খুলনা | বুধবার | ১৮ জুলাই ২০১৮ | ৩ শ্রাবণ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

ভাষা আন্দোলনে বিএল কলেজ

রহমান বাবু  | প্রকাশিত ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ০১:১১:০০

দক্ষিণাঞ্চলে শত গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পাদপীঠ দৌলতপুর বিএল কলেজ। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আজ আর কোন আন্দোলন নেই। ছাত্র সংসদও নেই এখানে। নেতৃত্ব গড়ে ওঠার সুযোগ ও নেই এখানে। বিএল কলেজের ছাত্রনেতার জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছে। খুলনায় ভাষা আন্দোলনের প্রথম সূচনা হয় বিএল কলেজে। তখন ছাত্র সংগঠন বলতে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, ছাত্র ফেডারেশন ও ছাত্র কংগ্রেস। মূলত ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব ছিলেন ছাত্র সংসদের এক সময়কার সহ-সভাপতি শৈলেন চন্দ্র ঘোষ, তাহমিদ উদ্দিন, এ কে চাঁন মিয়া, খন্দকার হাফিজ প্রমুখ। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্র“য়ারি করাচিতে অনুষ্ঠিত আইন সভায় কুমিলার গণ-পরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত কাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা কারার দাবি তোলেন। সে সময়ের পূর্ব পাকিস্তানের মূখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দীন ঐ দাবির বিরোধিতা করে বলেন “উর্দু হবে রাষ্ট্র ভাষা”। মূখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পরিপেক্ষিতে বুদ্ধিজীবী ও ছাত্র সমাজ ২৬ ফেব্র“য়ারি ঢাকায় ধর্মঘট ও ঢাবিতে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেন। এ সময়ে মুসলিম লীগ সরকারের বিরোধিতা করার মত রাজনৈতিক শক্তি ছিল না। মূখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে এক মাস ২২ দিন আগে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি আত্মপ্রকাশ করেণ পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান ও খুলনার শেখ আব্দুল আজিজ এ নয়া ছাত্র সংগঠেনের কেন্দ্রীয় সদস্য। শেখ মুজিবুর রহমান বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার শেখ আব্দুল আজিজ এর দায়িত্ব বৃহত্তর খুলনা জেলার ছাত্র সমাজকে সংগঠিত করা। তাদের দায়িত্ব এ অঞ্চলে ছাত্রলীগের কমিটি গঠন ও ছাত্রলীগের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করা। 
পূর্ব পাকিস্তানের মূখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদে তমদ্দুন মজলিশ আর ছাত্রলীগের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে সংগ্রাম পরিষদ। বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে সংগ্রম পরিষদ ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের ১৭ জেলায় হরতাল আহ্বান কর্মসূচি সফল করতে মার্চের প্রথম সপ্তাহে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সদস্য ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান খুলনায় আসেন (অসমাপ্ত আত্মজীবনী শেখ মুজিবুর রহমান)। তাঁর আগমন উপলক্ষে বিএল কলেজে ছাত্রসভার আয়োজন করা হয়। মুসলিম লীগের সমর্থকরা সভায় মারপিট করে। কয়েকজন ছাত্র জখম হয়। মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুর ছাত্রসভার প্রতি আহ্বান জানান। ছাত্রসমাজ কর্তৃক আয়োজিত ছাত্রসভায় ছাত্রলীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বক্তৃতা করেন। তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার লক্ষে আন্দোলন বেগবান করার আহ্বান জানান। 
১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদ সদস্য (রামপাল-মংলা-দাকোপ-বটিয়াঘাটা) শেখ লুৎফর রহমান মনি স্মৃতিচারণ করে বলেন ছাত্রনেতা শেখ মুজিব ১৯৪৮ সালে বিএল কলেজে আসেন। বিএল কলেজ স্টেশনে সংগ্রামী ছাত্রসমাজ তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান।
শেখ মুজিবুর রহমানের আগমনকে কেন্দ্র করে কলেজে ভাষা আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৪৮-১৯৫২ আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, ছাত্র ফেডারেশন ও ছাত্র কংগ্রেস ছিল মূল চালিকা শক্তি। ছাত্র আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ভাষা ভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের আন্দোলনের পক্ষে জনমত সৃষ্টি হয়। বৃটিশ জামানায় খুলনায় ছাত্র ফেডারেশন শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ১৯৩৭ সালে এখানে ছাত্র ফেডারেশন আত্মপ্রকাশ করে। এ সংগঠনটি কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থিত। ত্রিশের দশক থেকে এ সংগঠনটি খুলনায় বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ আত্মপ্রকাশ করার পর কেন্দ্রীয় সদস্য শেখ আব্দুল আজিজের নেতৃত্বে এ সংগঠনটি এখানে বিকাশ লাভ করে। ১৯৫১ সালে খুলনায় আওয়ামী মুসলিম লীগ আত্মপ্রকাশের পর ছাত্রলীগ সহযোগী সংগঠন হিসেবে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ছাত্র কংগ্রেস শুরু থেকে ফরোয়ার্ড ব্লকে সমর্থন জানায়।
কোন রাজনৈতিক দলের পরামর্শ ছাড়া ১৯৪৮ সালের ২৫ মার্চ দৌলতপুর বিএল কলেজে ছাত্ররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ক্লাস বর্জন ও বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন কের। কলেজের প্রধান গেট বন্ধ করে ছাত্রসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলন মূখর দিনগুলিতে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্তরা হচ্ছেন তাহমিদ উদ্দিন, মতিয়ার রহমান, জিল্লুর রহমান, শেখ হাসান উদ্দিন, খন্দকার আব্দুল হাফিজ, এম নুরুল ইসলাম, সৈয়দ কামাল বখত সাকী, ছাত্র ফেডারেশনের আনোয়ার হোসেন, সুনীল ঘোষ, অজিত ঘোষ, মালিক আতাহার উদ্দিন, ধনঞ্জয় দাস, স্বদেশ বোস, সন্তষ দাস গুপ্ত, পরিতোষ দাস গুপ্ত, উমাপদ গাঙ্গুলী, পরমেস্বর ব্যানার্জী, ছাত্র কংগ্রেসের শৈলেন চন্দ্র ঘোষ, এ কে চান মিয়া এবং যুব মুসলিম লীগের আবু মোঃ ফেরদাউস।
১৯৪৮ সালের ২৬ মার্চ বিএল কলেজে উল্লিখিত তিন ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে ভাষা সংগ্রাম পরিষদ। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ নেতা তাহমিদ উদ্দিন সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে কলেজ গেটে শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। কলেজের প্রধান গেট বন্ধ করে আন্দোলনরত ছাত্র সমাজ ধর্মঘট ঘোষণা করে। এখানে অনুষ্ঠিত ছাত্র সমাবেশে শেখ রাজ্জাক আলী, কাজী মাহাবুবুর রহমান, আনোয়ার হোসেন, সন্তোষ দাস, ধনঞ্জয় দাস বক্তৃতা করেন। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ সারা দেশে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। সংগ্রামী ছাত্রসমাজ ১১ মার্চ স্থানীয় গান্ধী পার্কে জনসভার সিদ্ধান্ত নেন। স্থানীয় বিএল কলেজ, মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্র এবং রূপসা ও খালিশপুরের শ্রমিকরা এ মিটিংয়ে অংশ নেন। খুলনায় ছাত্রদের এটাই প্রথম সরকার বিরোধী প্রকাশ্যে সমাবেশ। জনসভায় মুর্হুমুর্হু শ্লোগান ওঠে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। জনসভার সিদ্ধান্তবলী পাঠ করেন ছাত্র ফেডারেশনের নেতা সরদার আনোয়ার হোসেন। ঐ দিন সন্ধায় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। পাকিস্তান সরকার প্রথম দফায় তাকে ছয় মাসের আটকাদেশ দেয়। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি ছাত্র আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হন। মুসলিম লীগ সরকার তার তৎপরতাকে স্বভাবিক ভারে নেয়নি। আনোয়ার হোসেনের বক্তৃতা ছাত্রজনতার কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সরকার তার নামে হুলিয়া জারি করে। ১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসে বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট এলাকা থেকে পুলিশ আবারও তাকে গ্রেফতার করে। তাকে রাজশাহী কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ২০ এপ্রিল জেল সুপার মি. বিল জেলখানা পরিদর্শনে আসেন করাবন্দীরা তাকে জিম্মি করার চেষ্ট করলে পারিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পাগলা ঘন্টা বাজানো এবং পুলিশ গুলি চালায়। এতে আনোয়ার হোসেনসহ সাত জন নিহত হয়। নিহত আনোয়ার হোসেন বিএল কলেজের ছাত্র। তার জন্মস্থান সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বুধহাটার কাছে হাবশপুর গ্রামে। 
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি ঢাকা ছাত্র মিছিলে গুলি হওয়ার সংবাদ তাৎক্ষণিক মোহসিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পৌঁছায়। এই স্কুলের ছাত্ররা মিছিল সহকারে বিএল কলেজে আসে। হাইস্কুল ও বিএল কলেজের ছাত্ররা যৌথভাবে প্রতিবাদ মিছিল করে।


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

বদলে যাবে মংলা বন্দর

বদলে যাবে মংলা বন্দর

০৩ জুলাই, ২০১৮ ০২:০১













ব্রেকিং নিউজ











জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ  আজ শুরু

জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ  আজ শুরু

১৮ জুলাই, ২০১৮ ০০:৫৬