খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১৮ অক্টোবর ২০১৮ | ২ কার্তিক ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

ইসলামের দৃষ্টিতে শবে বরাত

মুফতী শামছুল হক সাদী আল-হাবীবী | প্রকাশিত ০১ মে, ২০১৮ ০০:০০:০০

লাইলাতুন নিছফি মিন শাবান বা ১৪ই শাবান দিবাগত রাত্রিকে শবে বরাত বলা হয়। ‘শবে বরাত’ ফার্সী ও আরবী দু’টি শব্দের সমন্বিত রূপ। ফার্সীতে শব অর্থ রাত। আরবীতে বার-আত অর্থ মুক্তি। একত্রে শব্দ দু’টির অনুবাদ: মুক্তির রাত/মুক্তি রজনী। আরবীতে ‘লাইলাতুল বারাআত’। মহিমান্বিত এ রাতটি মুসলিম উম্মাহ্র জন্য অনেক বড় নিয়ামত। কেননা মহান আল্লাহ এ রাতে সব বান্দার প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দেন। ইমাম বাইহাক্বী রহঃ এর শু‘আবুল ঈমান ৩৮৫৪ নাম্বার হাদীসে আছে, উম্মুল মু’মিনীন হযরত মা আয়েশা রযিইয়াল্ল-হু আনহা বলেন, এক রাতে প্রিয় নাবী কারীম সল্লাললাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামায পড়লেন। তাতে সিজদা এত দীর্ঘ করলেন যে, আমি মনে করলাম তাঁর ইন্তেকাল হয়ে গেছে। তাই আমি উঠে গিয়ে তাঁর (পায়ের) বৃদ্ধাঙ্গুল নাড়া দিলাম। আর তা নড়ে উঠলো। এরপরে আমি ফিরে এলাম। পরে যখন তিনি সিজদা থেকে মাথা উঠালেন এবং নামায শেষ করলেন তখন বললেন, হে আয়েশা! বা হে হুমাইরা! তুমি কী মনে করেছ যে, নাবী কারীম সল্লাললাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমার সাথে ওয়াদা রক্ষা করেন নি? আমি বললাম, না, ইয়া রসূলাল্ল-হ্! বরং আপনার দীর্ঘ সিজদার কারণে আমি মনে করেছি যে, আপনার ইন্তেকাল হয়ে গেছে। প্রিয় নাবী কারীম সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি কী জানো, আজকের এ রাত কোন রাত? আমি বললাম, মহান আল্লাহ ও তাঁর সম্মানিত রসুলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, এ রাত হলো মধ্য/অর্ধ শাবানের রাত। মহান আল্লাহ এ রাতে সব বান্দার প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দেন। ক্ষমাপ্রার্থীদের ক্ষমা করে দেন। রহমত প্রার্থীদের প্রতি রহমত বর্ষণ করেন। আর হিংসুকদের তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দেন। শবে বরাতের ফযীলাত সর্ম্পকে ৮ জন জলীলুল কদর সাহাবী, খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত আবু বকর সিদ্দীক, উম্মুল মু’মিনীন হযরত মা আয়েশা সিদ্দীকা, হযরত আবু হুরায়রা, হযরত মু‘আয ইবনে জাবাল, আবু সা‘লাবা আল-খুশানী, আব্দুল্লাহ বিন আমর, আবু মূসা আশ‘আরী, আওফ বিন মালেক রযিইয়াল্ল-হু আনহুম আজমাঈনের সূত্রে বিভিন্ন সনদে সহীহ্ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যেমন, প্রিয় নাবী কারীম সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, মহান আল্লাহ তা‘আলা মধ্য/অর্ধ শাবানের রাতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃকপাত করেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সকলকে মাফ করে দেন। (সহীহ ইবেন হিব্বান ১২ নাম্বার খন্ড, ৪৮১ পৃষ্ঠা, হাদীস নাম্বার: ৫৬৬৩, ত্ববারনী আল-মু‘জামুল কাবীর ২০ নাম্বার খন্ড, ১০৮ পৃষ্ঠা, হাদীস নাম্বার: ১৬৬৩৯, মুসনাদে আহমাদ ২য় খন্ড ১৭৬ পৃষ্ঠা, হাদীস নাম্বার: ৬৬৪২, সুনানে ইবনে মাজাহ শরীফ ১ম খন্ড, ৪৪৫ পৃষ্ঠা, হাদীস নাম্বার: ১৩৯০ ইত্যাদি।)
আমলকারীর জন্য এতটুকুই যথেষ্ট আর অসৎ চরিত্রের বাহানাকারীর জন্য হাজারও দলিল বেকার। 
শবে বরাত উপলক্ষে করণীয় :
যথাসম্ভব রাত জেগে নামায পড়া, যিকির-আযকার, কুরআন তিলাওয়াত, দু‘আ ইত্যাদি নফল ইবাদাত করা। সলাতুত্ তাওবা, সলাতুত্ তাসবীহ্ বা ক্বাজা নামায থাকলে তা-ও পড়া যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে যে, এ রাতে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ও নির্দিষ্ট পরিমাণে বিশেষ কোন নামায নেই। অবশ্য দীর্ঘ রাকাতে/সাজদায় নামায প্রমাণিত। 
১.১৫ই শাবান দিনে নফল রোযা রাখা উত্তম বা মুস্তাহাব সাওয়াব মূলক কর্ম। (মা-ছাবাতা বিস্সুন্নাহ্, সুনানে ইবনে মাজাহ্ শরীফ, ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী ১ম খন্ড, ২০২ পৃষ্ঠা, মারাক্বীউল ফালাহ্ ২৫০ পৃষ্ঠা ইত্যাদি।)
২.সম্ভব হলে একাকী অনাড়ম্বরভাবে ১৪ই শাবান রাতে কবর যিয়ারত করা এবং মৃত মুসলমানদের জন্য মাগফিরাতের দু‘আ করা। তবে একে জরুরী মনে করা যাবে না।  
শবে বরাত উপলক্ষে বর্জণীয় :
১.এ রাতের যাবতীয় ইবাদাত-বন্দেগীতে যথাসম্ভব বাহ্যিক জাঁকজমকতাপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা, সম্মিলিতরূপ বর্জন করা। 
২.আতশবাজি, পটকা ফোটানো, মোমবাতি জ্বালানো, আলোকসজ্জা বর্জন করা। 
৩.কবরস্থানে-মাজারে মেলা, আনন্দ-উৎসব ও আসর জমানো ইত্যাদি বর্জন করা। 
৪.হালুয়া রুটি তৈরী বর্জন করা/হালুয়া রুটির বিশেষ আয়োজনকে বর্জন করা ইত্যাদি। এগুলো কু-প্রথা, নব-গঠিত নিকৃষ্ট বিদাত এবং গুনাহের কাজ। কেননা এগুলো কুরআন-সুন্নাহ্ দ্বারা প্রমাণিত নয়। মহান     আল্লাহ্র দরবারে মহিমান্বিত এ শবে বরাতে যথাসম্ভব মহান আল্লাহ্কে রাজি খুশি করার নিয়্যাতে সর্বপ্রকার শিরক, বিদাত, কু-প্রথা, গুনাহ্, ঝগড়া-বিবাদ, অবহেলা, অলসতা থেকে মুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ সহীহ ঈমান আক্বীদা ও সুন্নাতযুক্তভাবে অন্তরকে কলুষমুক্ত করে নিরিবিলি পরিবেশে মুহাব্বাত ও একাগ্রতার সাথে নফল     ইবাদাত-বন্দেগীতে নিজেকে সম্পৃক্ত করে মহান আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার রহমত হাসিলের সুবর্ণ সুযোগ গ্রহণ করা। পাশাপাশি যথাসম্ভব পুরুষরা মসজিদে ফজরের নামায জামাত সহকারে পড়া এবং মহিলারা ঘরের নির্জন কক্ষে প্রথম ওয়াক্তে ফজরের নামায আদায় করা। মহান আল্লাহ্ আমাকেসহ সকল মুসলমানকে সহীহভাবে ইখলাছের সাথে আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন। 
লেখক : মুফতী শামছুল হক সাদী আল-হাবীবী
প্রিন্সিপাল মুহাম্মাদিয়া ক্বওমী মহিলা মাদ্রাসা,
৮৬, মুসলমানপাড়া রোড, খুলনা।


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

“শরীয় বিধানে দেনমোহর”

“শরীয় বিধানে দেনমোহর”

১২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০৩

যে আগে সালাম দেয় সে অহংকার মুক্ত

যে আগে সালাম দেয় সে অহংকার মুক্ত

০৫ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:১০

“অকাল মৃত্যু” একটি ভ্রান্ত ধারণা

“অকাল মৃত্যু” একটি ভ্রান্ত ধারণা

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:১২


রহস্যময় আবে যমযম কূপ

রহস্যময় আবে যমযম কূপ

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০৯

পবিত্র আশুরা  ২১ সেপ্টেম্বর

পবিত্র আশুরা  ২১ সেপ্টেম্বর

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০


হজে গুনাহ মাফ হয়

হজে গুনাহ মাফ হয়

১৬ জুলাই, ২০১৮ ১৩:২৫

শাওয়ালের ছয় রোজা

শাওয়ালের ছয় রোজা

২০ জুন, ২০১৮ ১৩:১১

দুই ঈদের রাত খুবই বরকতময়

দুই ঈদের রাত খুবই বরকতময়

১৪ জুন, ২০১৮ ০১:৪৫




ব্রেকিং নিউজ