খুলনা | বুধবার | ১৮ জুলাই ২০১৮ | ৩ শ্রাবণ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

হাদিস পার্কের শহিদ মিনার ও গাজী শহীদুল্লাহ

কাজী মোতাহার রহমান | প্রকাশিত ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ০১:০৯:০০

পাকিস্তান জামানায় মিউনিসিপ্যাল পার্কের পূর্ব-দক্ষিণ কোনায় শহিদ মিনার ছিল। বড় সড় আকারের না হলেও মোটামুটি চোখে পড়ার মত। ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি এই শহিদ মিনার থেকে ঘোষণা হত। ২৩ মার্চ স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ মিনারের সামনে পার্কের দক্ষিণ গেটের কাছে জয়বাংলার পতাকা উত্তোলন করে। শহিদ মিনার শত আন্দোলনের পাদপীঠ। ৭১-এর ২৫ মার্চ পর্যন্ত স্বাধীনতা প্রত্যাশী জনগণ পরবর্তী কর্মসূচি জানার জন্য এখানেই সমবেত হত। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সার্কিট হাউজ থেকে পাকসেনারা এসে রাতের আধারে মিউনিসিপ্যাল পার্কের শহিদ মিনার গোলার আঘাতে গুড়িয়ে দেয়। এ সময় সার্কিট হাউজে পাকসেনার ২২ রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন লে: কর্নেল সামস উল জামান। ৭১-এর ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি খুলনায় গণহত্যার মহানায়ক হিসেবে পরিচিতি পান। ১৭ ডিসেম্বর মিত্র বাহিনীর অধিনায়ক মেজর জেনারেল দলবীর সিং এর কাছে পাকিস্তানি সামরিক জান্তারা আত্মসমর্পন করে। ৭১-এর নয় মাস শহিদ মিনার ছিল ধ্বংস্তুপ। ৭২ ও ৭৩ সালে ২১ ফেব্র“য়ারি এই ধ্বংসস্তুপে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পন করেন। স্বাধীনাত্তোর ১৯৭৩ সালে খুলনা পৌরসভার প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় ন্যাপ নেতা গাজী শহিদুল্লাহ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি পাকিস্তান জামানায় প্রতিষ্ঠিত ছাত্রনেতা। ছাত্র ইউনিয়নের দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। বিএল কলেজ ছাত্র সংসদের দু’দফা সহ-সভাপতি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন চলাকালে মহসীন স্কুলের ছাত্র ছিলেন। ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ২১ ও ২২ ফেব্র“য়ারি মহসীন স্কুলের ছাত্ররা প্রতিবাদ মিছিল বের করে। ঐ স্কুলের ১০ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী গাজী শহিদুল্লাহ ও বজলুর রহমান ছাত্র মিছিলের নেতৃত্ব দেন। স্কুলের ছাত্র হয়েও সে দিন বিএল কলেজের ছাত্রদের সাথে মিশে ভাষা আন্দোলনে স্বক্রীয় অংশ নেয়। ১৯৫৫ সালে প্রথম দফায় বিএল কলেজের ভিপি নির্বাচন হয়ে শহিদ মিনার নির্মাণের কাজে হাত দেয়। কলেজ অভ্যন্তরে নির্মিত ইট ও সিমেন্ট দিয়ে তৈরি মিনারে ১৯৫৫ সাল থেকে ২১ ফেব্র“য়ারি শহিদদের স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ শুরু হয়। গর্বিত এই ভাষাসৈনিক ৭৩ সালে পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর হদিস পার্কে শহিদ মিনার নির্মাণের কাজ শুরু হয়। সে সময় ব্যয় হয় এক লক্ষ তের হাজার টাকা। ডিজাইন করেন খ্যাতিমান স্থাপতি রবিউল ইসলাম। তাকে বিশেষ ভাবে সহযোগীতা করেন এলজিআরডির প্রধান প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিকি। ১৯৭৬ সালের একুশের প্রথম প্রহরে পৌর চেয়ারম্যান গাজী শহিদুল্লার শ্রদ্ধাঞ্জলির মধ্য দিয়ে শহিদ মিনারের উদ্বোধন হয়। গর্বিত এই চেয়ারম্যান ৭৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। 
খুলনা শহরতলীর গিলেতলা গ্রামে ১৯৩৭ সালের ১ ফেব্র“য়ারি তার জন্ম। গাজী শামছুর রহমান তার পিতা ও রওশনার বেগম তার মাতা। তিনি মুহসীন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্টিক ও বিএল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক সনদ লাভ করেন। ছাত্রজীবন শেষে ১৯৫৭ সালে ন্যাপের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। তার সম-সাময়িক রাজনীতিকরা হচ্ছেন এড. আব্দুল জব্বার, শেখ রাজ্জাক আলী, এম এ গফুর, মালিক আতাহার উদ্দিন, এম নুরুল ইসলাম, আবু মোহাম্মদ ফেরদাউস প্রমুখ। ১৯৬৮ সালে ন্যাপ দ্বিধাবিভক্ত হলে তিনি ভাষাণি গ্র“পের সাথে যোগ দেয়। এই সংগ্রামী রাজনীতিকে জীবনে উল্লেখযোগ্য ১৯৬২ সালে শরিফ কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৫৮ সালে জে: আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ১৯৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের আন্দোলন সর্বপোরি ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে সংগঠক এর ভূমিকা পালন করেন। তার জীবনের আরও একটি উল্লেখযোগ্য প্রেক্ষাপট ১৯৭৬ সালের ১৬ মে ফরাক্কা অভিমূখে লাখ মানুষের সাথে লং মার্চে অংশগ্রহণ করেন। চিরকুমার এই রাজনীতিক অণ্যায়ের বিরুদ্ধে ছিলেন আপষহীন। অধিকার বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিক হিসেবে পরিচিতি স্বত্ত্বেও অযৌক্তিক তদবীর থেকে দূরে থাকতেন। তিনি আজীবন সাম্রাজ্যবাদ আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন। দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের অবসান হয় গত ৫ ফেব্র“য়ারি। প্রতিষ্ঠিত ছাত্রনেতা, গর্বিত ভাষা সৈনিক ও জননন্দিত জন প্রতিনিধি কর্মময় জীবনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তার ত্যাগ, শ্রম, মেধা ও লড়াই সংগ্রামের প্রেক্ষাপট গণতন্ত্র প্রত্যাশী মানুষকে সারা জীবন অনুপ্রেরণা যোগাবে। তিনি অমর হয়ে থাকবেন গণতন্ত্র প্রত্যাশী মানুষের সাংগ্রামী কাফেলায়।
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

বদলে যাবে মংলা বন্দর

বদলে যাবে মংলা বন্দর

০৩ জুলাই, ২০১৮ ০২:০১













ব্রেকিং নিউজ











জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ  আজ শুরু

জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ  আজ শুরু

১৮ জুলাই, ২০১৮ ০০:৫৬