খুলনা | শুক্রবার | ২২ জুন ২০১৮ | ৯ আষাঢ় ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

১৯৩০-২০১৪ 

ইতিহাসে ফুটবল বিশ্বকাপ

মোহাম্মদ মিলন | প্রকাশিত ১৪ জুন, ২০১৮ ০১:৩৯:০০

চার বছর পেরিয়ে আসন্ন ক্রীড়াবিশ্বের সবচেয়ে বড় আসর বিশ্বকাপ ফুটবলের। দীর্ঘ প্রতিক্ষার পালা শেষ। এসে গেল ফুটবল বিশ্বকাপের মৌসুম। আজ পর্দা উঠছে ফিফা বিশ্বকাপের ২১তম আসর। এদিন পুরো বিশ্ব মেতে উঠতে যাচ্ছে ফুটবলের উন্মাদনায়, যার আঁচটা পাওয়া যাচ্ছে এখন থেকেই। এক মাস সারা পৃথিবীকে এক সুরে বেঁধে রাখবে সেই এক খেলা। সারা বিশ্ব জুড়ে কয়েক কোটি মানুষ টিভির পর্দাতেই রোনালদো, মেসি, নেইমারদের পায়ের জাদুতে মগ্ন হবেন। এ জন্য বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাস নিয়ে সময়ের খবরের বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে। এতে থাকছে ১৯৩০ সালে প্রথম ফিফা বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে ২০১৪ সালের বিশ্বকাপের নানা বিষয়। 
এক নজরে ১৯৩০ : স্বাগতিক : উরুগুয়ে, চ্যাম্পিয়ন : উরুগুয়ে, রানার্সআপ : আর্জেন্টিনা, অংশগ্রহণকারী দল ১৩ টি।     
১৯৩০ বিশ্বকাপ: ১৯৩০ সালে বিশ্বকাপের প্রথম আসরেই শিরোপায় নাম লেখায় স্বাগতিক উরুগুয়ে। ১৯৩০ সালে উরুগুয়ের স্বাধীনতার শতবছর উদ্যাপনে উরুগুয়েতে ফিফার প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। জুলাই ১৩ থেকে জুলাই ৩০ পর্যন্ত এটি উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার শততম বছর তারা ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ জিতে অনন্য কীর্তি স্থাপন করে। ফাইনালে মুখোমুখি হয় উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনা। এস্তাদিও সেন্তেনারিওতে ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হয় ৩০ জুলাই। ১৩টি দলের অংশগ্রহণের প্রথম বিশ্বকাপে ‘অল ল্যাটিন আমেরিকা’ ফাইনালে উরুগুয়ে ৪-২ গোলে পরাজিত করে আর্জেন্টিনাকে।  
এক নজরে ১৯৩৪ : স্বাগতিক : ইতালি, চ্যাম্পিয়ন: ইতালি, রানার্স আপ: চেকোস্লোভিয়া, মোট অংশগ্রহণকারী দল ১৬টি। 
১৯৩৪ বিশ্বকাপ: ১৯৩৪ সালে ফুটবল ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ইতালিতে। এবারও শিরোপা লাভ করে স্বাগতিক দেশ। ফাইনালে তারা চকোস্লোভিয়াকে ২-১ গোলে হারায়। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে উরুগুয়ে সফর করতে অস্বীকৃতি জানায় ইতালি। ফলে ইতালির মাটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপেও সফর করা থেকে বিরত থাকে উরুগুয়ে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে চ্যাম্পিয়ন দেশের পরের টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ না করার ঘটনা এই একটিই। ইউরোপের মাটিতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপে ১৬টি দল অংশগ্রহণ করেছিল। 
এক নজরে ১৯৩৮ : স্বাগতিক : ফ্রান্স, চ্যাম্পিয়ন: ইতালি, রানার্সআপ: হাঙ্গেরি, অংশগ্রহণকারী দল ১৫টি। 
১৯৩৮ বিশ্বকাপ : বিশ্বকাপ ফুটবলের তৃতীয় আসরে টানা দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জিতে নেয় ইতালি। এই আসরে ১৬টি দলকে বাছাই করা হয়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে বিশ্বকাপের ঠিক আগ মুহূর্তে নিজেদের নাম সরিয়ে নেয় অস্ট্রিয়া। ফলে বাধ্য হয়েই ১৫টি দল নিয়ে আয়োজন করা হয় তৃতীয় বিশ্বকাপের। বিতর্ক এবারও পিছু ছাড়েনি বিশ্বকাপকে। কারণ এ আসরও অনুষ্ঠিত হয় নকআউট পর্বে। মোট ১৫টি ম্যাচ হয় বিশ্বকাপে। ফাইনালে মুখোমুখি হয় ইতালি ও হাঙ্গেরি। আর ফাইনালে ৪-২ গোলে হাঙ্গেরিকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা যেতে আজ্জুরিরা। ব্রাজিল পায় তৃতীয় স্থান।  
এক নজরে ১৯৫০ : স্বাগতিক :  ব্রাজিল, চ্যাম্পিয়ন:  উরুগুয়ে, রানার্সআপ: ব্রাজিল, অংশগ্রহণকারী দল ১৩টি।
বিশ্বকাপ ১৯৫০ : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন সম্ভবপরই হয়ে ওঠেনি। আর ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে ছিল কিছুটা সংশয়। তবে সে সংশয় কাটিয়ে উঠে সফলতার সঙ্গেই মাঠে গড়ায়। ব্রাজিলে চতুর্থ বিশ্বকাপ আসরে ১৩টি দল অংশ নেয়। আগের দুই আসর হয়েছিল অদ্ভুত এক নিয়মে! ছিল না কোন গ্র“প পর্ব। নকআউট পর্বেই হয় বিশ্বকাপ। তবে চতুর্থ বিশ্বকাপে তা থেকে সরে আসে ফিফা। এবার নেয় আরও এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত। নকআউট পর্বতো ছিলই না, ছিল না কোন ফাইনালও। গ্র“প পর্বের সর্বোচ্চ পয়েন্ট সংগ্রহকারী দলকেই চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয়। ম্যাচের শেষভাগে গোল হজম করে উরুগুয়ের কাছে শিরোপা স্বপ্ন চুরি হয় ব্রাজিলের। দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপায় চুমু খায় উরুগুয়ে। ব্রাজিলিয়ানদের হৃদয়ে ক্ষত এঁকে ম্যাচের শেষভাগে গোল করে উরুগুয়েকে ২-১ গোলের জয় এনে দেন ঘিগিয়া। ৮ গোল নিয়ে আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন স্বাগতিক ফরোয়ার্ড আদেমির।  
এক নজরে ১৯৫৪ : স্বাগতিক : সুইজারল্যান্ড, চ্যাম্পিয়ন: পশ্চিম জার্মানি, রানার্সআপ : হাঙ্গেরি, অংশগ্রহণকারী দল ১৬টি। 
বিশ্বকাপ ১৯৫৪: বিশ্বকাপের পঞ্চম আসরের ফাইনালে ৩-২ গোলের ব্যবধানে হাঙ্গেরিকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় পশ্চিম জার্মানি। সুইজারল্যান্ডে ১৬ দল নিয়ে এ বিশ্বকাপের আসর অনুষ্ঠিত হয়। আর বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পায় পশ্চিম জার্মানি। হাঙ্গেরির বিপক্ষে ফাইনালে ৩-২ গোলে জিতে শিরোপায় চুমু খায় দলটি। চতুর্থ বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের মোট ৫টি ভেন্যুতে মোট ২৬টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। যা এখন পর্যন্ত কোন আসরে গড়ে সর্বোচ্চ হওয়ার রেকর্ড।   
এক নজরে ১৯৫৮ : স্বাগতিক : সুইডেন, চ্যাম্পিয়ন: ব্রাজিল, রানার্সআপ: সুইডেন, অংশগ্রহণকারী দল ১৬টি। 
বিশ্বকাপ ১৯৫৮ : ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের ৬ষ্ঠ আসরে স্বাগতিক দল হয় সুইডেন। আগের বিশ্বকাপের মতো এবারও মূল পর্বে জায়গা পায় ১৬টি দেশ। আর ঘরের মাঠে বিশ্বকাপে দারুণ খেলেছিল সুইডেন। কিন্তু ফাইনালে গিয়ে তাদের স্বপ্ন ভাঙ্গে গারিঞ্চার ব্রাজিলের কাছে। এ টুর্নামেন্টেই আবির্ভাব হয় ফুটবলের রাজা পেলের। ফলে প্রথমবারের মতো শিরোপা উল্লাসে মাতে ফুটবল পাগল দেশটি। চূড়ান্ত খেলায় স্বাগতিক সুইডেনকে ৫-২ গোলের ব্যবধানে পরাভূত করে ব্রাজিল প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ বিজয়ী হয়। সুইডেনের মোট ১১টি ভেন্যুতে আসরের ৩২টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। তবে এ বিশ্বকাপেই অবিস্মরণীয় এক রেকর্ড গড়েন ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইন। ১৩টি গোল করে পান সর্বোচ্চ গোলদাতার মর্যাদা। দুইবার হ্যাটট্রিকও করেন তিনি। মাত্র একটি বিশ্বকাপ খেলে ১৩টি  গোলের রেকর্ড আজও অম্লান।  
এক নজরে ১৯৬২ : স্বাগতিক : চিলি, চ্যাম্পিয়ন: ব্রাজিল, রানার্সআপ: চেকোস্লোভাকিয়া, অংশগ্রহণকারী দল ১৬টি। 
বিশ্বকাপ ১৯৬২:  চিলিতে আয়োজিত বিশ্বকাপ ফুটবলের সপ্তম আসরে বাছাই পর্বে ৫৬টি দেশের মধ্যে বেছে নেওয়া হয় ১৬টি দেশ। আগের বিশ্বকাপের মতোই ১৬টি দলকে চার ভাগে গ্র“প করা হয়। ফাইনালে চেকোস্লোভাকিয়াকে ৩-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নেয় ব্রাজিল। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলেন গারিঞ্চা। আর কারণেই এ বিশ্বকাপকে বলা হয় গারিঞ্চার বিশ্বকাপ। সপ্তম বিশ্বকাপে মোট গোল হয় ৮৯টি। টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন ৬ জন খেলোয়াড়। ব্রাজিলের গারিঞ্চা ও ভাভা, চিলির লিওনেল সানচেজ, হাঙ্গেরির ফ্লোরিয়ান আলবার্ট, সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেলেন্তিন ইভামভ এবং যুগোস্লাভিয়ার দ্রাজান জেরকোভিচ প্রত্যেকেই ৪টি করে গোল দেন।  
এক নজরে ১৯৬৬ : স্বাগতিক : ইংল্যান্ড, চ্যাম্পিয়ন: ইংল্যান্ড, রানার্সআপ : পশ্চিম জার্মানি, অংশগ্রহণকারী দল  ১৬টি।  
বিশ্বকাপ ১৯৬৬ : ফুটবলের জন্ম দিয়েছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু তারাই শুরুতে বিশ্বকাপটা মানতে পারেনি। ১৯৫০ সালে প্রথম অংশ নেয় দলটি। চার আসর যেতেই ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ আয়োজন করে ইংলিশরা। তবে শুরুতেই  কেলেঙ্কারি। টুর্নামেন্ট শুরুর কিছু দিন আগে টুরি হয়ে যায় ট্রফি। যদিও সপ্তাহখানেক পর তা ফেরত পায়। এরপর মাঠেও ছিল নানা ধরনের বিতর্ক। বিশ্বকাপের অষ্টম আসরে মূল পর্বে খেলে আগের মতোই ১৬টি দেশ। ওয়েম্বলিতে ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ৪-২ গোলের ব্যবধানে ম্যাচ জিতে ইংল্যান্ড। প্রথমবার বিশ্বকাপ আয়োজন করেই শিরোপায় চুমু খায় তারা। ৯টি গোল দিয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন পর্তুগালের ইউসোবিও। ইংল্যান্ডের জিওফ হার্স্ট এ বিশ্বকাপের ফাইনলে হ্যাটট্রিক করেন। যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে একমাত্র ফাইনালে হ্যাটট্রিক করার রেকর্ড।   
এক নজরে ১৯৭০ : স্বাগতিক : মেক্সিকো, চ্যাম্পিয়ন : ব্রাজিল, রানার্স আপ: ইতালি, অংশগ্রহণকারী দল ১৬টি
বিশ্বকাপ ১৯৭০ : ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপের আসর বসেছিল মেক্সিকোতে। এবারও ১৬টি দলকে বেছে নেওয়া হয় বিশ্বকাপে। মেক্সিকোর মোট ৫টি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় ম্যাচগুলো। ফাইনালে ইতালিকে ৪-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল। প্রথমবারের মতো এবার বিশ্বব্যাপী টিভি’র মধ্যমে সম্প্রচার করা হয়। এ আসরে নান্দনিক ফুটবলের জনক ব্রাজিল অনন্য এক রেকর্ড গড়ে। ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালের পর ব্রাজিল ১৯৭০ সালের আসরেও চ্যাম্পিয়ন হয়ে তিনবার বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্ব দেখায়। একমাত্র দল হিসেবে সর্বোচ্চ তিনবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে চিরতরে ‘জুলেরিমে’ ট্রফি ঘরে তোলে ব্রাজিল। ১৯৭০ বিশ্বকাপে ব্রাজিল দলের মূল তারকা ছিলেন পেলে ও জাইরজিনহো। শিরোপা উল্লাসে মাতে ব্রাজিল। পশ্চিম জার্মানির গার্ড মূলার সর্বোচ্চ ১০ গোল করে গোল্ডেন বুট পুরস্কার পান। সে আসরে দারুণ এক রেকর্ড গড়েন ব্রাজিলের জিয়ারজিনহো। প্রতি ম্যাচেই গোল করেন তিনি। নবম বিশ্বকাপ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে লাল কার্ড ও হলুদ কার্ডের প্রচলন শুরু হয়। যদিও সে বছর কোন খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখেননি।   
এক নজরে ১৯৭৪: স্বাগতিক: পশ্চিম জার্মানি, চ্যাম্পিয়ন : পশ্চিম জার্মানি, রানার্সআপ: নেদারল্যান্ড, অংশগ্রহণকারী দল ১৬টি।   
বিশ্বকাপ ১৯৭৪ : জুলেরিমে ট্রফির অধ্যায়টা আগের আসরেই শেষ করে দিয়েছে ব্রাজিল। তিন বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে চিরতরে নিজেদের করে নেয় ট্রফিটি। তাই বাধ্য হয়েই নতুন করে তৈরি হলো ফিফা বিশ্বকাপ। আর জানিয়ে  দেওয়া হলো তিনবার কেন, ১০০ বার জিতলেও ট্রফিটি দেওয়া হবে না কাউকেই। নতুন আঙ্গিকে, নতুন নিয়মের আসরটি আয়োজক ছিল পশ্চিম জার্মানি। সে বিশ্বকাপে ১৬টি দলের মোট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় ৩৮টি। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানি ২-১ গোলে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। পোল্যান্ডের জেগস লাতো ৭টি গোল দিয়ে হন সর্বোচ্চ গোলদাতা। এ আসরে চিলির কার্লোস কাসজেলি ফুটবল ইতিহাসের প্রথম লাল কার্ডটি দেখেন। 
এক নজরে ১৯৭৮ : স্বাগতিক : আর্জেন্টিনা, চ্যাম্পিয়ন: আর্জেন্টিনা, রানার্সআপ: নেদারল্যান্ড, অংশগ্রহণকারী দল   ১৬টি। 
বিশ্বকাপ ১৯৭৮ : ফুটবল মহাযজ্ঞের ১১তম আসরে ১৬ দলের শেষ বিশ্বকাপ ছিল আর্জেন্টিনায়।  আসরের ফাইনালে মুখোমুখি হয় নেদারল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত সময় ১-১ ব্যবধানে শেষ হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানে আর্জেন্টিনা আরও দুই গোল করে ৩-১ ব্যবধানে জেতে বিশ্বকাপ। এটি আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ জয়। এই আসরে সর্বোচ্চ ৬ গোল করেন মারিও কেম্পেস (আর্জেন্টিনা)। সেরা উদীয়মান খেলোয়াড় আন্তোনিও কাব্রিনি (ইতালি)। ওই আসর পর্যন্ত ১৫ দলের সঙ্গে স্বাগতিকরা অংশ নিতো ফুটবল মহাযজ্ঞে। আর্জেন্টিনার ওই আসরেই ফল নিষ্পত্তির জন্য ফিফা প্রথমবার চালু করে পেনাল্টি শুট-আউট। রিভার প্লেটের ঘরের মাঠ স্তাদিও মনুমেন্তালে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ফাইনাল জিতে পঞ্চম আয়োজক দেশ হিসেবে বিশ্বকাপ জেতে আলবিসেলেস্তেরা। তাদের আগে ঘরের মাঠের বিশ্বকাপ জিতেছিল উরুগুয়ে, ইতালি, ইংল্যান্ড ও পশ্চিম জার্মানি। 
এক নজরে ১৯৮২ : স্বাগতিক : স্পেন , চ্যাম্পিয়ন : ইতালি, রানার্সআপ: জার্মানি, অংশগ্রহণকারী দল ২৪ টি। 
১৯৮২ বিশ্বকাপ : বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলের সংখ্যা ১৬ থেকে বাড়িয়ে করা হলো ২৪, বাড়ল প্রতিযোগিতার পরিধিও। প্রতিটি বিশ্বকাপ যেমন দর্শকদের জন্য নিয়ে আসে নিত্য নতুন নানা ঘটনার সমাহার। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপটাও ছিল প্রতিনিয়ত উত্তেজনায় ঠাসা। এ বিশ্বকাপেই প্রথম টাইব্রেকারের প্রয়োগ হয়। সেমিফাইনালে ফ্রান্স আর পশ্চিম জার্মানির ম্যাচ ৩-৩ গোলে ড্র হওয়ার পর টাইব্রেকারে ফ্রান্স হেরে যায় ৫-৪ গোলে। ফাইনালে মুখোমুখি ইতালি এবং জার্মানি। স্পেনের মাদ্রিদের সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানিকে ৩-১ গোলে হারিয়ে তৃতীয় বারেরমত এবং নতুন ট্রফিতে প্রথমবার শিরোপা জিতে নেয় ইতালি। ইতালির পাওলো রোসি সর্বোচ্চ ৬টি গোল করে জিতে নেন গোল্ডেন বুটের পুরস্কার। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও ওঠে রোসির হাতে। সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়: মানুয়েল আমোরোস (ফ্রান্স)। 
এক নজরে ১৯৮৬ : স্বাগতিক : মেক্সিকো, চ্যাম্পিয়ন : আর্জেন্টিনা, রানার্সআপ : পশ্চিম জার্মানি, অংশগ্রহণকারী দল ২৪টি। 
বিশ্বকাপ ১৯৮৬ : ম্যারাডোনাময় এক বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপ এর আগেও অনেক বড় বড় তারকার জন্ম দিয়েছিল। হয়তো আরও বড় তারকারও জন্ম দেবে; কিন্তু ১৯৮৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টাইন দিয়েগো আর্মান্দো ম্যারাডোনা যা  দেখিয়েছেন বিশ্বকে, সেটা বিস্ময়কর বললে কমই বলা হবে। একক কৃতিত্ব আর নৈপুণ্য দিয়ে একটি দেশকে কেউ বিশ্বকাপ জেতাতে পারেন, সেটা দেখালেন তিনি। যে কারণে সর্বকালের সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি এঁটে গেলো তার নামের পাশে। শিরোপা আর্জেন্টিনার হলেও বিশ্বকাপটা হয়ে রইল পুরো ম্যারাডোনাময়। পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে শিরোপা নিজেদের করে নেয় আর্জেন্টিনা। ১৩ তম বিশ্বকাপটা অনুষ্ঠিত হয়েছে মেক্সিকোয়। ইংল্যান্ডের গ্যারি লিনেকার ৬ গোল করে গোল্ডেন বুট জিতলেও অসাধারণ খেলার জন্য গোল্ডেন বল জেতেন ম্যারাডোনা। টুর্নামেন্টে  মোট ৫টি গোল করেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। সঙ্গে ৫টি অ্যাসিস্টও করেন তিনি। ’৮২’র মতই ২৪ দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বকাপ। 
এক নজরে ১৯৯০ : স্বাগতিক : ইতালি, চ্যাম্পিয়ন: পশ্চিম জার্মানি, রানার্সআপ: আর্জেন্টিনা, অংশগ্রহণকারী দল ২৪  টি।
১৯৯০ বিশ্বকাপ : ১৯৮৬ সালে জার্মানদের স্বপ্ন ভেঙে ডিয়েগো ম্যারাডোনার বীরত্বে মেক্সিকোর আসরে শিরোপা উদযাপন করেছিল আর্জেন্টিনা। ১৯৯০ সালের আসরে ফাইনালে মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা-পশ্চিম জার্মানি। ফাইনালে জার্মানরা ১-০ গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো জেতে বিশ্বকাপ শিরোপা। বিশ্বকাপের ১৪ তম আসরের আয়োজক ছিল ইতালি। মূল পর্বে জায়গা পায় ২৪ দল। সর্বোচ্চ ৬ গোল করে সেরা খেলোয়াড় হয় সালভাতোর স্কিলাকি (ইতালি)। সেরা উদীয়মান খেলোয়াড় হয় রবার্ত প্রোসিনেস্কি (যুগোস্লাভিয়া)। ১৯৯০ সালের আসরকে বিবেচনা করা ‘সবচেয়ে বাজে বিশ্বকাপ’ হিসেবে। নকআউট পর্বের চারটি ম্যাচ নিষ্পত্তি হয়েছিল পেনাল্টি শুট-আউটে, ম্যাচপ্রতি গোল গড় ছিল ২.২১, লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল ১৬বার, যেখানে আবার প্রথমবারের মতো ফাইনালে ছিল লাল কার্ড দেখানোর ঘটনা। ফাইনালে জার্মানদের বিপক্ষে এবার পারেনি ম্যারাডোনারা। 
এক নজরে ১৯৯৪ : স্বাগতিক : যুক্তরাষ্ট্র, চ্যাম্পিয়ন: ব্রাজিল, রানার্সআপ: ইতালি, অংশগ্রহণকারী দল ৩২টি। 
বিশ্বকাপ ১৯৯৪ : যুক্তরাষ্ট্রের ৯টি শহরের নয়টি মাঠে অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ। ৯টি শহরে ১৭ জুন  থেকে ১৭ জুলাই অনুষ্ঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপের ১৫তম আসরের মাসকট ছিল ‘স্ট্রাইকার’ নামের যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার আদলে বানানো একটি কুকুর ছানা। ৩১ দিন ধরে মার্কিন মুলুকে চলে ৫২ ম্যাচের লড়াই। এই বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল ৩২টি দল। যুক্তরাষ্ট্রের লস এ্যাঞ্জেলস শহরের রোজ বল মাঠে গড়ানো ফাইনালে নামে ইতালি ও ব্রাজিল। সেবারের ফাইনালে দু’দল লড়েছিল একদম সমানে সমানেই। বিশ্বকাপে এবারই প্রথম টাইব্রেকারে নির্ধারিত হয় ফাইনালের ফলাফল। নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষ হওয়ার পর আরও ৩০ মিনিট খেলা হলো; কিন্তু কোনো দলই গোল করতে পারল না। খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে। টাইব্রেকারে ব্রাজিল ৩-২ গোলে ইতালিকে পরাজিত করে। ৬টি গোল করে বুলগেরিয়ার রিস্টো স্টয়েসকভ রাশিয়ার ওলেগ সালেঙ্কোর সঙ্গে জেতেন গোল্ডেন বুটের পুরস্কার। নিজেদের ইতিহাসের চতুর্থ শিরোপাটা উঁচিয়ে ধরেন সেলেসাওদের দলনায়ক দুঙ্গা।   
এক নজরে ১৯৯৮ : স্বাগতিক : ফ্রান্স, চ্যাম্পিয়ন: ফ্রান্স, রানার্সআপ: ব্রাজিল, অংশগ্রহণকারী দল ৩২টি। 
বিশ্বকাপ ১৯৯৮ : ফিফা’র প্রতিষ্ঠাতা ফ্রান্স। যার হাত ধরে তৈরি হয়েছিল বিশ্বকাপের মঞ্চ, সেই জুলে রিমের দেশ ফ্রান্সের মাঠে গড়ায় ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ। কিন্তু যাদের হাতে বিশ্বকাপ সৃষ্টি তারাই এতদিন ছিল ট্রফি শূন্য। অবশেষে নিজেদের মাটিতেই শিরোপা জেতে ফ্রান্স। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার ৬৮ বছর পর অধরা শিরোপা স্বাদ পায় তারা। ফাইনালে জিদানের জোড়া গোলে ব্রাজিলকে পরাজিত করে ফ্রান্স। আর বিশ্বকাপ জিতিয়ে ফ্রান্সের নায়ক হয়ে ওঠেন জিনেদিন জিদান। আসরে সর্বোচ্চ ৬ গোল করে গোল্ডেন বুট জেতেন ক্রোয়েশিয়ার দেভর সুকর। গোল্ডেন বল জিতে নেন ব্রাজিলের রোনালদো। এই আসরেই প্রথম ২৪ দল থেকে বেড়ে বিশ্বকাপের লড়াইয়ে অংশ নেয় ৩২ দল। 
এক নজরে ২০০২ : স্বাগতিক : দক্ষিণ কোরিয়া-জাপান, চ্যাম্পিয়ন : ব্রাজিল, রানার্সআপ : জার্মানি, অংশগ্রহণকারী দল ৩২টি।  
২০০২ বিশ্বকাপ: এশিয়ার মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপের আয়োজন করে যৌথভাবে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম এই আয়োজনটি ছিল অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্ণ। ২০০২ সালের বিশ্বকাপে বাছাই পর্বে সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ করে ১৯৮টি দেশ। ১৯৯৪ সালে বিশ্বকাপ জিতেছিল ফুটবল ব্রাজিল। মাঝে ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে সেটা তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। তবে এক বিশ্বকাপ বাদে আবারও নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন করে সেলেসাওরা। রোনালদো এই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৮ গোল করেন। ১৯৭০ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে জার্ড মুলারের ১০ গোল করার পর এটিই কোন আসরে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত গোল। ফাইনালে জার্মানিকে ২-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা জিতে নেয় ব্রাজিল। ব্রাজিলের হয়ে দু’টি গোলই করেন রোনালদো।   
এক নজরে ২০০৬ : স্বাগতিক : জার্মানি, চ্যাম্পিয়ন : ইতালি, রানার্সআপ : ফ্রান্স, অংশগ্রহণকারী দল ৩২টি। 
২০০৬ বিশ্বকাপ: ২০০৬ সালে এবারও ৩২টি দল অংশগ্রহণ করেন। শিরোপার চূড়ান্ত লড়াইটি ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর। ফাইনালে উঠেছিল ফ্রান্স ও ইতালি। শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে প্রবল চাপে পড়ে ফ্রান্স। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়েও খেলা ১-১ গোলে ড্র থাকে। শিরোপা নির্ধারণের জন্য খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে ফ্রান্সকে ৫-৩ গোলে হারিয়ে শিরোপা জিতে নেয় ইতালি। ২০০৬ সালের বর্ষসেরা খেলোয়াড় ফ্রান্সের জিনেদিন জিদানের ‘ঢুস কান্ড’ ঘটে এই ফাইনালে। এটি ছিল ফ্রান্সের খেলোয়াড় জিনেদিন জিদানের ফুটবল ক্যারিয়ারের সর্বশেষ আন্তর্জাতিক খেলা, এবং তিনি এই খেলায় লাল কার্ড পেয়ে মাঠ থেকে বিতাড়িত হন। এই আসরে সর্বোচ্চ ৫ গোল করেন জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোজা। সেরা খেলোয়াড় হয় ফ্রান্সের জিনেদিন জিদান। সেরা তরুণ খেলোয়াড় হয় জার্মানি লুকাস পোদোলস্কি।   
এক নজরে ২০১০ : স্বাগতিক : দক্ষিণ আফ্রিকা, চ্যাম্পিয়ন: স্পেন , রানার্সআপ: হল্যান্ড, অংশগ্রহণকারী দল ৩২টি।  
বিশ্বকাপ ২০১০ : প্রথমবারের মতো কোন দেশ ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পায়। আর দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো শিরোপা জিতে নেয় স্পেন। ১১ জুলাই জোহানেসবার্গে হল্যান্ডের সঙ্গে ফাইনালে খেলতে নামে স্পেন। প্রথমবারের মত স্পেনের জন্য বিশ্বকাপ ফাইনাল। ২০১০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের সঙ্গে ১-০ গোলে হেরে যায় হল্যান্ড। জোহাসেনবার্গের ফাইনাল ম্যাচ মাঠে বসে উপভোগ করেন দক্ষিণ আফ্রিকার মহান নেতা ম্যান্ডেলা। এই আসরে অংশ নেয় ৩২টি দল। জার্মানি তৃতীয় ও উরুগুয়ে চতুর্থ স্থান অধিকার করে এই বিশ্বকাপে। উরুগুয়ের স্ট্রাইকার দিয়েগো ফোরলান সোনার বল ও জার্মানির তরুণ স্ট্রাইকার থমাস মুলার জিতে নেন সোনার বুট। 
এক নজরে ২০১৪ : স্বাগতিক : ব্রাজিল, চ্যাম্পিয়ন : জার্মানি, রানার্সআপ: আর্জেন্টিনা, অংশগ্রহণকারী দল ৩২টি। 
বিশ্বকাপ ২০১৪ : ২০১৪ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপের ২০তম আসরে জার্মানরা মিটিয়েছিল ২৪ বছরের আক্ষেপ। তবে লিওনেল মেসিদের ২৮ বছরে ধরে না ছুঁতে পারা শিরোপাটা রয়ে গিয়েছিল অধরাই। ব্রাজিলের মোট ১২টি শহরের ১২টি মাঠে অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ। ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে গটজার দূরন্ত গোলে চতুর্থবারের জন্য বিশ্বজয়ী হয় জার্মানি। ১১৩ মিনিটের মাথায় গোল করে জার্মানি। অতিরিক্ত সময়ে ২ মিনিট বাকি থাকলে ফ্রি কিকের শেষ সুযোগ পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু প্রবল চাপের মুখে পড়ে সে সুযোগ হারালেন আর্জেন্টিনার তারকা ফুটবলার মেসি। ১৯৯০-এরই পুনরাবৃত্তি হয় ২০১৪ সালে। শুধু তফাৎ সেবার মারাদোনা নয়, পরাজিত হয় মেসির আর্জেন্টিনা। ২০১৪ বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট লাভ করেন কলম্বিয়ার হামেস রদ্রিগুয়েজ। এই বিশ্বকাপে গোল্ডেন বল লাভ করেন আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি।  


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ




বিশ্বকাপ জিতবে কোন দেশ?  

বিশ্বকাপ জিতবে কোন দেশ?  

১৪ জুন, ২০১৮ ০১:৩৮

বিশ্বকাপের বল টেলস্টার -১৮

বিশ্বকাপের বল টেলস্টার -১৮

১৪ জুন, ২০১৮ ০১:৩৮









ব্রেকিং নিউজ












বিশ্বকাপে আজকের খেলা

বিশ্বকাপে আজকের খেলা

২২ জুন, ২০১৮ ০০:৪৫