খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২৬ এপ্রিল ২০১৮ | ১৩ বৈশাখ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

প্রায়ই ভুল বার্তা দেয় নেপালের ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ার!

দুর্ঘটনার সময় দায়িত্বরত ৬ কর্মকর্তাকে কন্ট্রোল রুম থেকে প্রত্যাহার

খবর প্রতিবেদন | প্রকাশিত ১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০৯:০০

ইউএস বাংলার বিমান বিধ্বস্তের সময় এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারে দায়িত্বরতদের মধ্যে ৬ কর্মকর্তাকে গতকাল সরিয়ে নিয়েছে নেপালের বিমান কর্তৃপক্ষ। দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষদর্শী এই কর্মকর্তাদের দুর্ঘটনাজনিত শোক থেকে বের করে আনার জন্য তাদেরকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে তারা। তবে এমন এক সময় তাদের সরিয়ে নেওয়া হলো, যখন বিমান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে যোগাযোগগত ত্র“টির জোরালো অভিযোগ উঠেছে। ইউএস বাংলা কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, কন্ট্রোল রুমের ভুল বার্তাই দুর্ঘটনার কারণ। নেপালি সংবাদমাধ্যম মাই রিপাবলিকার খবরে কর্তৃপক্ষকে উদ্ধৃত করে ওই কর্মীদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার খবর দেওয়া হয়েছে।
‘এমন দুর্ঘটনার পর স্বাভাবিক প্রক্রিয়া মেনেই তাদের অন্যত্র সরানো হয়েছে। তারা একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখেছে এবং তারা শোকাহত। তাদের চাপ কমাতেই আমরা তাদের অন্য বিভাগে স্থানান্তর করেছি।’ বলেছেন, নেপালের বেসামরিক বিমান কর্তৃপক্ষের উপ-পরিচালক রায়হান পোকহারেল। তবে ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের সিইও আসিফ ইমরান দুর্ঘটনায় কন্ট্রোল রুমের যোগাযোগ ত্র“টিকে দায়ী করেছেন।
দুর্ঘটনার আগে বিমানের ক্যাপ্টেন ও কাঠমান্ডু এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল বা এটিসি-র মধ্যকার কথোপকথনের প্রসঙ্গ তুলে আসিফ ইমরান বলেন, বিমান বন্দরের কন্ট্রোল রুম থেকে পাইলটকে ভুল বার্তা দেওয়া হয়েছিল বলে তারা আশঙ্কা করছেন। ওই কথোপকথনের বিবরণ দিয়ে নেপাল টাইমস জানায়, এয়ার কন্ট্রোল রুম-এটিসি থেকে পাইলটকে বলা হচ্ছে, আমি আবার বলছি, রানওয়ে ২০দিকে এগোবেন না। পাইলট অপেক্ষা করছেন বলে জানান। কন্ট্রোল রুম তাকে বিমান অবতরণ না করে অপেক্ষা করতে বলেন। কারণ আরেকটি বিমান ওই রানওয়ের দিকে এগিয়ে আসছে। 
বিমানটি ডানদিকে ঘুরে গেলে এটিসি থেকে জানতে চাওয়া হয়, পাইলট কি রানওয়ে জিরো টুতে (উত্তর প্রান্ত) ল্যান্ড করবেন নাকি রানওয়ে টু জিরোতে (দক্ষিণ প্রান্ত)। 
ইউএস বাংলার পাইলট জানান, তারা রানওয়ে টু জিরোতে (২০) ল্যান্ড করবেন। এরপর জানতে চাওয়া হয় তিনি রানওয়ে দেখতে পারছেন কিনা। পাইলট নেতিবাচক উত্তর দেন। এবার এসিটি থেকে তাকে ডানদিকে ঘুরতে বলা হয়। তখন পাইলট জানান, তিনি রানওয়ে দেখতে পাচ্ছেন। বলেন, জিরো টু-তে অবতরণ করার জন্য প্রস্তুত।
কন্ট্রোল টাওয়ার জানিয়ে দেয়, বাংলাদেশের বিমানটিকে টু-জিরোতে নামার চূড়ান্ত অনুমতি দেয়া হয়েছে (একটু আগেই কথা হয়েছে জিরো টুর বিষয়ে)। এ সময় প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে একটি সামরিক বিমানকে অপেক্ষায় রাখা হয়েছিল। এরপর ইউএস বাংলার পাইলট জানতে চান, স্যার, আমরা কি অবতরণের অনুমতি পেয়েছি? কিছুক্ষণ নীরবতার পরই কন্ট্রোলের চিৎকার শোনা যায়, আমি আবার বলছি, ঘুরে যান। এরপরই ফায়ার ওয়ানকে ডাকা হয়, যার মানে একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এরপর নেপালি একজন পাইলটের প্রশ্নের জবাবে রানওয়ে বন্ধ বলে জানানো হয়।
একই বিষয়ে খবর প্রকাশ করেছে নেপালি সংবাদ মাধ্যম অন্নপূর্ণা পোস্ট। সেখানেও ওই অডিও যোগাযোগের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। অপর একটি অডিও কথোপকথন সূত্রে কাতারভিত্তিক আল জাজিরাও দুর্ঘটনার নেপথ্যে কন্ট্রোল রুমের ভূমিকার আশঙ্কার কথা বলেছে।
এদিকে ত্রিভুবন বিমানবন্দরে সোমবার ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর থেকে নেপালের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারের ভুল বার্তা প্রেরণের অভিযোগটি নতুন করে সামনে এসেছে। বাংলাদেশের বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার নেপথ্যে কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে ভুল বার্তা প্রেরণকে দায়ী করেছে বিমান কর্তৃপক্ষ ইউএস-বাংলা। পাইলট ঠিকমতো বার্তা বুঝতে পারেনি বলে দাবি করছে ত্রিভুবন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে নেপালের আবহাওয়া বিভাগ ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে ভুল বার্তা প্রেরণের অভিযোগটি আগেও উঠেছিল। পাইলটদের অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৬ সালে এ নিয়ে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছিল নেপালি সংবাদ মাধ্যম হিমালয়ান টাইমস।
বিমান অবতরণের ক্ষেত্রে বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে পাওয়া তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়। ২০১৬ সালের ২৭ মার্চ প্রকাশিত প্রতিবেদনে হিমালয়ান টাইমস এক পাইলটকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছিল, তিনি (ওই পাইলট) প্রায়ই ত্রিভুবন বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে ভুল তথ্য পান। দৈনিকটির কাছে ওই পাইলট অভিযোগ করে বলেছিলেন, ‘আজ সকালেও টাওয়ার থেকে আমাকে জানানো হয় বিমানবন্দরের দৃষ্টিসীমা ৩ কিলোমিটার। তবে কাঠমান্ডুর আকাশে কুয়াশা থাকায় আবহাওয়া বিভাগের আপডেট তথ্য দেখাচ্ছিল দৃষ্টিসীমা দেড় কিলোমিটারেরও কম।
বোয়িং ৭৫৭-২০০ বিমানের ওই পাইলট বলেন, তার বিমান অবতরণের জন্য দৃষ্টিসীমা কমপক্ষে ২.৮ কিলোমিটার থাকা প্রয়োজন। শুধু ত্রিভুবন বিমানবন্দর নয়, লুকলাভিত্তিক তেনজিং হিলারি বিমানবন্দরেও একই পরিস্থিতিতে পড়তে হয় বলে অভিযোগ করেছিলেন পাইলটরা। লুকলার এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ার থেকেও ভুল তথ্য দেওয়া হয় বলে দাবি করেন ওই পাইলট। তিনি বলেন, ‘লুকলা টাওয়ার থেকে দেওয়া তথ্য পর্যাপ্ত নয়। আর প্রায়ই তা বিভ্রান্তিকর ও ভুলভাবে হিসাব করা।’
সে সময় ওই পাইলট নেপালের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে লুকলা কন্ট্রোল টাওয়ারে কর্মরতদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, লুকলা টাওয়ারের কর্মীরা মানসম্পন্ন কার্যপদ্ধতি অনুসরণ করছেন কিনা তা খতিয়ে দেখা উচিত। এছাড়া একজন সিনিয়র ক্যাপ্টেনও হিমালয়ান টাইমসকে বলেন, বাতাসের গতি, বাতাসের প্রবাহের দিক, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, রানওয়ের দৃষ্টিসীমা ও অন্যান্য আবহাওয়া সংক্রান্ত বিষয়ে কন্ট্রোল টাওয়ার ও আবহাওয়া বিভাগ যেসব তথ্য দেয় তা প্রায়ই পরস্পর বিরোধী হয়।
তবে নেপালের আবহাওয়া দফতরের মহাপরিচালক রিশিরাম শর্মা তখন দাবি করেছিলেন, সীমিত সম্পদ সত্ত্বেও তারা উচ্চমানসম্পন্ন তথ্য সরবরাহের চেষ্টা করে থাকেন। তবে তিনি তখন পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, বেশিরভাগ পাইলট ফ্লাইট পরিচালনার আগে আবহাওয়া বিভাগের ব্রিফিংয়ে অংশ নেন না।


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ