রাঙামাটি ও কক্সবাজারে পাহাড় ধসে নিহত ১৩


রাঙামাটি ও কক্সবাজারে অতিবৃষ্টিতে পাহাড় ধসে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এক বছর আগে যে দিনে রাঙামাটির বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসে শতাধিক মানুষ মারা গিয়েছিল, সেই দিনটিতে ফের একই ঘটনা ঘটল।  
রাঙামাটি : জেলা নানিয়ারচর উপজেলায় পাহাড় ধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১১ জন হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে উপজেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কোয়ালিটি চাকমা মৃত্যুর বিষয়টি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।
কোয়ালিটি চাকমা জানান, উপজেলার বড়পুলপাড়ায় দুই পরিবারের চারজন, ধর্মচরণকার্বারিপাড়ায় একই পরিবারের চারজন এবং হাতিমারা এলাকায় দু’জন, গিলাছড়ি ইউনিয়নের মনতলা এলাকায় একজন মারা গেছেন। টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড় ধসে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
নানিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল্লা আল মামুন এবং নানিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল লতিফ পাহাড় ধসের ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও কতজন মারা গেছেন, তা জানাতে পারেননি।
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক এ কে এম মামুনুর রশীদ বলেছেন, স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে মৃত্যুর বিষয়টি জেনেছেন। পাহাড় ধসের কারণে সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক না থাকায় ইউএনও কিংবা ওসি ওই এলাকাগুলোতে এখনো পৌঁছাতে পারেননি। তাই নিশ্চিত করেই ঠিক কতজন নিহত বা নিখোঁজ রয়েছেন, তা জানাতে সময় লাগছে।
গত বছরের ভয়াবহ ধসে ১২০ জন মারা গেলেও নানিয়ারচরে কেউ মারা যায়নি। ওই ধসের পর জেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ বসববাসকারীদের যে তালিকা করেছেন, তাতে নানিয়ারচর উপজেলার চার ইউনিয়নে ২৩৯ পরিবারের এক হাজার ১১১ জনকে রাখা হয়।
কক্সবাজার : টানা চার দিনের ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টিতে কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে ক্যাম্পের অন্তত ৩ শতাধিক ঘর পানিতে তলিয়ে ও বিধ্বস্ত হয়েছে গেছে। এছাড়া এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে রোহিঙ্গা শিশু ও যুবকের মৃত্যু হয়েছে।  
জানা যায়, উখিয়া উপজেলার জামতলী এলাকায় গাছ চাপা পড়ে মোহাম্মদ আলী নামে রোহিঙ্গা যুবকের মৃত্যু হয়। এ ব্যাপারে উখিয়া থানার ওসি মোঃ আবুল খায়ের বলেন, মঙ্গলবার সকালে ঝড়ো হাওয়ার সময় গাছ চাপা পড়ে রোহিঙ্গা যুবক মোহাম্মদ আলীর মৃত্যু হয়। তার মরদেহ উদ্ধার করে ক্যাম্পের একটি হাসপাতালে রাখা হয়েছে।
অপর দিকে সোমবার কুতুপালং এলাকার ৭ নম্বর ক্যাম্পের আবদুস শুক্কুরের বাড়ির মাটির দেয়াল বৃষ্টিতে ভিজে ভেঙে পড়ে তার ঘুমন্ত ২ বছর বয়সী সন্তানের মৃত্যু হয়।
টানা বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি বিধ্বস্ত হয়েছে বালুখালী, টিভি রিলে কেন্দ্র লাগোয়া এলাকা, ক্যাম্প ৫ ও ১৭ এলাকায়। পাশাপাশি আহত হয়েছে কয়েকজন রোহিঙ্গা। পাশাপাশি বৃষ্টির পানিতে ডুবে গেছে বালুখালীসহ নিচু এলাকার কয়েকটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প।
উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ নিকারুজ্জামান চৌধুরী জানান, কুতুপালং ক্যাম্পের ডি-ফোর এবং ডি- সেভেন ব্লকে ঝড়ো বাতাস ও পাহাড়ধসে ৩ শতাধিক ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। পাহাড় ধসের পাশাপাশি ভারি বৃষ্টিতে ক্যাম্পের কয়েকটি নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
কক্সবাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোঃ আবুল কালাম জানান, টানা বৃষ্টির কারণে ক্যাম্পে ছোট-খাটো ভূমিধসের ঘটনা ঘটছে। বিধ্বস্ত হয়েছে বেশকিছু রোহিঙ্গার ঘর।
স্থানীয় আবহাওয়া অফিস জানিয়েছেন, উত্তর বঙ্গোপসাগরে মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালা সৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। এতে উত্তর বঙ্গোপসাগর, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা এবং সমুদ্র বন্দরসমূহের উপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দর সমূহকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার সমূহকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।
এদিকে টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলার বেশ ক’জন রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, অতিবৃষ্টির কারণে তাদের কষ্টের অন্ত নেই। নির্ঘুম রাত ও কাদা মাটি মাড়িয়ে প্রয়োজনীয় স্থানে যাতায়াত করতে হচ্ছে। পাশাপাশি আবার অনেক রোহিঙ্গা ঠিকমত খাবার পাচ্ছেন না।
তিন পার্বত্য জেলার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন : প্রবল বর্ষণে চট্টগ্রামের সঙ্গে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে; আংশিক বন্ধ রয়েছে বান্দরবানের সঙ্গে চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ।
মঙ্গলবার ভোর থেকে সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি উঠায় খাগড়াছড়ির সাথে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় বলে জানিয়েছেন হাইওয়ে পুলিশ নাজিরহাট ফাঁড়ির কর্মকর্তা মুজিবর রহমান। তিনি বলেন, প্রবল বর্ষণের সাথে পাহাড়ি ঢলে কারণে সড়কের বিভিন্ন স্থানে হাঁটু থেকে বুক সমান পানি হয়েছে, যার কারণে দুই দিক থেকেই যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
স্থানীয়রা জানান, নাজিরহাট মাইজভান্ডার সড়ক, গহিরা হোয়াঁকো সড়ক, ফটিকছড়ি কাজীর হাট সড়কসহ বিভিন্ন স্থানে হাঁটু থেকে বুক সমান পানি হয়ে গেছে।
এদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনেও পানি উঠেছে বলে জানান চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দিকী। তিনি বলেন, “হাসপাতালের নিচতলা পানির নিচে। ফলে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সাপেকাটা চার রোগীকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।”
এদিকে দ্বিতীয় দিনের মতো বন্ধ আছে চট্টগ্রামের সাথে রাঙামাটির সড়ক যোগাযোগ। এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পানি উঠলেও আমিলাইশ, চরতি, নলুয়া ইউনিয়নের মানুষ পুরোপুরি পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।


footer logo

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।