খুলনা | বুধবার | ১৮ জুলাই ২০১৮ | ৩ শ্রাবণ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

শহিদ দিবস থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

প্রবীর বিশ্বাস  | প্রকাশিত ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ০১:১০:০০

একুশের যারা শহিদ ভাই
আমরা তাদের ভুলি নাই
ফেব্র“য়ারি মাস এলেই আমাদের মনে পড়ে সেই ১৯৫২ সালের কথা, সেই শহিদ ভাইদের কথা, যাদের আত্মত্যাগের ফলে আজ আমার গর্বের সাথে বলতে পারি, আমরা বাঙ্গালি আর বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। 
পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের যখন ভাষা নিয়ে আন্দোলন চলছিলো তখন পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষিদের আনুপাতিক হার এ রকম ছিল- বাংলা ভাষায় কথা বলতো শতকার ৫৪.০৬ শতাংশ, পাঞ্জাবি ২৭.০ শতাংশ, পশতু ৬.১০ শতাংশ, সিন্ধী ৪.৮০ শতাংশ, ইংরেজী ১.৪০ শতাংশ, আর উর্দুতে কথা বলতো মাত্র ৬.০০ শতাংশ। কিন্তু বাংলার জাতীয় ইতিহাসে অবিস্মরণীয় ঘঠনার বীজ রোপিত হয় তখনই যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরেই নিখিল পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা বাংলাভাষা হওয়া সত্ত্বেও সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক উপায়ে পূর্ব পাকিস্তানে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালানো হয়। আর সেটা বাংলার দামাল ছেলেরা মেনে না নিয়ে বুকের তাজা রক্তে ঢেলে প্রতিষ্ঠিত করেছে বাংলার রাষ্ট্রভাষা বাংলা, বাঙ্গালির রাষ্ট্রভাষা বাংলা। 
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারিতে প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশনকে সামনে রেখে সমগ্র দেশে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন বেগবান করা হয়। তখন পাকিস্তানী স্বৈরাচার শাসক ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে সকল প্রকার মিটিং, মিছিল ও সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ঐ দিনের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে মিছিল বের করে। মিছিলটি যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে যায় তখন পুলিশ নির্বিচারে এলোপাতাড়ি ভাবে গুলি বর্ষণ করে মিছিলের উপর এবং শহিদ হয় বাংলা মায়ের সন্তানেরা। যে কারণে এই অবিনশ্বর ঘটনাই বাংলাদেশের ইতিহাসকে অবিস্মরণীয় করে গৌরবে মন্ডিত করেছে। 
তাইতো আমরা ফেব্র“য়ারি মাসকে ভাষা আন্দোলনের মাস বলে থাকি এবং ২১ ফেব্র“য়ারিকে মহান শহিদ দিবস হিসাবে পালন করি। মাতৃভাষা বাংলার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণ যে সাফল্যজনক ভাষা আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, তা বিশ্বের ইতিহাসে অবশ্য স্থায়িত্ব লাভ করেছে। কারণ বিশ্ববাসী দেখেছে কেবলমাত্র নিজের মাতৃভাষাকে জীবিত রাখার উদ্দেশ্যে যে রক্তক্ষয়ী আন্দোলন বাংলাদেশে হয়েছে সারা বিশ্বের ইতিহাসে তার আর কোন নজির নেই। সে কারণেই বিশ্ববাসী আমাদের শহিদ দিবসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। 
১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ২১ ফেব্র“য়ারি যথাযোগ্য মর্যাদায় শুধু বাংলাদেশে পালিত হতো মহান শহিদ দিবস হিসাবে। কিন্তু ২০০০ সাল থেকে যুক্ত হয়েছে একটি নতুন মাত্রা অর্থাৎ গত ২০০০ সালে সমগ্র বিশ্বে ২১ ফেব্র“য়ারি পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে। তবে শহিদ দিবসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে রূপান্তরিত করার জন্য কিছু লোকের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার না করলে নয়। এ ব্যপারে প্রথমেই ধন্যবাদ দিতে হয় কানাডায় বসবাসরত কিছু বাংলাদেশীকে। ২১ ফেব্র“য়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে ঘোষণা দেওয়ার জন্য কানাডায় ভ্যাস্কুভারের রফিকুল ইসলাম ৮ জানুয়ারি ১৯৯৮ জাতিসংঘের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল কফি অনানের কাছে একটা আবেদন করা হলে জাতিসংঘের অফিস থেকে বিষয়টি একটি সংস্থার পক্ষ থেকে ইউনেস্কোর কাছে উত্থাপন করার প্রস্তাব দেয়। সঙ্গে সঙ্গে রফিকুল ইসলাম ও তার সহযোগী আবদুস সালাম “মাদার ল্যাঙ্গুয়েজেস অব দ্যা ওয়ার্ল্ড” নামে একটি সমিতি গঠন করে। সমিতির পক্ষ থেকে দশ জন ব্যক্তির স্বাক্ষর সম্বলিত সাতটি ভাষায় লিখিত একটি আবেদন ইউনেস্কোর কাছে প্রেরণ করে। ইউনেস্কোর শিক্ষা বিষয়ক প্রকল্প বিশেষজ্ঞ মিসেস আনা মারিয়া সমিতিকে জানান বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুরোধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব নয়। তবে যদি সরকার এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয় তাহলে ব্যাপারটি বিবেচনা করা যেতে পারে। তারপর রফিকুল ইসলাম বাংলাদেশের তখনকার শিক্ষা সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরবর্তীতে বিষয়টি সম্পর্কে শিক্ষামন্ত্রী এবং অতঃপর প্রধানমন্ত্রীর মনযোগ আকর্ষণ করা হলে সরকার তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয় এবং ইউনেস্কোর কাছে যথার্থ ভাবে প্রস্তাব পেশ করেন।  পরবর্তীতে দেখা যায় বাংলাদেশের সাথেও অন্যান্য ২৬টি দেশ এই প্রস্তাব সমর্থন করেন। দেশগুলো হচ্ছে, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, রাশিয়া, সৌদি আরব, ইতালি, কোৎ দ্যা ইভোয়ার, ওমান, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ডোমিনিকান, রিপাবলিক, কমোরো দীপপুঞ্জ, গাম্বিয়া, ফিলিপাইন, প্যারাগুইয়ে, পাপুয়া নিউগিনি, বেনিন, বাহামা, বেলারুশ, ভানুয়াতু, মাইক্রেনেশিয়ান, ফেডারেশন, হন্ডুরাস, সিরিয়া, নিথুয়ানিয়া, মিশর ও মালেশিয়া। 
আলাপ আলোচনার পর ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে এই দিবসটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তারপর ২০০০ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি থেকে দিবসটি, জাতিসংঘের সদস্য দেশসমূহে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে। ২০১০ সালের ২১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে ঘোষণা দেওয়া হয়, “এখন থেকে প্রতিবছর একুশে ফেব্র“য়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করবে জাতিসংঘ।” সেই থেকে সালাম, বরকত, জাব্বারদের রক্তের বিনিময়ে আমাদের এই একুশে ফেব্র“য়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসটি নিয়মিতভাবে প্রতিবছর পালিত হয়ে আসছে। এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের জন্য একটি গভীর গর্বের বিষয়। 
একুশে ফেব্র“য়ারি বাঙ্গালির জাতীয় জীবনে এক গৌরবময় ও ঐতিহ্যবাহী দিন। বাঙ্গালির জাতীয় জীবনের সকল চেতনার উৎস হচ্ছে এ দিনটি। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করার ঐতিহাসিক দিন এটি। এ দিনেই বাঙ্গালির তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল। তাইতো এই দিনটিকে আমরা কখনই ভুলতে পারব না। তবে রক্তঝরা এদিনে ঐক্যবদ্ধ জাতিসত্ত্বার পেরণা অনুভব আজ শুধু বাঙ্গালি না করে করছে সমস্ত বিশ্ববাসী। বিশ্বের ১৮৯টি দেশ এখন শ্রদ্ধাভরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে এই দিনটি পালন করছে। এটা আমাদের আরও বেশী গৌরবের আরও বেশী আনন্দের। তবে সবচেয়ে বেশী আনন্দের এটাই যে পাকিস্তান ভাষার জন্য একুশের এই দিনে বাঙ্গালির রক্ত ঝরিয়ে ছিলো সেই পাকিস্তানও এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে এই দিনটি পালন করছে।
তাই আসুন আমরাও আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে সঠিক করে পড়ি, লিখি ও শিখি।
(লেখক : সাংবাদিক ও উন্নয়নকর্মী)


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

বদলে যাবে মংলা বন্দর

বদলে যাবে মংলা বন্দর

০৩ জুলাই, ২০১৮ ০২:০১













ব্রেকিং নিউজ











জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ  আজ শুরু

জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ  আজ শুরু

১৮ জুলাই, ২০১৮ ০০:৫৬