খুলনা | শুক্রবার | ১৭ অগাস্ট ২০১৮ | ২ ভাদ্র ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

নির্বাচন যেতে না যেতেই 

সিটি কর্পোরেশনের ৬ কাউন্সিলর আওয়ামী লীগে যোগদানের গুঞ্জন

আশরাফুল ইসলাম নূর | প্রকাশিত ২০ মে, ২০১৮ ০০:৪৭:০০

খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) নির্বাচন যেতে না যেতেই নব-নির্বাচিত কাউন্সিলরদের দল বদলের গুঞ্জন উঠেছে। এর মধ্যে বিএনপি মনোনীত তিন জন, বহি®কৃত দু’জন ও জামায়াতে ইসলামী মনোভাবের একজন কাউন্সিলর রয়েছেন। নির্বাচনের পরদিন বিকেলে ফুলের তোড়া দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়ের এ খবর জানাজানি হলে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম কৌতুহল সৃষ্টি হয়। আর এ গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
সূত্রমতে, গত ১৬ মে বিকেলে নব-নির্বাচিত ছয় কাউন্সিলর আওয়ামী লীগ নেতা ও বাগেরহাট-১ আসনের এমপি শেখ হেলাল উদ্দিনের সাথে তার খুলনার বাসভবনে সাক্ষাত করেন। এ সময় ফুলের তোড়া দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন কেসিসি’র প্যানেল মেয়র-১ ও ১৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আনিছুর রহমান বিশ্বাস, প্যানেল মেয়র-২ ও ১৭নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শেখ হাফিজুর রহমান হাফিজ, ২০নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বিএনপি নেতা শেখ মোঃ গাউসুল আজম, ৭নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর বিএনপি নেতা সুলতান মাহমুদ পিন্টু, ২৬নং ওয়ার্ডের স্বতন্ত্র কাউন্সিলর মোঃ গোলাম মওলা শানু এবং বিএনপি মনোনীত ৬নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলর শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ প্রিন্স। শুভেচ্ছা বিনিময়কালে উপস্থিত ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি নবনির্বাচিত মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক, সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ মিজানুর রহমান এমপি, কেন্দ্রীয় সদস্য এস এম কামাল হোসেন, শেখ সৈয়দ আলী ও এড. সাইফুল ইসলাম প্রমুখ।
দলীয় সূত্রমতে, নগর বিএনপি’র সদ্য বহিষ্কৃত যুগ্ম-সম্পাদক বর্তমান প্যানেল মেয়র-২ শেখ হাফিজুর রহমান হাফিজ বিএনপি’র মনোনয়নে কাউন্সিলর প্রার্থী হয়ে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেকের পক্ষে নৌকা প্রতীকে ভোট চান। গত ৫ মে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বহিষ্কার করা হয় ষষ্ঠবারের মতো নির্বাচিত এ কাউন্সিলরকে। তাঁর নিকটজনদের থেকে জানা যায়, আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী প্রয়াত এস এম আব্দুর রব শাহাদাতের পর ২০০২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন শেখ হাফিজুর রহমান হাফিজ। এস এম রবের বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তিনি। তার আগে প্রভাবশালী রাজনীতিক এস এম রবের সাথে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টির সাথে যুক্ত ছিলেন শেখ হাফিজুর রহমান হাফিজ। রাজনীতিতে পাল্টিবাজি নতুন নয় বলে মন্তব্য তার ঘনিষ্ঠদের।
নগর বিএনপি’র স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক আনিছুর রহমান বিশ্বাষের পদ-পদবী স্থগিত হয় পাঁচ-ছয় বছর পূর্বেই। তার আগে মহানগর যুবদলের সহ-সভাপতির পদ থেকে বহি®কৃত হন তিনি। তরুণ এ জনপ্রতিনিধি ১৬নং ওয়ার্ডে চতুর্থবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পূর্বে সরকার বিরোধী আন্দোলনে মাঝে-মধ্যে রাজপথে দেখা যেত তাকে। তবে দলের পদ-পদবী হারিয়ে দলীয় কর্মকান্ডে নিষ্ক্রীয় হয়ে যান তিনি। বাড়তে থাকে দলের সাথে দূরত্ব। ২০১৫ সালের ৩ নভেম্বর প্যানেল মেয়র-১ আনিসুর রহমান বিশ্বাষ খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পেলে তখনি আলোচনা উঠেছিল-আওয়ামী লীগের সাথে তার ঘনিষ্ঠতার। গুঞ্জন উঠেছিল আওয়ামী লীগে যোগ দিচ্ছেন তিনি। এছাড়া পরিবারে রয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা।
বিএনপি’র একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বললেন, “কাউন্সিলর হাফিজ ও আনিস বিশ্বাষ জন্মসূত্রে মুসলিম লীগ পরিবারের হলেও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের সাথে ঘনিষ্ঠতাই বেশি তাদের। দু’জনই বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত। তাই তাদের সম্পর্কে মন্তব্যও করতে চান না বিএনপি নেতারা।”
একই পরিবারের সদস্য ৭নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর সুলতান মাহমুদ পিন্টু। বিএনপি’র মনোনয়নে তৃতীয়বারের মতো কাউন্সিলর নির্বাচিত হলেন তিনি। পিতা বিএনপি নেতা কাউন্সিলর শেখ রুহুল আমিনের ইন্তেকালের পর উপ-নির্বাচনে বড় ছেলে সুলতান মাহমুদ পিন্টুকে মনোনয়ন দেয় দলটি। সেই উপ-নিবাচন থেকে এ পর্যন্ত তিনবার ৭নং ওয়ার্ডে বিএনপি’র একক প্রার্থী হিসেবে তিনি নির্বাচিত কাউন্সিলর সুলতান মাহমুদ পিন্টু বিএনপি’র বিশ্বস্ত কর্মী। দৌলতপুরে শেখ শহিদুল ইসলাম ওরফে হজী শহিদ হত্যা মামলায় গত বছরের ২৯ মে আদালতে জামিন নামঞ্জুর হওয়ায় কাউন্সিলর পিন্টুকে কারাগারে পাঠানো হয়। এছাড়াও অন্য মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব মামলা থেকে রেহাই পেতে ক্ষমতাসীন দলে ভিড়তেও পারেন বলে মনে করছেন ওয়ার্ড বিএনপি’র শীর্ষ নেতারা। এ ব্যাপারে জানতে কাউন্সিলর সুলতান মাহমুদ পিন্টুর ব্যবহৃত মোবাইলে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
অন্যদিকে, ৬নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলর শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ প্রিন্স বিএনপি নেতা প্রয়াত কাউন্সিলর মোঃ শওকত হোসেনের পুত্র। গেল বছরের ১৩ ডিসেম্বর পিতার ইন্তেকালের পর গত ২৯ মার্চ বিএনপি’র মনোনয়নে উপ-নির্বাচনে পিতার আসনে বসেন শামসুদ্দিন আহমেদ প্রিন্স। সদ্য সম্পন্ন গত ১৫ মে কেসিসি নির্বাচনেও বিএনপি’র মনোনয়নে বিপুল ভোটের ব্যবধানে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়ে স্থানীয় কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক গুঞ্জন শুরু হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। নব-নির্বাচিত কাউন্সিলর শামসুদ্দিন আহমেদ প্রিন্স বললেন, “শুধুমাত্র নব-নির্বাচিত মেয়রের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য সেখানে গিয়েছিলাম। অন্য কিছু নয়। বিএনপি ছাড়ার তো প্রশ্নই উঠে না।”
এদিকে, নগরীর ২০নং ওয়ার্ডে বার বার নির্বাচিত কাউন্সিলর শেখ গাউসুল আজম স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় ছাত্রদলের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। পরবর্তীতে মহানগর যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সংসদের সদস্য ছিলেন। গেল বছরের ২৬ অক্টোবর মহানগর বিএনপি’র ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন তিনি। এ থেকে তার দীর্ঘ ৩৫ বছর বিএনপি’র রাজনীতির যবনিকা ঘটে। তবে পদত্যাগের পরও দলীয় কর্মকান্ডে তার সরব উপস্থিতি ছিল লক্ষ্যণীয়। এজন্য বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলীয় মনোনয়নও পেয়ে যান তিনিই। নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে এই নেতার শুভেচ্ছা বিনিময়ে ক্ষুব্ধ তৃণমূল নেতা-কর্মীরা। এ ব্যাপারে কাউন্সিলর শেখ মোঃ গাউসুল আজম বলেন, “নির্বাচনের পরদিন এলাকাবাসীর বাড়ি বাড়ি গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছিলাম। পরে ওই বাড়িতে গিয়ে দেখি সেখানে শেখ হেলাল উদ্দিন এমপি, নব-নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলররা রয়েছে। তাদের সাথেও শুভেচ্ছা বিনিময় করেছি। বাড়িটি আমার ওয়ার্ডের মধ্যেই। ওখানে আওয়ামী লীগে যোগদানের কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়নি। তাছাড়া যোগদান হলে তো আনুষ্ঠানিক ও অনুষ্ঠানের প্রয়োজন; সেখানে তেমন কিছুই ছিল না।”
২৬নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোঃ গোলাম মওলা শানু নগরীর পশ্চিম বানিয়াখামারের মোল্লা মোঃ খলিলুর রহমানের ছেলে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে টানা চতুর্থবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। এলাকায় বেশ জনপ্রিয় এ কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে খুলনা ও সোনাডাঙ্গা থানাসহ বিভিন্ন থানায় একাধিক হত্যাসহ কয়েকটি মামলা রয়েছে। সর্বশেষ, ২০১৩ সালের ৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় নগরীর বসুপাড়া-বাঁশতলা মোড় এলাকার রেজওয়ান হোসেন সুমন হত্যা মামলায় গত ৩ ফেব্র“য়ারি খুলনার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মোসাম্মাৎ দিলরুবা সুলতানার আদালতে আত্মসমর্পণ করেন তিনি। ছাত্র জীবন থেকে ইসলামী আর্দশভিত্তিক রাজনীতিতে হাতে খড়ি শানু মোল্লা প্রথমে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ‘সাথী’ ছিলেন। বাইরে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে বিতর্ক থাকলেও ওয়ার্ডবাসীর কাছে যোগ্য ও দক্ষ জনপ্রতিনিধি গোলাম মওলা শানু সকলের আশ্রয়স্থল। কেসিসি’র ২০০৮-১৩ পরিষদেই আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সাথে গভীর সখ্যতা গড়ে উঠে তার। এজন্য তার ওয়ার্ড কমিউনিটি সেন্টার ভবনটির নামকরণও করেছিলেন তৎকালীন মেয়রের নামেই। ফলে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেয়া দিয়ে খুলনার রাজনীতিতে কোন প্রভাব পড়বে না বলে দাবি করেন বিএনপি-জামায়াতের শীর্ষ নেতারা।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা এস এম কামাল হোসেন সময়ের খবরকে বলেন, “নির্বাচনের পরদিন ওই কাউন্সিলররা মূলত শুভেচ্ছা বিনিময় করতে এসেছিলেন। আলাপ-আলোচনা চলছে; তারা আওয়ামী লীগের মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে দলে যোগদান করতেও পারেন।” 
 

বার পঠিত

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ





খুলনা-৪ আসনে নৌকার মাঝি কে?

খুলনা-৪ আসনে নৌকার মাঝি কে?

০১ অগাস্ট, ২০১৮ ০২:৩০









ব্রেকিং নিউজ











ফাইনালে বাংলাদেশের মেয়েরা

ফাইনালে বাংলাদেশের মেয়েরা

১৭ অগাস্ট, ২০১৮ ০১:০২