১৩ লাখ ৩৭ হাজার ৫৫৯ ডলার, এপ্রিলে ১ কোটি ২৫ লাখ ৩৮ হাজার ৩১৫ ডলার ও মে মাসে ১ কোটি ৫৫ লাখ ৮৫ হাজার ৪৪১ ডলার হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি করা হয়েছে। 
অর্থাৎ ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ৬৯ লাখ ৪ হাজার ৮৮০ ডলার। যা বাংলাদেশী টাকায় রপ্তানি মূল্য দাঁড়িয়েছে ৬৯৫ কোটি ২৩ লাখ ৯০ হাজার ৪০০ টাকা। অপর দিকে ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি মূল্য দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৮১ লাখ ৮ হাজার ৭৭৪ ডলার। যা বাংলাদেশী টাকায় রপ্তানি মূল্য দাঁড়িয়েছে ৫৪৪ কোটি ৮৭ লাখ ৩২০ টাকা। প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের তুলনায় ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি আয় ১ কোটি ৮৭ লাখ ৯৬ হাজার ১২৬ ডলার কম হয়েছে। যা রপ্তানি আয় বাংলাদেশী টাকায় ১৫০ কোটি ৩৬ লাখ ৯০ হাজার ৮০ টাকা কম হয়েছে। 
জানা গেছে, হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি কমে যাওয়ার বিভিন্ন কারণ রয়েছে। এসবের প্রধানতম কারণগুলো হচ্ছে আমাদের দেশে বাগদা চিংড়ির তুলনায় ভেনামী চিংডির দাম অনেক কম এবং কম খরচে ভেনামী চিংড়ি উৎপাদন  বেশি হওয়ায়। দ্বিতীয়তঃ বাংলাদেশে ভেনামী চিংড়ি উৎপাদনে অনুমতি না থাকায়। তৃতীয়তঃ বাংলাদেশে সেমি ইনসেন্টিভ নতুন প্রযুক্তিতে যে চিংড়ি উৎপাদন হচ্ছে তার শতকরা ৯০ ভাগ মারা যাচ্ছে আবহাওয়ার কারণে আর এজন্য রপ্তানি দিন দিন কমছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো খুলনা অফিসের নির্বাহী সহকারী এস এম ছাদিকুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেন, ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের তুলনায় চলতি অর্থ বছরে হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি অনেক কমেছে। তিনি বলেন, ভেনামী চিংড়ির দাম কম হওয়া বাংলাদেশে চিংড়ি রপ্তানি কম হচ্ছে। 
একাধিক চিংড়ি ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলে জানা যায়, র‌্যাব, কোস্ট গার্ড এবং মৎস্য পরিদর্শন ও মাননিয়ন্ত্রণ দপ্তরের চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ বিরোধী অভিযানে জেল-জরিমানা হলেও থেমে নেই চিংড়ির দেহে অপদ্রব্য পুশ। আর এ পুশের কারণেই হিমায়িত চিংড়ি শিল্পে ধস নামতে শুরু করেছে। যার কারণেই বিদেশী বিক্রেতারা চিংড়ি  কিনতে আগ্রহ হারাচ্ছে। খুলনার বিভিন্ন উপজেলায় এখনো থেমে নেই চিংড়ির দেহে অপদ্রব্য পুশ।  
মডার্ন সী ফুডস্ ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলহাজ্ব মোঃ রেজাউল হক বলেন, ভেনামী চিংড়ির দাম অনেক কম কিন্তু আমাদের দেশের বাগদা চিংড়ির দাম বেশি। ফলে  বাগদা চিংড়ি কিনতে অনীহা প্রকাশ করছে বিদেশী ক্রেতারা। এ কারণে হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি কমছে। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘ব্রয়লার মুরগী এবং দেশী মুরগীর মধ্যে যেমন তফাৎ রয়েছে ঠিক তেমনি ভেনামী চিংড়ি ও বাগদা চিংড়ির মধ্যে অনেক তফাৎ রয়েছে। বাগদা চিংড়ির দাম বেশি হলেও এর গুণগতমান ভেনামী চিংড়ির চেয়ে অনেক ভালো।’ 
রূপালী সী ফুডস্ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোঃ কামরুল ইসলাম বলেন, হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি কমে যাওয়ার পেছনে বেশকিছু কারণ রয়েছে। এসব কারণের মধ্যে রয়েছে প্রথমতঃ আমাদের দেশে বাগদা চিংড়ির তুলনায় ভেনামী চিংডির দাম অনেক কম হওয়ায়। কম খরচে উৎপাদনও বেশি হওয়ায়। দ্বিতীয়তঃ শতকরা ৭৫ ভাগ ভেনামী চিংড়ি উৎপাদন হওয়ায়। তৃতীয়তঃ আমাদের দেশে ভেনামী চিংড়ি উৎপাদনের কোনো অনুমতি না থাকায় উৎপাদন না হওয়ার কারণে। চতুর্থতঃ আমাদের দেশে সেমি ইনসেন্টিভ নতুন প্রযুক্তিতে যে চিংড়ি উৎপাদন হচ্ছে তার শতকরা ৯০ ভাগ আবহাওয়ার কারণে মারা যাচ্ছে। এ কারণে রপ্তানি দিন দিন কমছে। 
ছবি ফিস প্রোসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কাজী বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘ভেনামী চিংড়ির দাম কম হওয়ায় আমাদের দেশে বাগদা চিংড়ি কিনতে চাচ্ছেনা বিদেশী ক্রেতারা। ফলে হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি তো দিন দিন কমবেই।’ 
আছিয়া সী ফুডস লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) প্রদীপ কুমার দে বলেন, বাংলাদেশে চিংড়ি উৎপাদন শতভাগ প্রাকৃতিক। কিন্তু ভেনামী চিংড়ি উৎপাদন খরচ অনেক কম এমনকি দামেও সস্তা।  ভেনামী চিংড়ির চেয়ে বাগদা চিংড়ির দামও বেশি। ফলে ইউরোপ বেশি দামে বাগদা চিংড়ি কিনতে চাচ্ছে না। ইউরোপ আমাদের দুর্বলতার কথা বুঝতে পেরেছে। ফলে বাধ্য হয়ে বাংলাদেশের মাছ কোম্পানি মালিকরা ইউরোপ নির্ভর হয়ে পড়েছে। আরও বলেন, এ সমস্যা থেকে রক্ষা পেতে হলে এমনকি চিংড়ি রপ্তানি বাড়তে হলে আমাদের দেশে নতুন নতুন বাজার তৈরি করতে হবে। 
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি শেখ আব্দুল বাকি বলেন, ভোনামী চিংড়ি ২২টি দেশ রপ্তানিতে সহযোগিতা করছে এবং অনেক সুযোগ-সুবিধাও পাচ্ছে তারা। আরও বলেন, ভেনামী চিংড়ির দামের পাশাপাশি উৎপাদন খরচও কম। যার কারণে ভেনামী চিংড়ি উৎপাদনও বেশি হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে বাগদা চিংড়ির (বাক টাইগার) দাম বেশি এবং চাহিদাও অনেক কম। ফলে বায়াররা বাগদা চিংড়ি বেশি দামে কিনতে অনীহা প্রকাশ করছে। এ কারণেই হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি দিন দিন কমছে। বাংলাদেশে ভেনামী চিংড়ি উৎপাদনে সরকারিভাবে অনুমতি না থাকায় উৎপাদনও করতে পারছে না।  
সালাম সী ফুডস্ লিমিটেডের ফ্যাক্টরী ম্যানেজার আবু সুফিয়ান বলেন, ভারতে অত্যাধিক পরিমাণে ভেনামী চিংড়ি উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাংলাদেশের বাগদা চিংড়ির চেয়ে প্রতি পাউন্ডে দুই ডলার কম হওয়ায় বিদেশী ক্রেতারা ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। যার কারণে বাংলাদেশের বাগদা চিংড়ির চাহিদাও কম। কিন্তু উৎপাদন খরচসহ দাম বাড়তি হওয়ায় বিদেশী ক্রেতারা ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। যার কারণে এদেশের মাছ কোম্পানি মালিকরা দৈন্য দশায় ভুগছে। 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

বদলে যাবে মংলা বন্দর

বদলে যাবে মংলা বন্দর

০৩ জুলাই, ২০১৮ ০২:০১













ব্রেকিং নিউজ