খুলনা | মঙ্গলবার | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ১০ আশ্বিন ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

রোগীদের জিম্মি করে রেখেছে শতাধিক বহিরাগত

খুমেক হাসপাতালে ফ্রি-সার্ভিস কর্মীর সঠিক সংখ্যা জানেন না ওয়ার্ড মাস্টার ও তত্ত্বাবধায়ক!

বশির হোসেন | প্রকাশিত ১০ জুন, ২০১৮ ০০:৪৫:০০

নির্ধারিত কোন পোশাক বা পরিচয় পত্র নেই। অফিসের কোন তালিকায় কোন নাম পরিচয় নেই। নির্দিষ্ট কোন নিয়োগ দাতাও নেই। অথচ ওয়ার্ড মাস্টারকে টাকা দিলেই সে হাসপাতালের কর্মচারী। ফ্রি সার্ভিস হিসেবে রোগীদের পাশাপাশি পুরো হাসপাতালকেই জিম্মি করে ফেলেছে এরা। মানছেনা ডাক্তার বা সিস্টার কাউকেই। আর বর্তমানে ফ্রি-সার্ভিস কর্মীর সংখ্যা কত তা তত্ত্বাবধায়ক বা ওয়ার্ড মাস্টার কেউই জানেন না। এদিকে ফ্রি-সার্ভিস এর নামে বহিরাগতদের পেয়ে কোন কাজ করছে না হাসপাতালের ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা। হাসপাতালের রোগীরা বলছে এর চেয়ে বড় নৈরাজ্য আর হয় না। গায়ে হাত তুলে টাকা নেয় এরা।
ইজিবাইক এক্সিডেন্টে ফুলতলার জামিরা এলাকার দিনমজুর রহমান আলীর স্ত্রী সায়েরা খাতুনকে (৬০) খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে এলে সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করেন ইমার্জেন্সী মেডিকেল অফিসার। তাকে হাসপাতালের ট্রলিতে করে তৃতীয় তলায় নিয়ে গেলে ১০০ টাকা দাবি করেন এক ফ্রি সার্ভিস কর্মী। ৫০ টাকা দিতে চাইলে দুর্ব্যবহার শুরু করেন রোগীর সাথে। বলেন,  আমরা বেতন পাই না। এগুলো দিয়ে চলি। ১০০ টাকার কমে রোগী নামাতে দেবো না। কাছে ওষুধ কেনার টাকা না থাকলেও বাধ্য হয়ে ১০০ টাকা দিয়ে হাসপাতালের বারান্দায় জায়গা হয় সায়েরা খাতুন-এর। একই দিন মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক ভ্যনচালকের মৃত্যু হয়। দোতালা থেকে লাশ নামিয়ে ভ্যানে ওঠানোর আগে একশ’ টাকা দাবি করে বসেন এক মহিলা। যদিও ট্রলি নিজেরাই টেনে নিয়ে এসেছেন মৃতের স্বজনেরা। শোকে বিহব্বল হতদরিদ্র পরিবারের কাছে কোন টাকা না থাকায় লাশ নামাতেই দেয়নি এ ফ্রি সার্ভিস আয়া। পরে ধার করে টাকা দিয়ে লাশ নিয়ে যেতে হয়। গত দু’দিন সরেজমিন হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে মিলেছে এমন চিত্র। কলেজ শিক্ষক এম এম আসলাম উদ্দিন জানান, তিনি কেবিন নিয়েছিলো। ওঠার আগে কেবিন পরিষ্কার করে ২০০ টাকা দাবি করে এক ফ্রি সার্ভিস কর্মী। এ নিয়ে রীতিমত চেচামেচির পর অবশেষে ১৫০ টাকায় ক্ষান্ত হন তিনি। জরুরী বিভাগ, বিভিন্ন ওয়ার্ড আর বহির্বিভাগে প্রতিদিন এ ধরনের অন্তত অর্ধশত ঘটনা ঘটছে। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর স্বজন মোঃ লিয়াকত আলী খান বলেন, ফ্রি সার্ভিস মানে কি, ভলেন্টারি সার্ভিস। মানুষ সরকারি হাসপাতালে আসে ফ্রি চিকিৎসা নিতে। আর এখানে রোগী ওয়ার্ডে নিতে নিতে হতদরিদ্র মানুষগুলোর টাকা শেষ হয়ে যায়। এদের নির্মূল না করা গেলে এই হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শতাধিক বহিরাগত জিম্মি করে রেখেছে দক্ষিণ বঙ্গের সর্ববৃহৎ স্বাস্থ্যসেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। সরেজমিন দেখা গেছে, আউটডোরের ফ্রি সার্ভিস কর্মীরা ডাক্তারদের এটেনডেন্ট  হিসেবে কাজ করলেও এদের বেশির ভাগই বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালাল। ওয়ার্ডের ফ্রি সার্ভিস কর্মীদের ড্রেসিং করা ও ওয়ার্ড পরিষ্কার করার কথা থাকলেও কোন কাজই ফ্রিতে হয় না। রীতিমত জুলুম করে রোগীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে তারা। এছাড়া সাপ্লাই ওষুধ বিক্রির অভিযোগে বর্তমান সুপার বাদ দিয়েছেন একাধিক ফ্রি সার্ভিস কর্মীকে। জরুরী বিভাগে ট্রলি নিয়ে রোগীদের ওঠা নামা করার জন্য জোর করে টাকা আদায় আর রান্না ঘরে ফ্রি সার্ভিসে কাজ করা কর্মীদের বিরুদ্ধে খাবার চুরির অভিযোগে বাদ দেয়া হয়েছে অপর এক ফ্রি সার্ভিস কর্মীকে।
জানা গেছে, অবৈধ এসব বহিরাগতদের প্রশ্রয়দাতা হিসেবে ওয়ার্ড মাস্টার আতাউর এর নাম সবার মুখে মুখে। ১০ থেকে ২০ হাজার টাকায় ফ্রি সার্ভিস কর্মী নিয়োগ দেয় আতাউর। তত্ত্বাবধায়ককে না জানিয়েই কাজে লাগিয়ে দেন বিভিন্ন ওয়ার্ডে। চুরির অভিযোগসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ফ্রি সার্ভিস কর্মীদের বাঁচাতে সবার আগে এগিয়ে আসেন তিনি। তবে ওয়ার্ড মাস্টার আতাউর রহমান বলেন, ফ্রি সার্ভিস আছে ৭০-৭৫ জনের মত। কোথাও কোন লিখিত নেই। তত্ত্বাবধায়কের অনুমতি নিয়ে নয়, ওয়ার্ডের ডাক্তারদের প্রয়োজন হলেই সেখানে কাজে লাগাই। তবে টাকা নিয়ে কাজে লাগানোর বিষয়টি মিথ্যে।
তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার এটিএম মোর্শেদ বলেন, ফ্রি সার্ভিস কর্মীদের নিয়ে আমিও অনেক ঝামেলায় আছি। কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণ নিতে পারছি না। আমি জানিও না হাসপাতালে কত ফ্রি সার্ভিস কর্মী আছে। খুব শিগগিরই এদের নিয়ন্ত্রণে আনা হবে সকলের সহযোগিতা নিয়ে।


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ